সংবাদ মাধ্যমকে মিথ্যে তথ্যদিয়ে পদ্মার সুস্বাদু মাছের প্রলোভনে প্রতারনা –
- Update Time : ১০:৩১:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ নভেম্বর ২০২১
- / ৫৪ Time View
আজু শিকদার, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
শাজাহান শেখ গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী। গুছিয়ে মিথ্যে বলতে পারা তার অতিরিক্ত যোগ্যতা। ইতিমধ্যে তিনি সারা দেশে পত্র পত্রিকার মাধ্যমে অতি পরিচিত একজন মানুষ। প্রায় প্রতিনিয়ত দেশের সনামধ্যন্য বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও টেলিভিশনসহ অনলাইনে তার ছবি দেখা যায়। পদ্মায় বিশাল সাইজের মাছ ধরা পড়লেই সেই মাছ ধরে ছবি তোলেন তিনি। অথচ তার প্রদর্শন করা সব মাছের উল্লেখিত ওজন সঠিক নয় এবং সব মাছই পদ্মারও না। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ সংগ্রহ করে পদ্মার মাছ হিসেবে বিক্রি করে থাকেন তিনি। এ ব্যবসায় তিনি এখন কোটিপতি। নিজের নামও পরিবর্তন করে স¤্রাট করেছেন নিজেই। এ নামেই তিনি বর্তমানে সাচ্ছন্দ বোধ করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পদ্মা নদীর গোয়ালন্দ এলাকার স্বাদের সুনাম দেশ ছেড়ে বিদেশেও ছড়িয়ে আছে। সেই সুনামকে পুজি করে দেশের বিভিন্ন এলাকার ধনাঢ্য মানুষকে বোকা বানানোর একটি চক্র গড়ে উঠেছে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায়। পদ্মায় ধরা পড়া বিভিন্ন মাছ বাড়িয়ে-বলিয়ে প্রচার করে ধনাঢ্য বিক্তিদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া দেশের অন্যান্য স্থান থেকে বড় বড় সাইজের মাছ এনে গোয়ালন্দের মাছ বলে চালিয়ে দিয়েও পকেট ভারি করছেন। এই চক্রের অন্যতম হোতা শাজাহান শেখ। তিনি কিছুদিন আগেও ছোট্ট ডালায় (ঝুড়ি) করে ফেরিতে মাছ ফেরি করে বিক্রি করতেন। কিন্তু বর্তমানে তিনি কোটিপতি। প্রতিষ্ঠিত দেশর সনাম ধন্য দৈনিক পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়াকে বোকা বানিয়ে ব্যবহার করে বর্তমানে সারা দেশে তার নেটওয়ার্ক।
শনিবার (২০ নভেম্বর) মাছ ব্যবসায়ী শাজাহান শেখ স্বভাবসুলভ ভঙিতে বলেন, ‘আজ পদ্মা নদীর চরভদ্রাসন ও চরকর্নেশনা এলাকায় ধরা পড়ছে বিলুপ্ত প্রজাতির ৫ কেজি ২শ গ্রাম ঢাই মাছ, ৪২ কেজির বাগাইড় ও ১০ কেজি ওজনের কোড়াল মাছ। সকালে মাছ গুলো বিকাশ ও রফিক নামের দুই জেলের জালে ধরা পড়ে। পরে মাছ গুলো শাজাহান শেখ ঢাই মাছটি ২ হাজার ৮শ টাকা কেজি দরে মোট ১৪ হাজার ৫৬০ টাকায়, বাগাইড় ১ হাজার ৫শ টাকা কেজি দরে মোট ৬৩ হাজার টাকায় ও কোড়াল ১ হাজার ৩শ টাকা কেজি দরে মোট ১৩ হাজার টাকায় কিনে নেন। পড়ে ঢাই মাছটি ২ হাজার ৯শ, বাগাইড় ১ হাজার ৬শ ও কোড়াল ১ হাজার ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।
মাছগুলো কোন আড়ত থেকে তিনি কিনেছেন জানতে চাইলে মাছের প্রকৃত ওজন ও দাম গোপন করতে প্রথমে তিনি বলেন, ‘আমি সরাসরি জেলের কাছ থেকে কিনেছি।’ কিন্তু কথার এক পর্যায়ে তিনি বলে ফেলেন, ঢাই মাছটি দৌলতদিয়া ঘাটের মোহন মন্ডলের আড়ত থেকে আমি কিনেছি। অন্য মাছ দুটি সম্পর্কে তিনি তার আগের কথায় অটল থাকেন। অনুসন্ধান করতে ওই মাছের আড়তে গেলে কিছুটা কৌশলে তারা জানায়, ঢাই মাছটি ২ হাজার ৭শ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এখানেও কেজিতে ১শ টাকা গরমিল ধরা পরে। ওজনের বিষয়টি প্রথমে বলে ১ কেজি ৮শ গ্রাম। কিন্তু যখন জিজ্ঞোসা করা হয়, শাজাহান শেখ তো মাছের ওজন আরো কম বলেছেন, তখন আড়ত কর্তৃপক্ষ বলেন, একটু পরে জানাচ্ছি। বুঝতে বাকি থাকল না যে, শাজাহান শেখের কাছ থেকে বিস্তারিত শুনে তিনি জানাবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় অপর এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, শুক্র-শনিবারে দৌলতদিয়া পদ্মা নদীতে ৪০/৪২ কেজির কোন বাগাইড় মাছ ধরা পড়েনি। দৌলতদিয়া মাছ বাজারে এ সাইজের কোন বাগাইড় মাছ বিক্রিও হয়নি।
জানা যায়, শাজাহান শেখ বড় বড় মাছ সংগ্রহ করে নিজেই বিভিন্ন ভাবে ছবি তুলে ও মনগড়া তথ্যদিয়ে অসংখ্য সাংবাদিকের ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটস আ্যপ, মেইলে দিয়ে থাকেন। আর বড় মাছের পাঠক থাকায় প্রায় সকল মিডিয়া গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে থাকে। এতেই বেড়ে যায় শাজাহানের কদর। মাছের ওজন ও দাম দ্বিগুন হাকিয়ে সেটা প্রমান করার জন্য মিডিয়ার সংবাদকে ব্যবহার করে থাকেন তিনি। এই কারবার করে শাজাহান শেখ ইতিমধ্যে দু’টি ভেকু (এক্সকেভেটর), একাধিক ট্রাকের মালিক হয়েছেন। পাল্টে গেছে তার জীবনযাত্রা।
শাজাহান শেখ ছাড়াও দৌলতদিয়া ঘাটে একই কায়দায় সারা দেশে মাছ বিক্রি চক্রে রয়েছেন, স্থানীয় চান্দু মোল্লা, সোহেল মিয়া, নুরু শেখ, শওকত মুন্সি, শামছু শেখ, লাল চাঁদ খান, রশিদ মিয়াসহ ১০/১২ জন।
দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ‘আমিও দেশের বিভিন্ন স্থানে পদ্মার বড় বড় মাছ সততার সাথে বিক্রি করে থাকি। কারো সাথে কোন প্রকার প্রতারনার আশ্রয় নেই না। প্রায়ই আপনাদের পত্রিকায় দেখতে পাই ১০ কেজির মাছ ২৫ কেজি বলে সংবাদ প্রকাশ করেন। আমাদের কাছে আপনাদের একটা সম্মান ছিল, কিন্তু এ ধরনের সংবাদ দেখে সেই সম্মান ম্লান হয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার (১৮ নভেম্বর) বিভিন্ন পত্রিকায় দেখলাম পদ্মায় ১০ কেজি ওজনের কোড়াল মাছ ধরা পড়েছে। আসলে ওই কোড়াল মাছের ওজন ছিল ৭ কেজির কম এবং ওই মাছ খুলনা থেকে শাজাহান শেখ এনেছিল।’ বড় মাছ ক্রয়ে শাজাহান শেখ কোন প্রভাব বিস্তার করে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, পদ্মা আসল বড় মাছ তিনি শাজাহানের চেয়ে কম কেনা-বেচা করেন না। তবে তা পত্রিকায় দিতে হয় না। স্বাভাবিক ভাবেই বিক্রি হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি নিউজ হওয়ার জন্য একটা বিশেষ বড় আকারের মাছ প্রয়োজন হয়। প্রতিনিয়ত যে সকল মাছ পদ্মায় ধরা পড়ে তা আপনাদের মত বড় পত্রিকায় নিউজ হওয়ার যোগ্য না। অন্যরা দশ কেজির মাছ ২৫/২৬ কেজি বলে সাংবাদিকদের দিয়ে নিউজ করায়। আমি তা করি না। ৪০/৫০ কেজি ওজন না হলে সেটা কি কোন নিউজ হলো? আপনাদের একটা সম্মান আছে না?’
পদ্মায় মাছ শিকার করা জেলে কৃষ্ণ হালদারের কাছে বিকাশ ও রফিক নামের কোন জেলেকে তিনি চেনেন নাকি জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, পদ্মায় অনেক জেলে মাছ শিকার করে থাকে। সবাইকে তো আর তিনি জেনেন না। বিকাশ ও রফিক নামের কোন জেলেকে তিনি চেনেন না। বড় আকারের মাছ সম্পর্কে তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) একটি ১০ কেজি ওজনের কাতল মাছ তিনি শিকার করেছেন। কাতল মাছটি তিনি দৌলতদিয়া মোল্লা আড়তে বিক্রি করেছেন।’
কিন্তু সেই কাতলা মাছটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন অনলাইনে ১৫ কেজির কাতল হিসেবে ছবি সহ প্রকাশিত হয়েছে। এ কাতলা মাছটির সাথে ছবি তুলেছেন দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী চান্দু মোল্লা।
নাম প্রকাশ না করে স্থানায়ী একাধিক সংবাদকর্মী জানান, প্রত্যেক সংবাদকর্মীর সংবাদ পরিবেশন করার একটা ক্ষুদা আছে। এই ক্ষুদাকে কাজে লাগিয়ে দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী শাজাহান শেখসহ দু’একজন সাংবাদিকদের বোকা বানিয়ে অনৈতিক রমরমা ব্যবসা করে অঢেল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। বিনা পরিশ্রমে ছবি ও ভিত্তিহীন তথ্য পেয়ে সাংবাদিকরাও তা মিডিয়ায় প্রকাশ করে যাচ্ছেন। যে কারণে পদ্মার মাছের সংবাদের স্থানীয় পাঠকদের কাছে বিদ্রুপের খোরাক হয়ে পড়ছেন। যেটা কোন ভাবেই কাম্য নয়।
গোয়ালন্দ প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শামীম জানান, শাজাহান শেখ সহ অন্যান্যরা তাদের অসত্য সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ না করে জেলা ও জেলার বাইরের সাংবাদিকদের সাথে বেশী যোগাযোগ করে থাকে। কারণ স্থানীয় সাংবাদিকরা সরেজমিন মাছের ওজন ও দাম সহজেই উদ্ধার করতে পারেন। এরপর যখন ওই সংবাদ কোন মিডিয়ায় প্রকাশ হয়, তখন অফিসের চাপে বিলম্বে হলেও বাধ্য হয়ে অসহায়ের মত ওই সংবাদ পাঠাতে হয়। তিনি আরো বলেন, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কথা মত মাছ নিয়ে উপস্থিত হলে তারা তো আর ওই মাছের ওজন করে দেখেন না। পত্রিকায় প্রকাশিত ওজন হিসেবেই মূল্য পরিশোধ করে থাকেন। এরপরও বকশিস দিয়ে থাকেন।
দৌলতদিয়া ঘাটের একতা মৎস্য আড়তের মালিক দুলাল মন্ডলের ছেলে মো. রেজাউল মন্ডল জানান, শাজাহান শেখ সহ অন্যান্যরা ফরিয়া মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের ও অন্যান্য আড়ত থেকেই মাছ কিনে নেন। তিনি বলেন, ‘ধরেন আমাদের আড়ত থেকে একটি ১২ কেজির কাতল মাছ কিনে নিয়ে গেলো, পরেরদিন পত্রিকায় দেখি ২৫ কেজির কাতল, আবার আমাদের কাছ থেকে যে দামে কিনেছে, পত্রিকায় দেখি তার চেয়ে অনেক বেশী দাম, তখন বিষয়টি খুবই হাস্যকর মনে হয়।’
পদ্মায় নিয়মিত মাছ শিকার করা জেলে পরান হালদার জানান, তারা সরাসরি শাজাহান বা অন্য কোন ফরিয়া ব্যবসায়ীর কাছে কখনো মাছ বিক্রি করেন না। তারা নির্দিষ্ট আড়তে মাছ বিক্রি করে থাকেন। তিনি হতাশার সুরে বলেন, বর্তমানে বড় মাছ খুবই কম ধরা পড়ছে। কিন্তু পত্রিকায় অনেক বড় বড় মাছ ধরা পড়ার খবর দেখি। কয়েক মাস আগে আমার জালে একটি ২২ কেজি ওজনের পাঙাল ধরা পড়েছিল। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম ৩৬ কেজির পাঙাসের খরব।
সরেজমিন গত ১৭ নভেম্বর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ইউছুফ শেখ ও সোহেল মোল্লা নামের দুই ব্যাক্তি দুটি বড় সাইজের চিতল মাছ বিশেষ ভাবে ধুয়ে রং উজ্জল করছে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, এ দু’টি আজ পদ্মায় ধরা পড়েছে। ওজন ১৩ কেজি। এসময় ওজন করে দেখতে চাইলে তারা রাজি হলেন না। তাদের জিজ্ঞেস করলাম কোন আড়ত থেকে মাছ দুটি কিনেছেন? তার জানালো মোহন মন্ডলের আড়ক থেকে। কিন্তু ওই আড়তে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে তারা জানালেন, তাদের আড়ত থেকে আজ কোন চিতল মাছই বিক্রি হয়নি। বুঝতে বাকি থাকল না ওই মাছ কোন পুকুর অথবা বিলের, পদ্মা নদীর না।
দৌলতদিয়া মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি মোহন মন্ডল জানান, আমরা যারা আড়তদার আছি তারা জেলেদের জাল-নৌকা বাবদ লক্ষ লক্ষ টাকা দাদন দিয়ে জেলেদের কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে মাছ কিনি। অথচ শাজাহানসহ অন্যান্য ফড়িয়ারা আমাদের কাছ থেকে বাকিতে মাছ কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানের ধনাঢ্য ব্যাক্তিদের কাছে কয়েকগুন বেশি টাকায় সেই মাছ বিক্রি করে থাকে। তারা কি শুধু গোয়ালন্দের পদ্মার মাছ বিক্রি করেন, না কি অন্য জায়গার মাছও বিক্রি করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দৌলতদিয়ায় বড় মাছের চাহিদা আছে। আর চাহিদা থাকলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ তাদের আড়তে আসবে এটাই স্বাভাবিক।’
এ সব বিষয়ে মাছ ব্যবসায়ী শাজাহান শেখকে প্রশ্ন করলে তিনি ক্ষোভের সাথে অস্বীকার করে বলেন, ‘আপনার যদি মনে হয় আমি মাছের ব্যাপারে মিথ্যে তথ্য দেই, তাহলে আপনি নিউজ করবেন না। আপনাকে নিউজ করার জন্য তো আর আমি জোড় করছি না।’
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































