“বাংলাদেশে নারী ও মেয়ে শিশু’র ওপর নির্যাতন” : লেখক – শারমিন রেজা লোটাশ
- Update Time : ০৯:৪০:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২২
- / ৬৬ Time View

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
বাংলাদেশে নারী ও মেয়ে শিশুর ওপর নির্যাতন, হত্যা এবং সহিংসতা বেড়েই যাচ্ছে। এসব যারা করছে, তাদের দুঃসাহস এতটাই বেড়েছে যে অনণয় করে সামাজিক মাধ্যমে তাপোস্ট করছে এবং নিজেরাই আজে বাজে মন্তব্য করছে। এ রকম ঘটনা একটার পর একটা ঘটেই চলেছে। কিন্তু, ঘটনা গুলোর কোনো সুরাহা হচ্ছে না। অপরাধীকে বিচারের দরজায় নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। বিচারের মুখোমুখি হলেও বিভিন্ন ফোকর গলে অপরাধী বের হয়ে আসছে। নারী-পুরুষের এই সমতার চর্চা ভবিষ্যতের সুন্দর মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলবে। সমতার পৃথিবী সুন্দর পৃথিবী। উন্নয়নের দৃশ্যত প্রমাণ নারীর জাগরণ। দেশের প্রগতির মাপ কাঠি নির্ণয়ে সহজ প্রন্থা নারীর মুক্তি। জাতীয় অগ্রসর তার উপায় নারীর ক্ষমতায়ন। আজকের বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নিয়ে গেছে নারীর অগ্রযাত্রার প্রবাহমানতায়। শৃঙ্খল মুক্তির ইতিহাস বাংলার নারীদের একদিনের নয়। দীর্ঘ পথ চলার পর নারী পেয়েছে সঠিক সত্যের আলোক ধারা। এই পথ সৃষ্টিরকারি গড় নারীরা। তবে পুরুষদেরও সহযোগিতা রয়েছে। অবরোধবাসিনী বেগম রোকেয়া যে আলোর মশাল জ্বালিয়ে ছিলেন, সেই মশাল এগিয়ে নিয়ে গেছে নলীলানাগ, প্রীতিলতা, ইলামিত্র’সহ অনেকে। বাহান্নরভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভূত্থ্যান এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নারীর অগ্রযাত্রার একেকটি ধাপ। রাজনৈতিক লড়াইয়ে যেমন ছিল নারীর অংশগ্রহণ। আবার সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে এ দেশের নারীরা খুলে দিয়েছে আলোর উৎস- দ্বার। এভারেস্ট্রের চূড়ায় বাংলাদেশের নারীরা এঁকেছেন বিজয় গাথা।
খেলার মাঠেও নারীদের অগ্রযাত্রা সমতার সমাজ নির্মাণের পথকে সুগম করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারীর অগ্রযাত্রায় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতাও অন্যতম সহায়ক হিসেবে নারীর ক্ষমতায়নে সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। নারী-পুরুষের সমতা ভিত্তিক সমাজ নির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বেশ কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এগুলো আন্তর্জাতিক ভাবেওপ্রশংসিতহচ্ছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার নারী। এটি বিশ্বের বিরল ঘটনা এবং নারী অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রেরণা। ২০১৪ সালে ডাব্লি উইএফ-এর লিঙ্গ বৈষম্য সূচকের বার্ষিক প্রতিবেদনে ১৪২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থান ৬৮তম। এই অর্জনে ভারত, পাকিস্তান জাপানকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। দেশের পোশাক শিল্পেই কাজ করছে প্রায় ৩০ লাখ নারী। অনেক দেশের মোট জনসংখ্যাও এর চাইতে কম। পুলিশ বাহিনীতে প্রায় সাত হাজার নারী পুরুষের সঙ্গে সমান যোগ্যতায় কাজ করছে। এ সবই বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সমীকরণ। সামাজিকভাবে বাংলাদেশে এখন নারীদের একটা সম্মান জনক অবস্থান তৈরি হয়েছে। কোন লিঙ্গ বৈষম্য ছাড়া নারীকে বাঁচতে দেওয়ার এবং নিজের কাজ করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়াটা নারীবাদের কাজ।নারীবাদ মানে পুরুষ বিরোধ নয়। নারীবাদ মানে স্বেচ্ছাচারনয়। সুযোগ, সুবিধারদিক থেকে একটা সাম্য এনে দেয়া। যাতে একজন সম মেধার পুরুষ ও নারী একর কম সুযোগ পান এবং তারপর – সধু ঃযব নবংঃ ঢ়বৎংড়হ রিহ! যে যার মত খুঁটে খাও। এই সহজ বিষয়টি, সহজ ভাবে আমি আমার মোটা মাথায় ঢুকিয়েছি। বেশি বুদ্ধি নাই তো, তাই আর কচলাই নি। মনে করেন, পুরুষতন্ত্র যখন নিজেকে প্রকৃতির মনিব মনে করে, তখন প্রকৃতির মতো নারীকেও একই দৃষ্টিতে দেখে এবং নারী ও প্রকৃতির ওপর একই রূপ আচরণ করে। তবে পরিবেশ-নারী বাদীরা একমত যে, নারী ও প্রকৃতির মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ওয়ারেনের মতানুযায়ী, প্রকৃতির সাথে নারীর অনিবার্য সম্পর্ক রয়েছে। তিনি সার্বিক ভাবে নারীকে পুরুষের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে প্রকৃতির সাথে যুক্ত করে দেখেন এই যুক্তিতে যে, নারী নিপীড়নে যেমন নারী নিগৃহীত হয়, পরিবেশ শোষণেও তেমনি পরিবেশ নিগৃহীত হয়। পরিবেশ-নারীবাদ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওয়ারেন নারী ও প্রকৃতি নিপীড়নের কারণ হিসেে বপিতৃতন্ত্র কর্তৃক সৃষ্ট দ্বৈত মূল্যবোধকে দায়ী করে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, দ্বৈত মূল্যবোধ থেকে মানুষের মনে এই ধারণা জন্মেছে যে, নারী ও প্রকৃতি হলো অধস্তন, এদের ওপর কর্তৃত্ব করার অধিকার আছে এবং এ কর্তৃত্ব করবে পুরুষতন্ত্র। সমাজ প্রতিষ্ঠা রশুরু থেকে পুরুষতন্ত্র মানুষের মধ্যে এমন মূল্য বোধ জন্মাতে সক্ষম হয়েছে যে, প্রকৃতি ও নারী দুর্বল এবং নিম্নমানের। কাজেই এদের ওপর নিপীড়ন করা যাবে। এই মূল্যবোধের কারণে মূলত নারী ও প্রকৃতির ওপর নিপীড়ন করা হয়। পুরুষতন্ত্র নারী ও প্রকৃতির ওপর যে নিপীড়ন করে সেটা তারা স্বীকার করতে চায়না; বরং তাদের কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের মনোভাবকে বা নিপীয়ন মূলক আচরণকে এভাবে তারা যৌক্তিক রূপ দেয় যে, পুরুষ শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা, সাহসী, স্বনির্ভর, আত্মপ্রত্যয়ী। অন্যদিকে নারী হলো দুর্বল, পর নির্ভরশীল, ভীরু, আবেগময়ী, সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম ইত্যাদি। প্রকৃতি সম্বন্ধেও একই ধারণা পোষণ করে পুরুষতন্ত্র।
তাই মানুষ পুরুষতন্ত্রের এই যুক্তিকে এত কাল লালন করে এসেছে, এর বিরুদ্ধ চারণ করেনি। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক পর্যন্ত এই যৌক্তিক তাকে মানুষ মেনে নিয়েছে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অর্থাৎ সত্তরের দশকে ফ্রাসোয়া দোবন পরিবেশ-নারীবাদ বিষয়টি ব্যাখ্যা করার কারণে মানুষ এ সম্পর্কে সচেতন হয়েছে এবং উপলব্ধির প্রয়াস চালিয়েছে। পরিবেশ-নারীবাদীগণ তাই পুরুষতন্ত্রের এ মূল্যবোধের অন্যায্যতা প্রতিপাদন ও অবসানের প্রচেষ্টা চালায়। ওয়ারেন এখানে নারী ও প্রকৃতি নিপীড়নের জন্য সমাজের পুরুতান্ত্রিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি (দ্বৈত মূল্যবোধ)-কে দায়ী করেছেন। অর্থাৎ তার মতানুযায়ী, সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারী-পুরুষের মধ্যে যে অসম অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যেও বিদ্যমান। দ্বৈত মূল্যবোধের কারণেই মূলত নারী ও প্রকৃতি নির্যাতিত হয় এবং সমাজে অধস্তন অবস্থায়টি কে থাকে। পরিবেশের প্রতি মানুষের অবাধ অধিকার রয়েছে। এ ধারণার বশবর্তী হয়ে মানুষ পরিবেশকে ইচ্ছে মতো ব্যবহার করে পরিবেশ অবনয়নের সৃষ্টি করেছে, নিজ স্বার্থ পূরণের প্রয়াসে পরিবেশকে শোষণ ও নিপীড়ন করছে। নারী বাদীরা মনে করেন, পরিবেশ অবনয়ন ও পরিবেশ নিপীড়ন নারী বিষয়ক ইস্যু। কেননা পরিবেশ শোষণ করলে যেমন পরিবেশ নিপীড়িত হয়, নারী পীড়নেও তেমনি নারী নিপীড়িত হয়। এভাবে দেখাযায় যে, পরিবেশ ও নারী উভয়ে পুরুষ শাসিত সমাজের দৃষ্টি ভঙ্গির কারণে নিপীড়িত ও বিপর্যস্ত হয়ে পরেছে। নারীবাদীরা এ দৃষ্টিকোণ থেকে নারী ও প্রকৃতির মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজেপান।
পরিবেশের অবনয়নকে তাঁরা তাই নারী বিষয়ক ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করেন। বিশ শতকের ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন গুলির মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ চারটি জাতীয় আন্দোলন হল (র) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন, (রর) ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন, (ররর) ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আইন অমান্য আন্দোলন, (রা) ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ভারত ছাড়ো আন্দোলন। এই চারটি আন্দোলন পর্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অংশ গ্রহণের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনেও নারী সমাজ অসীম সাহসের পরিচয় রাখে। দীপালি সংঘের মতো নারী সংগঠন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীণা দাসের মতো নারীরা বিশ শতকের ব্রিটিশ- বিরোধী আন্দোলন গুলিতে দৃষ্টান্ত মূলক ভূমিকা নেয়। কাজেই একদিকে অপরাধীরা আস্কারা পাচ্ছে, অন্যদিকে বিচারের দাবি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। উল্লেখ, মুনিয়া, তনু, নুসরাতদের সংখ্যা বাড়ছেই। নারীর প্রতিসহিংসতার ঘটনা সাধারণ মানুষকে ব্যথিত ও উদ্বিগ্ন করে তুললেও বিচারের বাণী নীরবেই থেকে যাচ্ছে।
লেখিকা -শারমিন রেজা লোটাশ, সদস্য, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়
















































































































