সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম : প্রেক্ষিত শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে পারস্পরিক মত বিনিময়, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন, ভাবের আদান- প্রদান, আর্থ- সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি, শিক্ষার উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ভাইবার, ইউটিউব, মেসেঞ্জার, লিংকড-ইন প্রভৃতি সামাজিক মাধ্যমগুলো বর্তমানে প্রায় সব বয়সী মানুষের নিকট দারুনভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দিনের অনেকটা সময় মানুষ এখন এসব মাধ্যমে ব্যয় করে থাকে।জীবনের নানাবিধ ক্ষেত্রে এসব মাধ্যমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব থাকলেও এ প্রবন্ধে শুধু শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ওপর এসবের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।
আমরা জানি শিক্ষা একটি সমন্বিত ও চলমান প্রক্রিয়া। বিভিন্ন উৎস থেকে শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণাদি ধারাবাহিকভাবে আহরণ করতে হয়। কোন কারণে এসব প্রয়োজনীয় উপকরণাদি সঠিক সময়ে পেতে ব্যর্থ হলে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ ব্যহত হয়।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তার হাত সম্প্রসারিত করেছে। এখন একজন শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষে অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে উপস্থিত না থেকেও শ্রেণি কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারছে। ফেসবুকে কোন টপিকে নিজের সমস্যার কথা জানিয়ে অন্যদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছে। ইউটিউব থেকে সে চাইলে ওই টপিকের ওপর ভিডিও পাঠও নিতে পারছে। ইচ্ছে করলে ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে প্রয়োজনীয় সদস্যদের নিয়ে একটি গ্রুপ তৈরি করে প্রতিনিয়ত নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারছে, সমাধানও পাচ্ছে নিমেষেই। পরীক্ষার রুটিন, পরীক্ষার ফলাফল প্রভৃতি বিষয়গুলো একজনের হাতে আসার সাথে সাথেই অন্যদের হাতে চলে যাচ্ছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি, বিগত বছরের প্রশ্নাবলী ও এসব প্রশ্নের সমাধানে শিক্ষক ও অভিজ্ঞদের মতামত সহজেই পেতে পারছে।আবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের ওপর অন্যের প্রস্তুতকৃত নোটও সহজেই পেতে সক্ষম হচ্ছে।
ফেসবুক-কে ভিত্তি করে বর্তমানে অসংখ্য অনলাইন শিক্ষামূলক গ্রুপ তৈরি হয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের সমস্যা নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারছে। শ্রেণিপাঠভিত্তিক গ্রুপ ছাড়াও চাকুরীভিত্তিক অসংখ্য গ্রুপ আছে যেখানে চাকুরী প্রত্যাশীরা তাদের প্রত্যাশিত চাকুরীর পরীক্ষা প্রস্তুতি নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা করতে পারছে। BCS Our Goal: The Largest Group Of Bangladesh, BCS Written Campaigner, BCS Viva Campaigner, Banking Career Group ইত্যাদি হাজার হাজার গ্রুপ প্রকৃতপক্ষেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণে চাকুরী প্রত্যাশীদের অনেক সহযোগিতা করছে।
বর্তমানে চাকুরী অন্বেষণ, জ্ঞানচর্চা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম হিসেবে যে সামাজিক মাধ্যমটি বিবেচনা করা হয় সেটি হচ্ছে খরহশবফওহ। বিশ্বের ২০০ টি দেশের প্রায় ৪১.৪ কোটি মানুষ এ মাধ্যমটি ব্যবহার করে থাকে। চাকুরি খোঁজা, জীবন বৃত্তান্ত তৈরি, প্রফেশনালদের সাথে যোগাযোগ সৃষ্টি, ব্যবসায়িক কাজ, নিজের ব্রান্ড ভ্যালু তৈরিতে এ মাধ্যমটি অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে চলেছে।
বই পড়তে পড়তে যদি কারো অলসতা কিংবা
একঘেয়েমিতা চলে আসে তবে সে ইউটিউবে গিয়ে ঐ বিষয়ের ওপর ভিডিও দেখতে পারে। তাছাড়া সব ধরণের বই অনেক সময় নিজের সংগ্রহে থাকে না কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে জানা জরুরি তখনই ইউটিউব এর মত অন্য সামাজিক মাধ্যমগুলো গুরুত্ব রাখতে পারে। এতে বিনোদনের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত জ্ঞান অর্জনও সম্ভব হয়।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চায় সামাজিক মাধ্যমগুলো অসামান্য অবদান রেখে চলেছে পাশাপাশি এটিও ধ্রুব সত্য যে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা ও বিদ্যা আহরণের ক্ষেত্রে এগুলো অনেক সময় অন্তরায় হিসেবেও কাজ করছে। সামাজিক মাধ্যমের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে জ্ঞান আহরণের মৌলিক ও প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম পুস্তকের ওপর মানুষের আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিদ্যা আহরণ ও জ্ঞানচর্চা কোনটাই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। কোন একটি বিষয়ে সময় নিয়ে মুক্তভাবে চিন্তা করার সুযোগও আর থাকছে না। কারণ এসব মাধ্যমে একটি বিষয়ের সাথে আরও অনেক বিষয় হাইপার লিংক (ঐুঢ়বৎ ষরহশ) করা থাকে।ফলে একটি বিষয় পড়া শেষ হতে না হতেই অন্য বিষয় এসে হাজির হয়।মন ও মগজ উভয়ই তখন নতুন বিষয়ের দিকে চালিত হতে চায়। আর এভাবেই কোন একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে নিজের চিন্তা ভাবনা প্রয়োগে অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সময় নষ্ট হওয়া। কেউ হয়তো কোন বিষয়ে জানার জন্য এসব মাধ্যমে প্রবেশ করল।কিন্তু ঐ বিষয়ের বাইরেও একটার পর একটা নতুন নতুন বিষয় এমন আকর্ষণীয়ভাবে তার সামনে উপস্থাপন হবে যা এড়িয়ে যাওয়াটা তার জন্য কঠিন। ফলে মূল বিষয়টিতে হয়তো তার সময় লাগতো ৫ বা ১০ মিনিট কিন্তু নতুন নতুন বিষয় সামনে আসায় কখন যে ঘন্টা বা তার অধিক সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে এটি তার খেয়ালই থাকে না। আবার মেসেঞ্জারে প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলাপ করার পরিবর্তে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে খোশগল্প করেই অনেকে মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্ঞান চর্চার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ। ফলে নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনটি প্রয়োজনীয় তথ্য আর কোনটি অপ্রয়োজনীয় তথ্য এটি প্রখর প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছাড়া সাধারণের পক্ষে অনেক সময় বোধগম্য করাটা কঠিন হয়ে যায়। যার দরুন মিথ্যে ও বানোয়াট তথ্যের ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে কিংবা গবেষণাসহ জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলে অনেক সময় হিতে বিপরীত হয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। চাঁদে সাঈদীর মুখ দেখা গেছে, পদ্মা সেতু নির্মানে মাথা লাগবে, লবণ শেষ হয়ে যাচ্ছে প্রভৃতি গুজবকে কেন্দ্র করে দেশ যে মাঝে মাঝে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে তার পশ্চাতেও কিন্তু এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আর এই গুজবে পা দিয়ে অনেক নিরীহ মানুষকেও অনেক ক্ষেত্রে দেশে এ সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বিজ্ঞানের সকল কিছু মানুষের কল্যাণের নিমিত্তে সৃষ্টি হলেও পরবর্তীতে মানুষই তার হীন স্বার্থে এগুলোকে ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। এসব মাধ্যম ব্যবহারকারীকেই নির্ধারণ করতে হবে সে কোন কাজে এগুলোকে ব্যবহার করবে। ব্যবহারকারীকেই নির্দিষ্ট করতে হবে সে কি উন্নত বিদ্যার্জন, নব নব জ্ঞানচর্চা, শিল্প সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধনে, শিক্ষার আলোয় নিজেকে আলোকিত করার কাজে এসব মাধ্যম ব্যবহার করবে নাকি নিজেকে, সমাজকে, দেশকে অজ্ঞানতা ও পশ্চাদপদতার দিকে ধাবিত করবে। ——
লেখক- শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ

(Visited 276 times, 1 visits today)