“বাংলার বর্ষা”- সুনীল কুমার বিশ্বাস –
- Update Time : ১১:২২:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১
- / ৮৯ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
এখন আষাঢ় মাস – বাংলায় বর্ষা হলো শুরু, তাই শোনা যায় আকাশেতে মেঘের গুরু গুরু। জ্যৈষ্ঠের দুঃসহ গরমে মানুষ হয়েছিল অতিষ্ঠ ও অস্থির, ভাবে সবাই কখন একটু বৃষ্টি হবে- হবো একটু সুস্থির। আষাঢ়ের প্রথম দিনেই সকাল বেলায় বৃষ্টি আসিল মুষলধারে, সবার মনে শান্তি আসিল বিধাতার বরে কতদিন পরে। পৃথিবীটা শান্ত হলো শীতল হলো ক্ষণিকের তরে, বর্ষাকাল বাংলাদেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসে অপার সম্ভাবনার দ্বার, অন্য কোন ঋতুতে সেই সম্ভাবনা দেখা যায় না আর। নদীর জোয়ারের জল বাংলার মাটিতে বয়ে নিয়ে আসে পলিমাটি, যা নিয়ে আসে শস্য প্রাচুর্যের বার্তা, বাংলা হয়ে উঠে উর্বরা, বাংলা হয় ফসলের ঘাঁটি। এখন বাংলার কৃষকের আউশ ধান কোথাও বা বোরো ধান তোলবার পালা, অচিরেই ভরে উঠবে নতুন ধানে কৃষকের ধানের গোলা।
বৃষ্টির পর হতেই ভেকেরা গান ধরেছে ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর, এত কাল কোথায় ছিল এই ভেকেরা মেলেনি সন্ধান তার। সন্ধ্যা হলেই ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়েমি ডাকে হয় কান মাথা ঝালাপালা হবার যোগাড়। আকাশজুড়ে দেখা যায় জলভরা মেঘের দাপাদাপি ও ঠুকাঠুকি, আকাশ থমকে থমকে করে ডাকাডাকি। থেকে থেকে আকাশেতে বিজলী চমকায়, ঘন ঘন বিজলীর চমকে আর মেঘের গর্জনে ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ধীরে ধীরে দুনিয়াতে ঘনায়ে আসে নিকষকালো রাত, বৃষ্টির সাথে কোথাও হয় বা প্রচন্ড শব্দে বজ্রপাত। নব বর্ষায় স্নাত হয়ে মানুষ শান্তি পাইল দেহ ও মনে, এই বৃষ্টির জন্য মানুষ ও প্রাণিকুল চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল আকাশ পানে। সেই সকাল থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে থামবার নাম গন্ধটি নেই তার, সারাদিন ঘরে বসে থাকা কাজের তাড়া নেই যেন কাহারো আর। তবে বর্ষায় দরিদ্র প্রপীড়িত মানুষের জন্য অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়, তারা পায়না কোন কাজ, কারো বা ঘরে খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতিতে বর্ষা মিশে আছে একাকার হয়ে, বাংলার বর্ষাকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের বিরাট অংশ যাবে দুর্বল হয়ে। এক রবীন্দ্র সাহিত্যের কথাই যদি ধরি বর্ষাকে বাদ দিলে তা হয়ে থাকবে খোঁড়া হয়ে। আদি কবি কালিদাস রায় পর্যন্ত হয়েছিলেন বর্ষা বন্দনায় উদ্বেলিত, পল্লীকবি জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ সহ আরো অনেকেই বর্ষাকে নিয়ে হয়েছিলেন মাতোয়ারা ও পুলকিত।
গদ্য সাহিত্য ও পদ্য সাহিত্য বর্ষার কাছে হয়ে আছে অনেকাংশে ঋণী, এক কথায় বললে বাংলা সাহিত্যে বর্ষা না থাকলে এত সমৃদ্ধ হতো না কখনি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ঘূর্নিঝড়, মহামারী বর্ষাকালেই বেশি দেখা যায়, বর্ষাকে নিয়ে যত গান, কবিতা, গল্প রচিত হয়েছে, অন্য কোন ঋতুতেই তা নাহি হয়। বর্ষার রূপ, রস, রং, ভেজা মাটির গন্ধ, সবকিছুই আপন মহিমা আর সৌন্দর্য ভাস্বর। সব ঋতুরই আছে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আপন মহিমায় ভরপুর, জ্যৈষ্ঠের প্রচন্ড গরমে ফসলের ক্ষেত প্রকৃতি হয়েছিল নিরস ও নির্জীব,। বৃষ্টির জল পাওয়ায় তারা হয়ে ওঠে সবুজ ও সজীব। এখনো ফুরায়ে যায়নি বাংলার ফল, আছে নানা রকম আম, আনারস, জাম, লিচু, খেজুর, পেয়ারা ও কাঁঠাল। কুসুমকাননে বর্ষায় ফুটে কত বাহারী ফুল তন্মধ্যে আছে কদম, কেয়া,হাসনাহেনা, জুঁই, চামেলী ও কামিনী, আরো আছে মল্লিকা, টগর, মাধবীলতা, বেলী ও সন্ধ্যামণি। বৃষ্টিস্নাত হয়ে তাদের দেখাচ্ছে কত সুন্দর ও ভালো। সকালে সূর্যের আলো এসে পড়লে পালায় রাতের কালো। বাড়ির চারিপাশ জলে ডুবে যায় মাঠঘাট থৈথৈ করে, খালবিল জলাশয় বর্ষায় যায় ভরে। বর্ষার নতুন জলে গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা মনের আনন্দে সাঁতার কাটে, একবার নামলে জলে- জল হতে কেউ উঠতে চায় না মোটে।
বর্ষার রূপ দেখার আশায় বসিয়া বাতায়ন পাশে ছিলাম কতক্ষণ মনের আনন্দে, কি সুন্দর রিমঝিম শব্দে বৃষ্টি হচ্ছে ছন্দে ছন্দে। ভাবুক ও কবি কবি মন যাদের,মন পড়ে রয় সেই উজ্জয়নী পুরে, মন থাকলে উজ্জয়নীপুর নয়কো বেশি দূরে। চারিদিকে অথৈ জল,ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায় নৌকা বাহিস দিয়া, কেউবা হাটে বাজারে যায় নৌকা নিয়া। বাংলার রূপ দেখেছিলেন,রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস, এসব না দেখিলে আর কি দেখা হলো বৃথাই জীবনের আশ। এখন ছোট বড় নৌকা চলে নদীর বুকে কোনটি চলে আবার পাল তুলিয়া, ছোট বড় ঢেউকে পাশ কাটিয়ে কখনো বা ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়া। কেউবা তোলে শাপলা ফুল হাত দিয়া। এইতো সেই চিরন্তন রূপ বাংলার কিছুই বাঁকী থাকলো না আর? অনেক সময় সাঁতার না জানা অনেক শিশুই পড়ে যায় জলে, বাড়ির বড়রা নজরে না রাখলে ভেসে যায় দূরে অতল জলে তখন বুক ভেসে যায় কান্নার রোলে। সুখ দুঃখ নিয়েই বাংলায় বর্ষা আসে, কেউ উপভোগ করে আনন্দ উল্লাসে। আবার অনেকের আনন্দ চোখের জলে যায় ভেসে। বর্ষা আর সীমিত বন্যা বাংলার মানুষের জন্য এক আর্শীবাদ, এই বর্ষা আর সীমিত বন্যা যদি না হয় তবে সব কিছুই হয়ে যাবে বরবাদ। হে বর্ষা তুমি প্রতি বছর যথা সময়ে মনের আনন্দে এসো কিন্তু এই বাংলায়, যাতে বাঙালি তার জীবনের ছন্দ আর স্বাদ ফিরে পায় শুধু এইটুকু তোমার কাছে চাওয়া মোদের বেশি কিছু নয়।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়



































































































