ছোটগল্প “পকেটমার” : লেখক- শিপন আলম –
- Update Time : ১০:১৮:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জুলাই ২০২১
- / ৪৪ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মধ্য গগনে অবস্থান করছিলাম তখন। লেখাপড়া আর নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন মেটাতেই কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো। দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস ছিল সেই জন্মলগ্ন থেকেই। দারিদ্রকে জয় করে সামনে এগিয়ে চলার নিরন্তর সংগ্রামে লিপ্ত ছিলাম তখনও । সাথে আমার পরিবারও।
দিনটি ছিল মঙ্গলবার। আর দশটি স্বাভাবিক মঙ্গলবারের মতোই ছিল দিনটি। সকালে পূর্বাকাশ লাল করে উদিত হয়েছিলো রক্তিম সূর্য। সারাদিন আকাশে ছিল সাদা মেঘের আনাগোনা। বেলা দ্বিপ্রহরে দক্ষিণ- পশ্চিম কোণে খানিকটা কালো মেঘ জড়ো হলেও বৃষ্টি হয়নি এক ফোঁটা। ক্যাম্পাসের শরৎ প্রকৃতি যেমনটি হয় তেমনটিই ছিলো সেদিন।
আর কদিন পরেই ছিল পবিত্র ঈদুল ফিতর। তাই শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কেউ কেউ গ্রামে চলে গিয়েছিল কেউবা যাওয়ার পথে। আমি যেতে পারি নি। সদ্য একটি টিউশন পেয়েছিলাম তাই। আমার মতো আরও অনেকেই ছিল। গ্রামের নিটোল প্রকৃতি বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকলেও প্রয়োজনের তাগিদে সে ডাকে সাড়া দিতে পারি নি কেউই। সময়টা অবশ্য খারাপ কাটছিলো না তখন। বরং ভীড় কম থাকায় কোলাহলমুক্ত ক্যাম্পাসে সাচ্ছন্দ্যেই যাচ্ছিলো দিনগুলো। ঘুমানো, গল্প করা, আড্ডা দেওয়া, ধর্মীয় বই পড়া, পত্রিকা পড়া, সবাই মিলে একসঙ্গে ইফতারি করা, ভোরবেলায় একসঙ্গে সেহেরি খাওয়া, মাঝে মাঝে রাতে বের হওয়া- সব মিলিয়ে দারিদ্র্যের মাঝেও ছিল সময় কাটানোর অফুরন্ত প্রাচুর্যতা। কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল সবাই। আমি অপেক্ষা করছিলাম টিউশনের বেতনের জন্য। বেতন পেয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম কিছু কেনাকাটা করার জন্য বের হবো।
আমি যেদিন ঠিক করলাম কেনাকাটা করতে যাবো সেদিন ছিল মঙ্গলবার। মঙ্গলবারে সাধারণত নিউমার্কেট বন্ধ থাকে। এটি সেখানকার ব্যবসায়ীদের জন্য সাপ্তাহিক ছুটির দিন। কিন্তু ঈদের কারণে সেদিন খোলা ছিল। শুনেছি প্রতি ঈদের আগেই নাকি এমনটি করে। ক্রেতাদের কেনাকাটার চাপ আর ব্যবসায়ীদের মুনাফার উদ্দেশ্যেই এমনটি করা হয়। রমজান মাস হওয়ায় সন্ধ্যার পরেই সাধারণত মার্কেটগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা আর সাওম পালন শেষে হলের এক বন্ধুকে নিয়ে টিউশন থেকে সদ্যপ্রাপ্ত ছয়খানা পাঁচশত টাকার নোট প্যান্টের পকেটে গুঁজে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে নিউমার্কেট অভিমুখে রওনা দিলাম। আমি বড় নোটগুলো সাধারণত মানি ব্যাগে রাখি না। কারণ তাতে মানিব্যাগ ও টাকা দুটোই হারানোর ভয় থাকে। মানিব্যাগে টাকা ছাড়াও আইডি কার্ডসহ আরও অনেক মূল্যবান কাগজ থাকে। সেগুলোও টাকার চেয়ে কম মূল্যবান নয়। হারালে কিংবা পকেটমার হলে যেকোনো একটি হারাবে- হয় টাকা নইলে মানিব্যাগ- এক্ষেত্রে এটিই আমার দর্শন। অন্য দিনগুলোতে কেনাকাটার পূর্বে টাকাগুলোকে সমান দুই ভাগে ভাগ করে প্যান্টের সামনের দুই পকেটে রাখলেও সেদিন কোন এক অজানা কারণে রাজ্যের অলসতা এসে মনের কোণায় বাসা বেঁধেছিল। তাই টাকাগুলো শুধু সামনের ডান পকেটে করেই বের হলাম। রিক্সাযোগে নীলক্ষেতে আসার পর সাথে থাকা বন্ধুটি বললো- ” ল্যাবএইড হাসপাতালে আমার এক চাচা সপ্তাহখানেক চিকিৎসা নিচ্ছেন। চলো, আগে তাকে দেখে আসি। তারপর নিশ্চিন্তে কেনাকাটা করা যাবে।” আমিও তার কথায় সায় দিয়ে বললাম- ” খুব ভালো প্রস্তাব, আমারও একটু কাজ আছে ঐ দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির এক কোচিং মেট অনেক দিন ধরেই কল দিচ্ছে তার সাথে দেখা করার জন্য। চলো যাই। তোমার আত্মীয়ের সাথে তুমি দেখা করলে, আর আমি আমার বন্ধুর সাথে।”
অতঃপর ৭ নম্বর বাসে চেপে আমরা ল্যাবএইড পৌছাই। সেদিকে প্রায় আধাঘন্টা মতো সময় ব্যয় করে আবার নিউমার্কেট পানে রওনা হই ৭ নম্বর বাসে চেপেই। তখন নিউমার্কেটের রাস্তা পুরোদমে ব্যস্ত। বাস, প্রাইভেট কার, রিক্সা, সিএনজি মিলিয়ে হাজারো গাড়ি হরেক রকম বাতি জ্বালিয়ে নানা রকম হর্ন বাজিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলার নিরন্তর প্রচেষ্টায় লিপ্ত। ওভারব্রিজের উপর থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য গোচরীভূত হয় এ সময়। শত শত আগুনের স্ফুলিঙ্গ যেন অসীম তেজ ধারণ করে ছুটে চলেছে আপন গতিতে সামনের সবকিছুকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার প্রয়াসে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে জোনাকি পোকা তাড়ানো এ আলোগুলোই যেন জোনাকি পোকার মতো জ্বলজ্বল করছে। মনে হয় ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি পোকাগুলো মিছিল দিয়ে একদিকে সারিবদ্ধভাবে আসছে অন্যদিকে সারিবদ্ধভাবে চলে যাচ্ছে। আমরা যারা শহরে থাকি, রাস্তা পারাপারে ওভারব্রিজ ব্যবহার করি- তাদের নিকট এ দৃশ্য নিত্যকার। ব্যস্ত শহরে, ক্লান্তিকর শহরে ভালো লাগার দৃশ্য এটি, টিকে থাকার অনুপ্রেরণাও বটে। গরমে ঘেমে, যানজটে ঘুমিয়ে, অশান্ত, অস্থির আর আবেগহীন এ শহরের টান সত্যিই আশ্চর্যজনক। এ শহর যে একবার ছেড়েছে সেই জানে এই উন্মত্ত আকর্ষণ।
নিউমার্কেট ওভারব্রিজের কাছে পৌছাতেই প্রচণ্ড ভীড় লক্ষ্য করলাম। আমরা ছিলাম বাসের একেবারে শেষপ্রান্তে। ফলে কন্ডাক্টরকে ভাড়া দিয়ে আসতে আসতে পুরো বাসই আবার আগের মতো যাত্রীতে ভরে উঠলো। প্রায় দুই তিন মিনিট ধরে ধস্তাধস্তির পর অনেক কষ্টে যতক্ষণে বাস থেকে নামলাম ততক্ষণে সেটি নীলক্ষেত পেরিয়ে গার্হস্থ অর্থনীতি কলেজের সামনে পৌছে গিয়েছে। সেখান থেকে পায়ে হেটে ওভারব্রিজ পার হয়ে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে নিউমার্কেটের দোতলায় যাই। ভাবলাম আগে বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনি। তাই দুইটা দোকান ঘুরে তৃতীয় দোকানে এসে বাবার গায়ের সাথে মানানসই একটি পাঞ্জাবি পছন্দ করলাম। সেলসম্যান সাতশত টাকা দাম চাইলে অনেক দর কষাকষির পরে তা সাড়ে চারশত টাকায় দিতে রাজি হলেন। পকেটে হাত দিলাম টাকার জন্য। কিন্তু যা ঘটলো তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। শুধু আমি কেন কেউই প্রস্তুত থাকে না এমন মুহুর্তগুলোর জন্য। পকেট একেবারে ফাঁকা। সংশয় ভরা মন নিয়ে তারপর প্যান্টের বাম পাশের পকেট এবং পেছনের দুই পকেট এমনকি শার্টের পকেটে হাত দিয়েও খুঁজতে লাগলাম। কোন কিছু হারিয়ে গেলে আমরা যেমনটি করি- সম্ভাব্য অসম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করি। আমার ক্ষেত্রেও বাদ গেলো না তেমনটি। এমনকি বন্ধুকেও জিজ্ঞেস করলাম তার কাছে কখনো টাকা দিয়েছিলাম কিনা একটু খুঁজে দেখার জন্য। কিন্তু যে জিনিস চুরি হয়ে গিয়েছে, পকেটমারের হস্তগত হয়েছে তা যতই খোঁজ করি না কেন তা কি আর পাওয়া যায়! বুঝতে পারলাম আমার বেলায়ও এমনটি হয়েছে। ঢাকা শহরে এসেছি পাঁচ বছর মতো হবে। পকেটমারের অনেক গল্প শুনেছি, বাংলা সিনেমায়ও অনেক দেখেছি এসব। কিন্তু আমার জীবনে ঘটবে এমনটি ভাবিনি কখনো। মূহুর্তে চোখ ছলছল করে উঠলো। গলা ভারী হয়ে উঠলো, কণ্ঠ রোধ হয়ে এলো। মনে হলো আমি তখনই পড়ে যাবো। জোরে চিৎকার করার সুযোগ ছিলো না কারণ চারপাশে ছিল অনেক মানুষের আনাগোনা। অনেকের নিকট তিন হাজার টাকা সামান্য হলেও আমার কাছে তখন ছিল তা পর্বত সমান। এই টাকাগুলোর সাথে আমার এবং আমার পরিবারের কতো ভালবাসা, কতো আনন্দ লুকিয়েছিলো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তার আগের ঈদে কত চেষ্টা করেছিলাম অন্তত আব্বার জন্য একটা পাঞ্জাবি আর ছোট ভাই-বোনের জন্য একটা কিছু নিয়ে যেতে। কিন্তু শত চেষ্টা করেও আমি তাদের সেই আনন্দের উপকরণ দিতে পারি নি। রাগে ক্ষোভে ছোটরা তো ঈদের দুই দিন আমার সাথে কোন কথাই বলে নি ঠিক মতো। শেষে মা অনেক বুঝিয়ে তাদের বাগে এনেছিলো এবং আমিও তাদের আশ্বস্ত করেছিলাম আগামী ঈদে যে করেই হোক ওদের জন্য কিছু একটা নিয়ে আসবো। কিন্তু মানুষের দুঃখের দিন যে সহজে শেষ হয় না এবং দুঃসময়ের স্বপ্ন-সাধ সহজে পূরণ হয় না তা আবারও উপলব্ধি করলাম। ভাই বোনের করুন চাহনি, বাবা-মায়ের পরিশ্রান্ত মুখখানা, ভাতিজাদের কাকু কাকু ডাক মুহুর্তে মনের সবকটি পর্দায় ভেসে উঠলো। এবার বাড়িতে গেলে ওদের সামনে কিভাবে দাড়াবো! ভাইয়া ভাইয়া আর কাকু কাকু করে ওরা যখন আমার সামনে এসে দাঁড়াবে তখন কিভাবে আমি তাদের হাস্যোজ্জ্বল কচি মুখগুলো কালিমালিপ্ত করে দিবো। আগেই ওদের কল করে জানিয়েছিলাম গত ঈদে তো তোদের জন্য কিছুই আনতে পারি নি। এবার দেখিস ঠিকই নিয়ে আসবো। কিন্তু এবারও তাদের কাছে আমাকে মিথ্যাবাদী হয়েই থাকতে হবে। অনেক কষ্টে একটা টিউশন ম্যানেজ করেছিলাম, সবেমাত্র সেখান থেকে এই একমাসের টাকাটা পেয়েছি। তার আগে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে বন্ধুদের কাছে আমার প্রায় তিন হাজার টাকা মতো দেনা ছিল। ফলে তাদের কাছে ধার পাওয়ার আর কোন সম্ভাবনাই ছিল না। আর ঈদ সামনে কারোরই টাকা ধার দেওয়ার সুযোগ থাকে না। আমার বন্ধুটি আমার সম্পর্কে সবই জানতো। আমার এ অবস্থা দেখে আর সেলসম্যানের কাছে আমি যেন বিব্রত না হই সেই ভয়ে সে নিজেই তার একটি আইটেম বাদ দিয়ে পাঞ্জাবির টাকাটা পরিশোধ করে দিলো।
ব্যর্থ মনোরথে রাজ্যের দুঃখ বুকে নিয়ে পরদিন আবারও মিথ্যাবাদী হয়ে শুধু বাবার পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে বাড়ি পৌছালাম। বাড়ি পৌছানোর পরে কি হলো সেকথা নাইবা বললাম।
লেখকঃ শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































