“মাস্টার না কি শিক্ষক” -লেখক : শিপন আলম –
- Update Time : ০৫:৫৬:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২১
- / ৫৫ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
প্রথমেই একটি কৌতুক দিয়ে শুরু করতে চাই। কৌতুকটি আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে শোনা। দরিদ্র পরিবারের একটি ছেলে তার লেখাপড়ার খরচ মেটানোর জন্য ছোটবেলা থেকেই প্রাইভেট টিউশন করতো। তাই সবাই তাকে মাস্টার বলে ডাকতো। শিক্ষা জীবন শেষ করে সে একটি কলেজের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পায়। এক ছুটিতে সে গ্রামে বেড়াতে আসে। কুশলাদি বিনিময় শেষে তার বড় ভাই যখন জানতে পারে তার ছোট ভাই কলেজের শিক্ষক হয়েছে তখন সে জিজ্ঞেস করে- অ্যা রে, তুই কি সারা জীবন মাস্টারই থাকবি নাকি চাকরি বাকরি দেখবি? কৌতুকের বড় ভাইয়ের মতো এদেশের অনেক মানুষই এখনো জানে না যে শিক্ষকতা একটি পেশা। বড়জোর তারা মনে করে এটি জীবিকা নির্বাহের একটি উপায় বা অবলম্বন মাত্র।
বিশেষ করে শিক্ষা ক্যাডার নামে যে একটি স্বতন্ত্র বিসিএস ক্যাডার রয়েছে এটি দেশের অধিকাংশ মানুষই জানে না। আর যারা জানে তারাও মানতে চায় না যে শিক্ষা ক্যাডার, ক্যাডার সার্ভিসের একটি অংশ। তাদের ধারণা যে সম্পূর্ণ অমূলক সেটিও কিন্তু নয়। বরং এ ক্যাডারের অত্যন্ত অপ্রতুল সুযোগ সুবিধা ও সংকীর্ণ কর্মপরিধির দিকে দৃষ্টিপাত করলেই এ সত্যের পরিচয় পাওয়া যায়। এ ক্যাডারে বাড়ি নেই, গাড়ি নেই, বিদেশ ভ্রমণ নেই, ঠিকমতো পদোন্নতি নেই, ওয়ারেন্ট অফ প্রিসিডেন্সে জায়গা নেই, কার্যকর কোন সমিতি নেই, করিতকর্মা কোন নেতৃত্ব নেই, আছে শুধু ১৫ হাজার সদস্যের এক বিশাল অগোছালো আর বিশৃঙ্খল একটি পরিবার। সার্বিক বিবেচনায় কবি গুরুর সেই কবিতার চরণটির ঢঙেই বলতে হয়- পনের হাজার সদস্যের হে বিমুগ্ধ পরিবার, রেখেছ মাস্টার করে, ক্যাডার করো নি!
শিক্ষা ক্যাডার এমন একটি ক্যাডার যে ক্যাডারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু নাই আর নাই। আর এই নাইত্ব ঘোচানোর জন্য যদিওবা মাঝে মাঝে আমাদের কেউ কেউ বিবেকের তাড়নায় উপরওয়ালাদের কাছে ধরণা দেয় তখনই শিক্ষা ক্যাডারসহ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকদের প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধাবোধ জেগে ওঠে। তারা তখন পোষা পাখির মতো মুখস্থ কিছু বুলি আওড়াতে থাকেন- শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এর চেয়ে ভালো ও মহৎ পেশা দুনিয়াতে আর একটিও নেই। শিক্ষকরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। এ পেশায় যারা আসেন তারা এ পেশাটিকে ভালবেসেই আসেন। চাওয়া পাওয়া থাকলে জ্ঞান বিতরণ বাধাগ্রস্ত হয়। আমার যা কিছু অর্জন সব শিক্ষকদের কল্যাণে। আমি ছোটবেলায় আমার শিক্ষকদের যে পরিমাণ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে দেখেছি সে তুলনায় আপনারা ভালোই আছেন। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হলে আপনারাও এর সুফল ভোগ করবেন ইত্যাদি নানা জ্ঞানগর্ভ কথায় আসল প্রসঙ্গটিই তখন হারিয়ে যায়। তাদের মতে এ পেশায় যারা নিয়োজিত আছেন তারা হবেন নিরীহ গোছের। তাদে মধ্যে এতো চাওয়া পাওয়া থাকবে কেন, তারা হবেন চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে। তারা হবেন ঋষি মুণিদের মতো। যা পাবেন তাই কোন ধরণের বাক্য বিনিময় ছাড়াই গ্রহণ করবেন। না দিলে না নিবেন। তারা হবেন ব্যক্তিগত সাধ আহ্লাদের ঊর্ধ্বে। তাদের পরিবার থেকেও না থাকার ভান করতে হবে। সামাজিক জীব হয়েও নিজেকে ভাববেন সমাজচ্যুত। তারা এক বগলে লম্বা ছাতা আরেক বগলে দুই এক খানা বই বগল দাবা করে চটি স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে সকাল বেলায় পায়ে হেঁটে রওনা দিবেন আর সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরবেন। এ দৃশ্য দেখেই উপরওয়ালারা বড় হয়েছেন।
শৈশবের এই স্মৃতিই তাদের তাড়িয়ে বেড়ায় সারাক্ষণ। এমনকি তারা নিজেরা প্লেনে চড়েও শৈশবের সেই স্কুলের শিক্ষককে পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে দেখে পরিতৃপ্তি বোধ করেন। অস্ত্র আর কলম যাদের হাতে তারা এ ক্যাডারকে মাস্টারি ক্যাডার ছাড়া আর কিছু ভাবেন না। আর এ ক্যাডারে যারা নিয়োজিত আছেন তাদেরকে ভাবেন মাস্টার। মাস্টার কথাটির আভিধানিক অর্থ কিন্তু খারাপ নয়। কোন কিছুর মালিক হওয়া বা তার ওপর প্রভুত্ব কায়েম করা অর্থে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। যেমন আগের দিনের জমিদারগণ তাদের প্রজাদের নিকট মাস্টার হিসেবে সমাদর পেতেন। সমাজের বা রাষ্ট্রের প্রতিপত্তিশালী ও আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের মাস্টার নামে অভিধায় করলে সেটি সর্বজনের সমাদর পায় এবং যাদের সম্বোধন করা হয় তারাও পরিতৃপ্তিবোধ করেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সামর্থহীন নিরীহ গোষ্ঠীটিকে মাস্টার নামে সম্বোধন করলে প্রকারান্তরে তাদের সাথে টিটকারি করা হয়, উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপমান করা হয়। বড় লোকের সন্তানরা ছেঁড়া কাপড় পড়লে সেটি যেমন স্টাইল হয়, ফ্যাশন হয় ঠিক একই কাপড় দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা পড়লে সেটি সবার নিকট গরীবানা হিসেবেই পরিচিতি পায়। তাই শিক্ষকদের মাস্টার নামে সম্বোধন তাদেরকে বড় করা নয় বরং হেয় করা, অপমান করা। অন্যদের হাসি তামাশার উদ্রেক করা।
লেখক- শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগরাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































