“মহান মে দিবস” – লেখক : ক্রিস্টিনা মারিও রেখা দাস
- Update Time : ১১:৩৩:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২২
- / ৬৮ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।সকল মেহনতী মানুষদেরকে জানাই মে দিবসের শুভেচ্ছা।এই দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমিকদের ঐতিহাসিক সংগ্রামের কথা। এই দিনটিকে শ্রমিকদের প্রতি অবিচারের অবসান ঘটাবার সুতিকাগার বলা হয়। এই দিনটি শ্রমিকদেরকে তাদের অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করে। ১৮৮৬ সালের ৩ মে শহিদ শ্রমিকদের আত্মত্যাগের ফলে আজ শ্রমিক শ্রেণি বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে। বিন¤্র শ্রদ্ধা জানাই শহিদ শ্রমিকদেরকে।
১৪৯২ সালে ক্রিষ্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় প্রবেশ করেন। এরপর ইউরোপিয়রা স্থানীয়দের উচ্ছেদ করে আমেরিকা দখল করে। শুরু হয় কৃষিকাজ। তবে এই বিশাল ভূখন্ডে কাজ করার মতো জনবল ছিল না।আফ্রিকা থেকে কালো মানুষদেরকে ধরে আনা হতো কৃষিকাজ করার জন্য। শুরু হলো দাস ব্যবসা। শুরুতে দাস ব্যবসা ছিল পুর্তগীজ ও স্প্যানিসদেও হাতে। তবে পরবর্তীতে সর্বত্র দাস ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে।্ ১৮০৮ সালে আমেরিকায় দাস ব্যবসা নিষিদ্ধ হলেও সম্পূর্নভাবে বন্ধ হয় ১৮৬০ সালে। ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলায় ১৮৪৩ সালে দাস প্রথা বন্ধ হয়।
অষ্টাদশ শতাব্দির মাঝামাঝি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির জায়গা দখল করে নেয় শিল্প ভিত্তিক অর্থনীতি। শিল্প বিপ্লব বৃটেনে শুরু হলেও ধীওে ধীওে অন্যান্য মহাদেশের এর ছোঁয়া লাগে।যন্ত্রচালিত কলকারখানার প্রসার ঘটে। এসব কারখানায় প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকেরঅ ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সৃষ্টি হয় দুই শ্রেণির মানুষ মালিক ও সর্বহারা শ্রেণি। শ্রমিকদের কর্মঘন্টা নির্দ্রিষ্ট ছিল না। মালিকশ্রেণি শ্রমিকদের শ্রম শোষণ করতো। ১৯ শতকের প্রথম দিকে শ্রমিকরা কলকারখানায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সামান্য মজুরীর বিনিময়ে দৈনিক ১০Ñ১২ ঘন্টা কাজ করতো। এমনকি ১৬Ñ১৮ ঘন্টা কাজ করার নজিরও রয়েছে।
১৮৮০ সালে আমেরিকার শ্রমিকরা সর্বপ্রথম ৮ ঘন্টা কাজের দাবি জানায়। মালিকশ্রেণি তাতে কর্ণপাত করেননি। ১৮৮৬ সালের ১লা মে কর্ম পরিবেশ উন্নয়ন, দৈনিক আটঘন্টা শ্রম এবং মুজুরী বৃদ্ধিও দাবীতে শ্রমিক নেতা জোয়ান মোষ্ট, অগাষ্ট ষ্পীজ এবং লুই লিং এর নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শিল্প ধর্মঘট শুরু হয়। মালিকপক্ষ বর্বর পন্থায় এই আন্দেলনকে দমন করার চেষ্টা করে। ৩ মে ধর্মঘটে সমবেত শ্রমিকদের উপর পুলিশ গুলি চালায়, ৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং বহু শ্রমিক আহত হয়।
১৮৮৬ সালের ৪ মে হে মার্কেট নামক স্থানে শ্রমিকরা সমবেত হয়।সেখানে বক্তব্য রাখেন অগাষ্ট স্পীজ।হঠাৎ বোমা বিস্ফোরনে এক পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু ঘটে।পুলিশের গুলিতে ১১ জন শ্রমিক নিহত হয়। বোমা বিষ্ফোরনের
ঘটনায় ৮ জন শ্রমিককে আটক করা হয়। ১জনকে ১৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয় এবং ৭ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় কার্যকর হয়। রায় ঘোষনার পর একজন আতœহত্যা করেন এবং ৬ জনকে ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর জন সম্মুখে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরে জানা যায় যে শ্রমিকদেরকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে তারা দোষী ছিলেন না। ১৯৮৯ সালে ফান্সের প্যারিসে ফরাসী বিপ্লবের দুইশত বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে ১৯৯০ সাল থেকে এই দিবসটি পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপি এই দিনটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
১লা মে বাংলাদেশে সরকারী ছুটির দিন। শ্রমিকরা পূর্বসূরীদের স্মরনে উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে দিনটি পালন করেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন কল্যানমুখী কর্মসূচির আয়োজন করে। প্রশ্ন থেকে যায় মে দিবস পালন কতটা সার্থক ও সাফল্যমন্ডিত হচ্ছে। আমাদের দেশের শ্রমিকদের অবস্থানটা কোথায়? তারা কি তাদের ন্যায্য অধিকার ভোগ করছে ?
কলকাখার মালিকরা শ্রমিকের শ্রমকে পুজি করে টাকার পাহাড় গড়ছে অন্যদিকে শ্রমিকদেরকে থাকতে হচ্ছে পথের পাশে, নোংরা বস্তিতে কাজের নিশ্চয়তা নেই জীবনের নিরাপত্তা নেই। অনুন্নত কর্ম পরিবেশে জীবনের ঝুকি নিয়ে কর্মস্থলে কাজ করতে হচ্ছে। আট ঘন্টা কাজ করে খাবারের সংস্থান না হওয়ায় অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। মাথায় ঘাম পায়ে ফেলে শ্রমিকরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। শুধুই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে মধ্য দিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত জীবন নিয়ে এগিয়ে চলেছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। মাত্রাতিরিক্ত পরিশ্রমে শ্রমিকের দক্ষতা নষ্ট হচ্ছে,রোগব্যধি শরীরে বাসা বাঁধছে ফলে তাদের আয়ু কমে যাচ্ছে। ন্যায্য মজুরী পেলে হয়তো তাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হতো না। বিভিন্ন অজুহাতে নারী শ্রমিকদেরকে পুরুষের সমান মজুরী প্রদান করা হয়না । এছাড়া বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা দেশের ভিতরে এবং বাইরে কাজ করতে গিয়ে নির্মম অত্যাচারের শিকার হচ্ছে। এই নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা দাস প্রথায় ভয়ংকর অত্যাচারের তুলনায় কোন অংশে কম নয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা মেধাশ্রম দিচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রের একই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে ১১-১২ ঘন্টা কাজ করতে হয়।
শ্রমিকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন আইন আছে যেমন : শ্রম আইন ২০০৬, সংশোধিত শ্রম আইন ২০১৩ ও শ্রমবিধি ২০১৫ শ্রমিকদের মামলা মকদ্দমার জন্য বাংলাদেশে রয়েছে শ্রম আদালত। আইন সম্পর্কে বেশিরভাগ শ্রমিকের
কোন ধারনার নেই। ফলে তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ও অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। আবার ধারনা থাকলেও কাজ হারানোর ভয়ে তারা তাদের সমস্যা নিয়ে শ্রম আদালত পর্যন্ত পৌছায় না। যাদের শ্রমে ঘামে সভ্যতা পৌছে যাচ্ছে উন্নয়নের শীর্ষে সেই শ্রমিক শ্রেনীর প্রাপ্য সর্বোচ্চ সম্মান, নিরাপদ নিশ্চিত জীবন এবং যথাযথ মর্যাদা। শ্রমিকদের এই দু:সহ জীবন থেকে মুক্তির জন্য সরকারসহ মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরী, অন্যান্য সুযোগ সুবিধার সাথে অবসর ভাতা এবং স্বাস্থ্যকর বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রম শোষন বন্ধ করতে হবে। সমতার রাজ্য কায়েম করতে হবে।
শ্রমিকদের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক মে দিবস সফল হোক।রিক্ত সিক্ত শোষিত বঞ্চিত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।
লেখক
ক্রিস্টিনা মারিও রেখা দাস
সাধারন সম্পাদক
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
রাজবাড়ী জেলা শাখা।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়



































































































