ফ্রান্সের লোয়ার নদীর ধারে স্মৃতিতে আমার পদ্মার সুতোনদী- লেখক : গোলাম মোর্শেদ উজ্জ্বল, প্যারিস, ফ্রান্স –
- Update Time : ০৮:০৮:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০
- / ৯৬ Time View
গতবছর গিয়েছিলাম ফ্রান্সের নন্ত শহরে অবকাশ কাটাতে। এই শহরের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত লোয়ার নদী। নদীর এপার ওপার মানুষের সংযোগ সেতু রয়েছে আরও রয়েছে খেয়া তরি। খেয়া তরিতে নদী পার হওয়ার জন্য খেয়ার অপেক্ষায় খেয়া ঘাটে অপেক্ষায় করছিলাম। নন্ত শহরের লোয়ার নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়েছে, অনেক বছর পর আমি আমার বাড়ীর পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মার সুতো নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে খেয়া নৌকার অপেক্ষা করছি। লোয়ার নদীটি খুব বেশী প্রশস্ত নয় এবং আশ্চর্যের বিষয় এই নদীর জল ঘোলা, আমাদের পদ্মা নদীর জলের মত। অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম।চোখে ভেসে উঠছিল সেই ছেলেবেলার সুতো নদীর অনেক ছবি।
প্রবাস জীবন প্রায় দশ বছরের। নিজের জন্মস্থান রাজবাড়ী ছেড়ে ঢাকায় বসবাস ছিল ছয় বছর।জীবনের ষোল বছর চলছে নগর বাস। আমার বেড়ে ওঠা মফস্বল শহরে হলেও কাদামাটির স্পর্শ রয়েছে আমার সমস্ত শরীর জুড়ে। একজন গ্রাম্য বালকের মতই গ্রামীণ জীবনের স্বাদ নিয়েছি পরিপূর্ণ ভাবে। আমাদের বাড়ী থেকে ১০ মিনিটের পথ হাঁটলেই পদ্মা নদীর তীর। এখন মূল পদ্মা নদী প্রবাহিত শহরের কোল ঘেঁষে, কিন্তু একসময় মূল পদ্মা নদীর তীরে যেতে হলে শাখা নদী পার হয়ে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হতো।শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো পদ্মার সুতো নদী বা শাখা নদী। প্রমত্ত পদ্মার বিশালতার কাছে এই শাখা নদীটি সুতোর মতই ছিল।বড় পদ্মার নদীর শরীর থেকে ছোট্ট একটি অঙ্গ বেরিয়ে রাজবাড়ীর কালীতলা হয়ে মিশেগিয়েছিলো গোয়ালন্দের মূল পদ্মা নদীর সঙ্গে। মূল পদ্মা আর এই সুতো নদীর দূরত্বের মাঝে ছিল বিশাল চর অঞ্চল।এই চরে ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন জীবিকা ও বসতী।চড় সিলিমপুর, আম্বাড়ীয়া চর আরও কিছু নাম ছিল এই চরের মধ্যকার বিভিন্ন গ্রামের। আমার জীবনে নদীর সাথে পরিচয় ও নদীর স্মৃতি বলতে এই পদ্মার সুতোনদীকেই ঘিরে।বিশাল প্রমত্ত মূল পদ্মার প্রথম দর্শনের স্মৃতি মনে নেই, তবে কৈশোরে পা দিয়ে কৌতূহল বসতো বন্ধুদের সাথে কোন শুকনো মৌসুমে সুতো নদী পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়ে ওপারের ফসলী মাঠ, পাড়া গাঁ মাড়িয়ে একদিন ধু ধু পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে পদ্মার বিশালতার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিলো।
ছেলেবেলায় পদ্মার এই শাখা নদীটিই ছিল আমার গন্ডী জীবনের কল্পনায় সবচেয়ে বড় নদী। ভরা মৌসুমে এই নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করতো। বিশাল ঢেউ আঁচড়ে পড়ত নদীর দুই পাড়ে। ঢেউয়ের প্রবল আঘাটে কখনো পাড় ভেঙে পড়ত। নদীর এপারে রাজবাড়ী শহর,ওপারে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল।এপারে নদীর পাড় দিয়ে কোথায় ফসলী মাঠ, কোথাও ঘন দেবদারু ও গাব গাছের জংলা প্রকৃতি।।দুই পাড়ের মানুষের একমাত্র সংযোগ মাধ্যম ছিল বৈঠাচালিত খেয়া নৌকা। চর অঞ্চলের মানুষের প্রধান উপজীব্য ছিল, কৃষি কাজ, পশু পালন এবং মৎস্য শিকার। মেছোঘাটা, গোদার বাজার ঘাট ছিল একসময়ের ব্যস্ততম বন্দর। এই ঘাট গুলো থেকে নৌপথে পরিবাহিত হতো দূরবর্তী পণ্য ও যাত্রী। আমার দুরন্ত ছেলেবেলা থেকে যৌবনের সোনালি সময়ের সাথে পদ্মার এই সুতোনদীটির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ।
কৈশোরে বন্ধুরা দল বেধে নদীর পাড় ধরে অনেক দূরে চলে যেতাম,পড়ে একসাথে নদীতে ঝাপ দিয়ে সবাই সাঁতার কাটতে কাটতে চলে আসতাম ঘাটে। আবার নিজের সাহসিকতা পরীক্ষার জন্য অনেকবার সাঁতার কেটে নদীর ওপার গিয়ে আবার একাই ফিরে এসেছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডুপসাঁতার কাটতে কাটতে চোখ লাল হয়ে যেতো।কখনো দল বেধে নদীর ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে সাঁতার কেটে চলে যেতাম নদী ওপারে।নদীর ধারে কৃষকের ক্ষেতে লেগে পড়তাম ক্ষীরা তুলতে, যখন দেখতাম ক্ষেতের কৃষক তেড়ে আসছে আমাদের দিকে অমনি আবার নদীতে ঝাপ দিতাম, সাঁতার কেটে চলে আসতাম এপারে।মাছ ধরা ও ঘুরি ওড়ানোর নেশায় কখনো স্কুল ফাঁকি দিয়ে দিন চলে গেছে নদীর পাড়েই।নদীর পাড় দিয়ে পরিশ্রমী গুণটানা মাঝীর গুণ টেনে হেঁটে চলা ,নদীর বুকে পালতোলা নৌকা থেকে ভেসে আসা গানের সুর স্মৃতিতে এখনো জ্বলজ্বল। এই নদীতেই এক সময় জেলেদের রূপোলী ইলিশ ধরার ধুম লেগে যেতো।পাঙ্গাশ, বোয়াল সহ বিভিন্ন প্রজাতির ছোট বড় মাছের অবাধ বিচরণ এই নদীর ঘোলা জলে। সুতো নদীর প্রশস্ততা বেশী না থাকলেও ছিল সুগভীর।মাঝে মাঝে ভারী জাহাজ পার হতো এই ছোট্ট নদীর বুক দিয়ে। কখনো যাত্রা পথে ঘাটে নোঙ্গর করতো। খবর শুনে কৌতূহল ভরে নদীতে যেতাম কাছ থেকে জাহাজ দেখতে।
প্রতি বছর এই নদীতে নৌকা বাইচ খেলার আয়োজন হতো,প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য দূর দূরান্ত থেকে দীর্ঘকার বাইচের নৌকায় আসতো।নৌকা গুলোর ভিন্ন ভিন্ন নাম ছিল,লালন শাহ, শাহ জালাল। সাধারণত বিভিন্ন পীর আওলীয়া, মুনি ঋষিদের নাম অনুসরণ করে এইসব প্রতিযোগিতার নৌকাগুলোর নাম রাখা হতো।প্রতিযোগিতা উপলক্ষে নৌকাগুলোকে বিশেষ সাজে সাজানো হতো।নৌকার মাল্লারাও পরত বিশেষ পোশাক।নৌকার সামনে ধূপ জ্বালিয়ে মন্ত্র জপতে গেরুয়া পোশাকে বসতেন সাধক, পেছনে বিশাল আকৃতির বৈঠা ধরে দাঁড়াতেন মাঝি, মাঝে মাল্লার দল ছোট ছোট বৈঠায় পানিতে ছন্দ তুলে ছলাত ছলাত শব্দে করে নদীর বক্ষ চিরে এগিয়ে যেতো শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার জন্য।মাল্লাদের সমবেত সুরে গাওয়া বাইচের জারি গানে মুগ্ধ হতো নদীর দুই ধারে অবস্থান নেয়া হাজার হাজার দর্শনার্থী।এখনো সেই সময়ের দৃশ্য চোখে ভেসে উঠলে শরীরে শিহরণ জাগে।
প্রায় প্রতি বছর নদীর উপচে পরা পানিতে বন্যা হতো,নদীর ওপারের চরাঞ্চলে বন্যার পানির সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে আঊশ, আমন ধান।পানি নেমে গেলে মাঠে নরম পলি মাটির প্রলেপ পরত। কোন কর্ষণ ছাড়াই নরম পলি মাটির কাদায় কৃষক ছিটিয়ে দিতো মাসকলাই ডালের বীজ।কোন সার ছাড়ায় নতুন মাটির উর্বর শক্তিতে সবুজ হয়ে উঠত নদীর ধারের কৃষি ক্ষেত। কোথাও কোথাও মাঠ জুড়ে আউশ, আমন ধানের নাড়ার বিছানা পাতা থাকতো,এর মধ্যে ফুটে থাকতো আকাশী নীলের কলমি ফুল।খেয়া নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে ওপারের আত্মীয় স্বজনের বাড়ীতে যখন বেড়াতে যেতাম তখন প্রকৃতির এমন অকৃত্রিম রূপে বিমোহিত হতাম।
এপারে শৌখিন মৎস্য শিকারিদের সাড়ি সাড়ি বাঁশের মাচা আরও নদীর ওপারের শরতে ফোটা কাশফুল, এখনো আমার স্মৃতিতে ছবির মত।
এক সময় পানি কমতে কমতে নদীর বুকটা হয়ে যেতো মরুভূমির বালুকা বেলার মত।মনে হতো নদীর দুই ধারে পাহাড়ের মত সুউচ্চ শক্ত এঁটেল মাটির পাড় আর মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে শুকনো বালুর মহাসড়ক।এর মধ্যে ছোট্ট বড় কুম( জমে থাকা গভীর পানির স্থল) পড়ত।নদীতে নতুন পানি না আসা পর্যন্ত এই কুমের মধ্যে চলতো এলাকার মানুষ ও গরু ছাগলের গোছল, কাপড় চোপড় পরিষ্কার ধৌতের কাজ। ছোটবেলায় অনেকবার দাদীর সঙ্গে নদীর কুমে গোছল করতে এসে সাঁতার না জানায় গহীন জলে ডুবে জল খেয়েছি, কেউ না কেউ দেখে আমাকে উদ্ধার করেছে।ছেলেবেলায় আমার সাঁতার শেখা হয়েছে কুমের জলে ডুবে ডুবেই। দাদীর সঙ্গে নদীতে গোছল করতে গেলে সাবানের পরিবর্তে নদীর পাড়ের এঁটেল দিয়ে চুল পরিষ্কার করে দিতো। শহরতলিতে বসবাস করলেও দারুণ এক গ্রামীণ জীবনের স্বাদ ছিল এই সুতো নদীকে কেন্দ্র করে।
ছেলেবেলায় দেখা বন্ধুদের এক নৃশংস শখের কথা স্মরণ হলে এখনও দারুণ ভাবে অনুতপ্ত হই।দেয়ালের মত নদীর দুই পাড়ের ভাজে ভাজে শত শত গভীর গর্ত থাকতো, সেই গর্তের মধ্যে সংসার পাতত মাছরাঙা পাখীর দল। আমাদের লোভ থাকতো পাখীর বাচ্চার প্রতি।কিন্তু সুগভীর গর্তের মধ্য থেকে হাত ঢুকিয়ে পাখীর বাচ্চা বের করে আনা ছিল দুরূহ কাজ।তাই লম্বা লাঠির সঙ্গে বেতের সীসা পেঁচিয়ে লাঠিটি ঢুকিয়ে দেয়া হতো গর্তের মধ্যে।কখনো লাঠির সঙ্গে বেতের সীসার কাটায় পেঁচিয়ে গর্তের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসতো রক্তাক্ত পাখির ছানা।কাজটি ভীষণ অন্যায় ছিল, যা ওই সময়ে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই করতে দেখেছি।ঐ সময়ে আমাদের মধ্যে এই অনুভূতি জাগ্রত হয়নি যে ছোট্ট পাখীর ছানার কাটার আঘাতে দুঃসহ কষ্ট হতো।মা ছাড়া পাখীর ছানাগুলো বাড়ীতে এনে অতি আদর যতেœ পোষার চেষ্টা করলেও কয়েক দিন পর অধিকাংশই মারা যেতো। ছেলেবেলার দুরন্তপনা বা কৌতূহল বশত এগুলো করা হলেও, আজ বুঝি এমন শখ ছিল বড় রকমের অপরাধ।প্রতিটি প্রাণী তার নিজস্ব জীবন যাপনের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তার চিন্তা ও বুদ্ধির প্রয়োগ এবং যতœ করে তার বাচ্চা লালন পালন করে বড় করে,তার মানসিক বিকাশ ঘটায়।একটি মানব সন্তানকে যেমন বনের পশুকে দিয়ে লালন পালন করা সম্ভব নয়, তেমনি ছোট্ট পাখীর ছানাকে মা ছাড়া করে যতই আদর যতœ করে বড় করে তোলার চেষ্টা করা হোক না কেন কখনোই ঐ মা পাখীটির মত করে স্নেহ ভালোবাসা দিয়ে ছোট্ট ছানাটির পাখীত্বের বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। প্রতিটি প্রাণীই স্ব স্ব গোত্রেই নিজেদের মত স্বাধীন ও নিরাপদ।প্রাণী জগতের শ্রেষ্ঠ প্রাণী হিসেবে প্রতিটি প্রাণীর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা মানুষেরই দায়িত্ব।এই বোধ এখন জাগলেও তখন ছিলাম বোধহীন।পাটকাঠির মাথায় জিগার আঠা জড়িয়ে গাং ফড়িং শিকার করে কত চৈতালি দুপুর কেটেছে এই নদীর পাড়ে তার হিসেব নেই।সেটাও ছিল ঐ সময়ের বোধহীন শখ।ফড়িংগুলো ধরার পর যখন আবার ছেড়ে দিতাম তখন ওরা ভালোভাবে উড়তে পারতো না।কারণ পাখায় লেগে থাকা জিকার আঠার ভারে ফড়িংয়ের স্বচ্ছ পাতলা ডানা দুর্বল হয়ে যেতো।
উদিত যৌবনে সুতোনদী আমাকে দিয়েছে অনেক সোনালী মুহূর্ত।প্রতিটি বর্ষাকাল মানে নদীর নব যৌবন।নদীর বুকে ঢেউয়ের খেলা, পাড় ছুঁই ছুঁই পানি।স্কুল,কলেজের ক্লাস শেষ করে প্রতিটি বিকেল রুটিন করে কাটত এই নদীর পাড়ে।সারাদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দিতো পড়ন্ত বিকেলের নদীর পাড়।নদীর পাড় ধরে কোথাও বসত বাড়ী,আবার কোথাও বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত, সেই ক্ষেতে খোলা বাতাসে চলে ধান গাছের ঢেউ খেলানো নৃত্য, সঙ্গে বয়ে চলা নদীর ঘোলা জল তোলে কল কল ধ্বনি।এমনি এক নৈসর্গিক প্রকৃতির মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে কোন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করে কেটেছে অসংখ্য বিকেল।এই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে ভালোলাগা ভালোবাসার আবেগ অনুভূতিতে আপ্লূত হয়েছি অনেক বার। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুর গাছের নিচে বসে পানিতে পা ভিজিয়ে নদীর বয়ে চলার দৃশ্য দেখা আমার জীবনের এক অম্লান স্মৃতি।
এতক্ষণ যে ছোট্ট নদীর এতো কথা মনে আঙিনায় ভেসে উঠলো, সেই নদীটি এখন কালের আবর্তে বিলীন। এখন শুধুই স্মৃতি।নদীর এপার ওপারের মানুষের সহজ যোগাযোগের মাধ্যম একটি সেতুর দাবী ছিল দুই পাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের। বিগত বিএনপি সরকারের শাসন আমলের শেষের দিকে স্থানীয় প্রশাসন নিলো এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত, সেতু স্থাপন না করে বরং শুষ্ক মৌসুমে নদীর মাঝে বাঁধ নির্মাণ করে নদীটিকে বেধে দিলো।হত্যা করা হল একটি জীবন্ত যৌবনা নদীকে। তাদের কাছে এই নদীটি অতিরিক্ত অসহ্য মনে হয়েছিল।লোক মুখে কথিত, তৎকালীন স্থানীয় ক্ষমতাসীনরা হয়তো পরিকল্পনা করেছিল প্রমত্ত এই ছোট্ট নদীটিকে দীর্ঘ একটি দীঘিতে রূপান্তর করে মাছ চাষ করবে।এতে স্থানীয় মানুষদের কর্মসংস্থান হবে। দুই পাড় এক হয়ে গেলে ওপারের মানুষকে কেউ আর চরের মানুষ বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবেনা না।এই বাঁধের কারণে দুই পাড়ের মানুষ এক হয়ে শহুরে মানুষ হয়ে যাবে।এই জেলায় রইবে শুধুমাত্র একটি নদী তা হল জেলাশহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বৃহৎ মূল পদ্মা নদী। আজও মানুষের মনে সন্দেহ, বস্তুত কি পরিকল্পনায় এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো,এই সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বে নদীগবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের গবেষণা ছিল কিনা? কারণ পদ্মার এই সুতোনদীটির বুকে বাঁধ নির্মাণের পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে মূল পদ্মার ভাঙন শুরু হয়,আগ্রাসী ভাঙন! সেই ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হয় শতশত ঘরবাড়ী,স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা,ফসলি মাঠ।সেই ভাঙ্গনের ধারাবাহিকতায় কয়েক বছরের মধ্যে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায় চর সিলিমপুর, আম্বারিয়ার চরের মত বৃহত্তর গ্রাম।হাজার হাজার মানুষের জীবনে নেমে আসে দুঃসহ অন্ধকারের ভবিষ্যৎ। জমি ও বসত বাড়ী হারিয়ে চর অঞ্চলের এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বাস্তুহারা হয়ে পেশাগত সঙ্কটে পড়ে।বাধ্য হয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠী জেলা সদর ও এর আশে পাশের অনেক কৃষি জমি কিনে বসতি স্থাপন করে।অনেকেই স্থান নিয়েছে বেড়িবাঁধ,রাস্তার ধারে, কেউবা অন্যের জমিতে এখনও আশ্রিত। যার ফলে রাজবাড়ী জেলা সদর পরিণত হয় একটি ঘনবসতি অঞ্চলে।শহর হারিয়েছে তার নিজস্ব সৌন্দর্য, ওপারের বংশপরম্পরায় কৃষক, জেলে, নৌকা শ্রমিক হারিয়েছে জীবনের ছন্দ।তাদের কেউ এখন জেলা শহরে রিক্সা চালিয়ে,কেউ রাজমিস্ত্রি’র কাজ করে জীবন চালায়। অনেকেই বাধ্য হয়ে জীবীকার তাগিদে ঢাকার নগর জীবন বেঁছে নিয়েছে।দুচোখে স্বপ্ন নদীর বুকে আবার কবে জেগে উঠবে চর, আবার ঘর তুলবে পুরনো স্মৃতিবিজড়িত বাস্তুভিটায়।
এখন মূল পদ্মা নদী রাজবাড়ী জেলা শহরের কোল ঘেঁষে প্রবাহিত। প্রতি বছর নদীর ভরা মৌসুমে পদ্মার তর্জন গর্জনে তটস্থ হয়ে ওঠে শহরবাসীর জীবন। ভয়,এবার রাজবাড়ী শহর কি টিকতে পারবে পদ্মার আগ্রাসী আক্রমণকে প্রতিহত করে।শহর বাঁচাতে প্রতি বছর পদ্মার তীর চলে সরকারের শত শত কোটি টাকার কর্ম যজ্ঞ।এখন পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে সামনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে চোখে পরে আদিগন্ত জলরাশি।কল্পনায় ভেসে ওঠে এই পানির বুকে একসময়ের জেগে থাকা গ্রাম,মানুষের কোলাহল আর আমার ছেলেবেলার সুতোনদী।
ওই সময়ের ক্ষমতাসীন কোন এক গোয়ার,স্বার্থপর ও লোভী মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে পরিবর্তন হয়ে গেছে একটি জেলার মানচিত্র।পরিবর্তন হয়ে গেছে হাজার হাজার মানুষের জীবন যাত্রা।আমাদের দুর্ভাগা দেশের ঘাড়ে চেপে বসা লোভ লালসার নেতৃত্বের কারণে এমন অনেক ছোট ছোট ভুল সিদ্ধান্ত সমগ্র জাতিকেই সর্বনাশা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
ছেলেবেলার দুরন্তপনায় অনেক বার সাঁতার কেটে সুতো নদী পাড়ি দিয়েছি, সেই অভিজ্ঞতায় লোয়ার নদীর ধারে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল চাইলে এই ভিনদেশি নদীটিও সাঁতার কেটে পাড়ি দেয়ার সক্ষমতা এখনো আমার রয়েছে।অনেকক্ষণ প্রতীক্ষার পর ওপার থেকে খেয়াযাত্রী বহন করে খেয়াতরী জাহাজ এসে ঘাটে ভিড়ল।ওপারের খেয়াযাত্রীরা জাহাজ খালি করা মাত্র আমাদের অপেক্ষমাণ যাত্রীরা লাইন ধরে জাহাজে উঠতে লাগলো,নির্দিষ্ট যাত্রী সংখ্যা পূর্ণ হওয়ার পর জাহাজের নাবিক অনন্যা যাত্রীদের পরবর্তী খেয়ার জন্য অপেক্ষমাণ রেখে জাহাজ ছাড়ার প্রস্তুতি নিলো। ভাগ্য ভালো লাইনের সামনে থাকায় আমাদেরকে পরবর্তী খেয়ার অপেক্ষমাণ লাইনে আর দাঁড়াতে হল না।
লেখক -মুহাম্মদ গোলাম মোর্শেদ (উজ্জ্বল), প্যারিস, ফ্রান্স।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়






























































































