শহীদ দিবসের বিশেষ প্রবন্ধ “মায়ের ভাষা” : লেখক- শারমিন রেজা লোটাশ
- Update Time : ১০:৫০:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
- / ৬০ Time View

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
মায়ের ভাষার জন্য রক্ত ও প্রাণ দানের ইতিহাস জ্বলজ্বল করছে।
বিশ্বের বুকে এই অনন্য ইতিহাস রচনা করেছে বাংলাদেশ।
পলাশ-শিমুল ফোটার দিনে তাইতো আজ গেয়ে উঠছে মন
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি?
মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের সমান। সেই মাতৃভাষার আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি কিন্তু খুব পুরনো দিনের কথা নয়। ঐতিহাসিক ২১ শে ফেব্রুয়ারী, সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। এই দিনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের পাশের দেশ বাংলাদেশের স্বপ্ন, তার জন্ম এবং অবশ্যই ঐতিহ্যের। কিন্তু সেই ইতিহাসে রয়েছে আত্মত্যাগ, নিরলস সংগ্রাম এবং হারনামানা মনোভাব। শুধু বাঙালিনয়, বিশ্বের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষার মর্যাদা, স্বাধিকার, স্বাধীনতা ও মানুষের মতো বাঁচার দাবির সংগ্রামের দুর্জয় অনুপ্রেরণা সৃষ্টির চিরঅনির্বাণ শিখার দীপ্তিতে দিগন্ত উদ্ভাসিত করেছে ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’।
‘একুশে ফেব্রুয়ারী’
এদেশের মানুষকে
শিখিয়েছে আত্মত্যাগের মন্ত্র, বাঙালিকে করেছে মহীয়ান।
প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি ভূখরে দুটি ভিন্ন ভাষার জাতিসত্তাকে মিলিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল আন্দোলনের। আর এই ভাষা আন্দোলনকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টিরপথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মনে করা হয়।১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এই দিনটিকে শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। এই ইতিহাস বাংলাদেশের অনেকেরই জানা। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে রয়েছে আরও অনেক সংগ্রামের ইতিহাস। স্বাধীন বাংলাদেশের জনসাধারণ প্রতি বছর অমর একুশের শহীদ দিবসে মহান ভাষা আন্দোলনের সূর্য সন্তানদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে। ১৯৫২ সালের ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্তস্রোতের সাথে মিশে আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের গৌরব গাথা। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারীতে বাংলার ছাত্র সমাজ আত্মদান করে মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। রক্ত রাঙা অমর একুশে ফেব্রুয়ারী রক্তের পবিনের মধ্য দিয়ে আজ সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরবময় আসনে আসীন। বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ ভাগ মানুষের ভাষা বালা হলেও রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে বালা উপেক্ষিত হতে থাকে। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্র ব্রিটিশ আমল থেকেই চলছে। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পূর্ব পাকিস্তান যুব কর্মী সম্মেলনে প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের অফিস ও আইন-আদালতের ভাষা এবং শিক্ষার বাহন হিসেবে বাংলা কে চালু করার দাবি জানানো হয়। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচিতে পাকিস্তান সরকারের এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্র সভা অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন মন্ত্রীর সাথে দেখা করে বালা ভাষার সমর্থনে প্রতিশ্রুতি আদায়ের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের গণপরিষদের এক অধিবেশনে ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুভাষাতে অধিবেশনের কার্যক্রম রেকর্ড হওয়ায় এর প্রতিবাদ করেন এবং বাংলার স্বীকৃতির জন্য দাবি জানান। কিন্তু এ দাবি প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় পূর্ব বাংলার শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তাল হতে থাকে। এমন সময়ে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ মুহম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানে ভাষণে বলেন ২৪ মার্চ কার্জন হলে তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করলে উপস্থিত ছাত্ররা বলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং ২৬ মার্চ ধর্মঘট পালন করে। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিম উদ্দিন ঢাকার এক জনসভায় জিন্নাহর কথার পুনরাবৃত্তি করলে পূর্ব বাংলার গণমানুষের প্রচন্ড ক্ষোভ দেখা দেয়। এরপরই শুরু হয় ভাষা আন্দোলনের মূলসগ্রাম।
একুশে ফেব্রুয়ারীতে সালাম, বরকত, রফিকের বুকের রক্ত বৃথা যায় নি। ইতিহাস তার মূল্য দিয়েছে। শুধু বাংলাভাষাকেই আমরা মাতৃভাষা হিসেবে পাইনি বরং একুশের চেতনার যে বীজ সেদিন রোপণ করা হয়েছিল তার বিশাল মহীরুহ পরবর্তীতে মহান স্বাধীনতার স্নিগ্ধ ছায়ায় বেড়ে উঠেছে। কবি শামসুর রহমানের ভাষায়-
আবার ফুটেছে দ্যাখ কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে
কেবল নিবিড় হয়ে কখনও মিছিলে কখনও বা
একা হেঁটে যেতে মনে হয়, ফুল নয়ওরা
শহীদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতি গল্পে ভরপুর
একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রঙ।
মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, “আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং তমদ্দুন মজলিশ যুক্ত ভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করল। সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অবিশ্বাস্য আত্মপ্রত্যয় ছিল! তখন কে জানতো যে, ’৪৮-এর এই ১১ মার্চের পথ ধরেই ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর একুশেফেব্রুয়ারীরচেতনায় স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে! কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতেন! কারণ তিনি দূরদর্শী নেতা ছিলেন, লক্ষ্য স্থির করে কর্মসূচী নির্ধারণ করতেন। যে দিন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেদিনই তিনি বুঝতে পেরে ছিলেন এই পাকিস্তান বাঙালীদের জন্য হয় নাই; একদিন বাংলার ভাগ্য নিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। আর তাই তিনি ধাপে ধাপে সমগ্র জাতিকে প্রস্তুত করেছেন চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য। বাঙালির রক্তস্নাত ভাষা সংগ্রামের ইতিহাসের পথ পরিক্রমায় মহান একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষিত হওয়ায় ৭ ডিসেম্বর সারাদেশে উজ্জ্বল আনন্দ, আর আবেগ ঘনপরিবেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উৎসব পালন করা হয়। ভাষা উৎসব দেশ বাসীকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে ছিল। অনেক দিন বাঙালি এমন দলমত নির্বিশেষে উৎসবের আমেজ পায়নি। সেই উৎসব মুখর বাঙালিদের দেখে কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজীর মতো যেন সকলের বা ময়তা ফুটে উঠেছে –
ফেব্রুয়ারী কোনো মাসনয়, কোনো দিন নয়
কোনো গ্রাম নয়, কোনো পথ নয়
কোনো ফুল নয়, কোনো গাছ নয়
আকাশ ও নয় নদী ও নয়
পঞ্চান্ন হাজার বর্গ মাইলে
অবিরাম কথা বলা।
জাতীয় চেতনা
লেখক – শারমিন রেজা লোটাস, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা, রাজবাড়ী।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়















































































































