গোয়ালন্দে মরাপদ্মা নদীতে প্রভাবশালী মহলের হাতে মার খাচ্ছে জমির মালিকরা –

শামীম শেখ, রাজবাড়ী বার্তা :


রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে মাত্র ২০ একর জলমহালের লিজ নিয়ে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকার বিশাল জলাশয়কে অপদখল করে রেখেছে প্রভাবশালী একটি চক্র। জলাশয়ে নিজেদের রেকর্ডভুক্ত জমিতে মাছ ধরতে গিয়ে চক্রের হাতে মার খাচ্ছে এলাকার দরিদ্র জেলে ও জমির মালিকরা।


মরা পদ্মা নদীর ওই বদ্ধকোলটি উন্মুক্ত রাখার দাবীতে এলাকাবাসী বহুদিন ধরে দাবী জানিয়ে আসলেও প্রশাসন এ বিষয়ে কোন গুরুত্ব দেননি বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। উপরন্তু জেলা প্রশাসন যে ২০ একর জায়গা লিজ দিয়েছে সেটাও চিহ্নিত করে দেয়নি। এর সুযোগ নিচ্ছে লিজধারী প্রভাবশালী চক্রটি। জলমহালটির নাম উজানচর ইউনিয়নের উজানচর (বদ্ধ) জলমহাল হলেও এর তফসিলভূক্ত জমি দেখানো হয়েছে উত্তর উজানচর, পূর্ব উজানচর এবং পাশ্ববর্তী দৌলতদিয়া ইউনিয়নের উত্তর দৌলতদিয়া ও দক্ষিণ দৌলতদিয়ার বিশাল অঞ্চল জুড়ে। যেখানে কয়েক হাজার একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে।


অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ক্যানেল ঘাট থেকে উজানচর ইউনিয়নের কামারডাঙ্গী পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে বিশাল আয়তনের বদ্ধকোলটিতে কয়েক হাজার একর জলাভূমি রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাস-খতিয়ানভূক্ত জমির পরিমাণ পূর্ব উজানচর অংশে ৮১.০৭ একর। দৌলতদিয়া অংশে জলাভূমিতে কোন খাস জমি নেই। সরকারি আইন অনুযায়ী ২০ একরের অধিক আয়তনের জলমহাল জেলা প্রশাসন থেকে লিজ দেয়া যায় না। সেক্ষেত্রে বিভাগীয় কার্যালয় থেকে লিজ নিতে হয়। কিন্তু গোয়ালন্দের মরা পদ্মা নদীর বদ্ধ জলাশয়টিকে ২০ একরের নীচে আয়তন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে লিজ দিয়ে আসছে জেলা প্রশাসন। এতে সরকারের মোটা অংকের রাজস্ব লোকসানের পাশাপাশি লিজ গ্রহণকারী ও এলাকাবাসীর মধ্যে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রয়েছে বহু বছর ধরে।
স্থানীয়রা জানান, জলমহালটি এলাকার মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত। এ কোলোর মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল এলাকার শতশত জেলে পরিবার। বিশাল এ কোলটির অনেক এলাকা শুস্ক মৌসুমে জেগে ওঠে। কোলের বুকে ধান,তিল,গমসহ নানা ধরনের ফসলের চাষাবাদ হয়। কোলের বেশীরভাগ জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং তারা জমির নিয়মিত খাজনা দেয়।


এদিকে কোলটি দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির নামে ৩ বছরের জন্য লিজ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কথিত মাছ চাষের নামে কোলে রাম রাজত্ব কায়েম করেছে। আগামী বৈশাখ পর্যন্ত তাদের লিজের মেয়াদ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলেদের মাছ ধরা, গরু ছাগল গোসল করানো এমনকি কৃষি কাজের জন্য সাধারন কৃষকদেরও কোলে নামা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন লিজধারীর লোকজন। তাদের নিষেধ না শুনায় গত কয়েকদিনে দৌলতদিয়া এলাকার কয়েকজনকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার ঘটনা ঘটেছে। অনেককে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল খাটানোর ঘটনাও রয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা চলছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে দৌলতদিয়া হোসেন মন্ডল পাড়া ও সৈদাল পাড়ার বহু জেলে তাদের মৎস্যজীবি তালিকাভূক্ত কার্ড দেখিয়ে বলেন, আমার সরকারী তালিকাভূক্ত প্রকৃত জেলে। আমরা এ বদ্ধ জলাশয়ে সরকারের “জাল যার, জলা তার” নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন চাই।
এ সময় জেলে সাহেদ শেখ (৪৫), আমির সিকদার (৬৫), লোকমান সরদার (৫৫), নান্নু মৃধা (৫২), আলামিন শেখসহ অনেকেই বলেন, আমরা জলাশয়ে জাল দিয়ে মাছ ধরতে গেলে কয়েকদিন আগে ইজারাদারের মাস্তানরা আমাদেরকে মারধর করে জাল কেড়ে নিয়ে যায়। সেই সাথে আমাদের কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে অস্ত্রের মূখে প্রাণে মারার ভয় দেখায় এবং মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। গত শনিবার রাতে ওই মাস্তানরা ট্রলার নিয়ে নদীতে আবারো টহল দিতে আসলে এলাকার কয়েকশ মানুষ তাদেরকে ধাওয়া দেয়। এ সময় তারা ট্রলারটি ফেলে পালিয়ে যায়।


দৌলতদিয়া ফেরি ও লঞ্চঘাট মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম দাবী করেন, তিনি বৈধভাবে লিজ নেয়া জলাশয়ের ভোগ দখলে রয়েছেন। তার কোন মাস্তান বা প্রভাবশালী কেউ নেই। জলাশয়ের পাহারাদারদের সাথে এলাকার মানুষের মধ্যে একটু সমস্যা হলেও থানা পুলিশের সহযোগীতায় সেটা নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মন্ডল জানান, দরিদ্র জেলেদের স্বার্থে জলাশয়ে ‘জাল যার, জলা তার’ নীতি বাস্তবায়ন হওয়া দরকার। তাছাড়া সরকারিভাবে কতোটুকু এলাকা লিজ দেয়া হয়েছে এটারও নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত থাকা দরকার। অন্যথায় সমস্যা থেকেই যাবে। বড় ধরণের হানাহানিরও আশংকা রয়েছে।


গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল তায়াবীর জানান, জলমহাল নিয়ে কিছু উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল। উভয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। তবে জনস্বার্থ বিরোধী যে কোন তৎপরতার বিরুদ্ধে পুলিশ কাজ করবে।
গোয়ালন্দ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছেন। অনেক কিছুই তার জানা নেই। তবে ফাইলপত্র দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। এ ক্ষেত্রে জলাশয়ের মধ্যে থাকা ভূমি মালিকদের তিনি প্রশাসন বরাবর গণপিটিশন দাখিল করতে পরামর্শ দেন।

(Visited 74 times, 1 visits today)