“বিকাশ বনাম নগদ : প্রতিযোগিতা ও সেবা “-লেখকঃ শিপন আলম –
- Update Time : ১০:১৭:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ নভেম্বর ২০২১
- / ৫৭ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যবসায় সংগঠন প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে মুনাফা অর্জন। ব্যবসায়ে সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি বিষয়টি থাকলেও এটিও ব্যবসায়িকগণ মুনাফা অর্জনের পথে তাদের বিজ্ঞাপনী কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে। উদ্দেশ্য- সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ ও অধিক সংখ্যক গ্রাহকের কাছে পৌছানো যা প্রকারান্তরে মুনাফা অর্জন কৌশলকেই শক্তিশালী করে। তাই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যবসায় নৈতিকতা গ্রাহক পর্যায়ে এখনো অনেকটা অধরাই রয়ে গিয়েছে। সেবামূলক ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদগণ তাই বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা বৃদ্ধিকে বাজার ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা আনয়নের বহুবিধ কৌশলের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করেন। বাজারে নির্দিষ্ট সেবার প্রত্যাশিত সংখ্যক প্রতিযোগীর উপস্থিতি সেবার ধরণ, মান ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিপুল জনসংখ্যার উপস্থিতি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়নের প্রভাব, চাহিদা আর রুচির ক্রমবর্ধিষ্ণু পরিবর্তন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় সাফল্য প্রতিনিয়ত আমাদেরকে নতুন নতুন সেবা ও পণ্য উদ্ভাবনে প্রভাবিত করছে। ইন্টারনেটভিত্তিক মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এ ধরণেরই নতুন উদ্ভাবিত জনপ্রিয় ব্যাংকিং সেবা যা ব্যাংকিং সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌছে দিয়েছে।
১৯৯৯ সালে স্মার্টফোন চালু হওয়ার সাথে সাথে ইউরোপীয় ব্যাংকগুলো মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবার দ্বার উন্মুক্ত করলেও আমাদের দেশে এটি চালু হতে অপেক্ষা করতে হয় আরো প্রায় এক দশক। ২০১১ সালে ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেড- এর হাত ধরে দেশে মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবার দ্বার উন্মুক্ত হলে ব্যাংকিং সেবায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়। দেশে বর্তমানে এটিসহ মোট ১৫ টি মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রয়েছে। শুরুতে এটির নাম ছিল ডাচ-বাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস কিন্তু এতো বড় নাম কাস্টমারের পক্ষে মনে রাখা কঠিন হওয়ায় ‘প্রোডাক্ট পজিশনিং’ ঠিকমতো হয় নি। ফলে ২০১৬ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রকেট’। কিন্তু ততদিনে এটির যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে।
রকেট আসার পর ঐ বছরেই ব্র্যাক ব্যাংকের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে দ্বিতীয় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘বিকাশ’ বাজারে আসে। বিকাশ আসার পরেই মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবা শহরের অলিগলিসহ গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিযোগিতা আসে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায়। বিকাশ তার উদ্ভাবনী ধারণা আর বিপণন কৌশলকে কাজে লাগিয়ে খুব তাড়াতাড়ি গ্রাহককে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। তার এ কৌশলের কাছে পরাজিত হয় রকেট। ফলে ধীরে ধীরে মার্কেট চলে যায় রকেট থেকে বিকাশের পকেটে। বলতে গেলে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম হয় তার। ফলে গ্রাহকদের নতুন নতুন সেবা পরিচিতকরণের মাধ্যমে সার্ভিস চার্জের হারও বৃদ্ধি করতে থাকে বিকাশ। প্রথমদিকে শুধু ক্যাশ আউট চার্জ বাবদ হাজারে ১.৮৫% বা ১৮.৫০ টাকা কর্তন করা হতো। বিকাশ এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করলে অবশ্য ২০ টাকা প্রদান করতে হতো। প্রথমদিকে সেন্ড মানি বাবদ কোন চার্জ করা না হলেও মাঝে প্রতি সেন্ড মানিতে ৫ টাকা করে সার্ভিস চার্জ কর্তন শুরু করে। বিদ্যুৎ বিলসহ সকল ইউটিলিটি বিলের জন্য ১% হারে সার্ভিস চার্জ কর্তন শুরু করে। বিকাশ হয়তো ভেবেছিলো তারা যেভাবে তাদের পণ্যের প্রসার করেছে, নতুন নতুন সার্ভিস যুক্ত করেছে, গ্রাহকের মনে যেভাবে বিকাশকে গেঁথে দিয়েছে, যেভাবে রকেটকে পরাভূত করেছে তাদের সামনে হয়তো ভবিষ্যতে আর কোন প্রতিযোগী দাঁড়ানোর সাহস করবে না। কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। বিকাশের ভাগ্যেও তেমনটি ঘটেছে। সহসাই তাদের জন্য মার্কেটে নতুন এক প্রতিযোগীর আবির্ভাব ঘটে। নাম তার নগদ। অন্য সার্ভিসগুলোর উপর খুব একটা ফোকাস না করেও শুধু ক্যাশ আউট চার্জ কম করেই সে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে।
দেশের সর্বনিম্ন ক্যাশ আউট চার্জ ৯.৯৯ টাকা ধার্য করে সে (ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে রকেট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ক্যাশ আউট চার্জ অবশ্য ৯.৯০ টাকা)। গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষসহ অধিকাংশ মানুষেরই এটি প্রথম চাহিদা হওয়ায় গ্রাহকরা অনেকটা হুড়মুড় করে পড়ে নগদের উপর। ফলে খুব তাড়াতাড়িই বিকাশের একচেটিয়া মার্কেট দখলদারিত্বের পতন ঘটতে থাকে। তাই পর্দার আড়ালে তারা বিভিন্ন দরবার শুরু করে দেয় নগদকে তার ক্যাশ আউট চার্জ বিকাশের কাছাকাছি করার জন্য। সে চাপে প্রথম দিকে খুব একটা সাড়া না দিলেও অল্প কিছু দিনের ব্যবধানে তাদের ক্যাশ আউট চার্জ বিকাশের কাছাকাছি (হাজারে প্রায় ১৬ টাকায়) নিয়ে আসে। গ্রাহকরা এতে করে মনঃক্ষুণ্ণ হলেও বিকাশ খুশি হয়। কিন্তু গ্রাহকের মনঃক্ষুন্নের কারণে নগদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়। ফলে নগদ তার মার্কেট স্ট্রাটেজিতে পরিবর্তন নিয়ে আসে, বিকাশের চাপের কাছে আর নতি স্বীকার না করে আগের ক্যাশ আউট চার্জে ফেরত আসে। নগদের সর্বনিম্ন রেট কৌশলের কাছে টিকতে না পেরে বিকাশ বর্তমানে শর্তসাপেক্ষে হলেও মাসে পাঁচটি প্রিয় নাম্বার ও একটি প্রিয় এজেন্ট নাম্বারে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হাজারে ১৪.৯০ টাকা চার্জ ধার্য করে যার বিজ্ঞাপনে এখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সয়লাব হয়ে গেছে। বিকাশের এ কৌশলে নতুন ও পুরাতন গ্রাহক কতটুকু সাড়া দিবে তা সময়ই বলে দিবে তবে এতে করে তাদের সম্মান যে বাড়ে নি এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।
নগদের সমান ক্যাশ আউট চার্জ ধার্য না করলেও অতিরিক্ত চার্জের প্রায় ৫০% কমিয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটি। প্রতি সেন্ড মানিতে বিকাশ আগে ৫ টাকা করে কর্তন করতো এখন সেখানে মাসে ৫ টি প্রিয় নাম্বারে সেন্ড মানি ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছে। নগদে অবশ্য সেন্ড মানি একদম ফ্রি। নগদে যেখানে ইউটিলিটি বিল চার্জমুক্ত সেখানে বিকাশ অ্যাপসের মাধ্যমে যেকোন পরিমাণের ইউটিলিটি বিল পরিশোধের জন্য মাঝে ১% করে চার্জ কর্তন করা হতো। এখন অবশ্য মাসে সর্বোচ্চ দুইটি ইউটিলিটি বিল ফ্রি পরিশোধ করা যায়।
ব্যাংকের মতোই বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের গচ্ছিত আমানতের ওপর মুনাফা প্রদান করছে। এক্ষেত্রেও বিকাশের ব্যবসায়িক মনোভাব এবং নগদের গ্রাহক স্বার্থ রক্ষার সদিচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে। নগদের মুনাফামুক্ত আমানত সীমা যেখানে মাত্র ১,০০০ টাকা বিকাশের সেখানে ১৫,০০০ টাকা। ১,০০১ টাকা থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত গ্রাহকের আমানতের ওপর নগদ ৪% এবং ৫,০০১ থেকে তদূর্ধ্ব আমানতের উপর ৬% মুনাফা প্রদান করে। অপরদিকে, বিকাশ
১৫০০১ টাকা থেকে ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত আমানতের ওপর ৩% এবং ৫০,০০১ টাকা থেকে তদূর্ধ্ব আমানতের ওপর ৪% মুনাফা প্রদান করে।
বিকাশের সেবার বিনিময়ে অধিক পরিমাণ মুনাফা নিজের পকেটে রাখা আর গ্রাহককে কম পরিমাণ দেওয়ার মানসিকতা তার নিজের এবং নতুন গ্রাহককে নগদের দিকে ধাবিত হতে বাধ্য করেছে। তাই ১০ বছরে বিকাশের মার্কেট শেয়ার যেখানে ৫ কোটি গ্রাহক নিয়ে ৩৫%-৪০% সেখানে মাত্র দুই বছরে ৪ কোটি গ্রাহক নিয়ে নগদের মার্কেট শেয়ার ৩০-৩৫%। বিকাশের দৈনিক লেনদেন যেখানে ৪৫০ কোটি টাকা, নগদের সেখানে ৪০০ কোটি টাকা। অল্প সময়ে এতো তাড়াতাড়ি নগদের মার্কেট দখল বিকাশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। এটি তাই এখন তার মোড়লীপনা স্বভাব পরিহার করে আপন দূর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠার চেষ্টায় রত। বিকাশ যেখানে তার আপন মার্কেট ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে নগদ সেখানে দ্রুত বর্ধনশীল মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
বিকাশ আর নগদের এ প্রতিযোগিতা শুধু সার্ভিস প্রদান, চার্জ কর্তন আর মুনাফা প্রদানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রমোশনাল কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান যা বর্তমানে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে প্রদর্শিত বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। বিকাশ আর নগদের এই প্রতিযোগিতায় কে জিতবে আর কে হারবে এটি তারাই ঠিক করুক। আমাদের গ্রাহকদের চাওয়া শুধু সহনীয় চার্জের বিনিময়ে উন্নত সেবা। এতেই আমাদের স্বস্তি, এতেই আমাদের তৃপ্তি।
-লেখকঃ শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































