আলো-আঁধারের হাতছানি দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর কন্যা শিশুদের –
- Update Time : ০৯:৪৮:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১
- / ৬৫ Time View
আজু শিকদার, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
দুধে আলতা গায়ের রংয়ে ডাগর কালো দুটি চোখ। বাবা-মায়ের স্নেহ বঞ্চিত ৭ বছর বয়সের শিশু জুঁই। চোখে-মুখে রাজ্যের মায়া। দেখলে সন্তানের মত আদর করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু এ রকম একটি ফুটফুটে শিশুর খোঁজও রাখেন না তার মা। আর বাবার তো কোন কোন সন্ধানই নাই। মাত্র ৩ বছর বয়সী আরেক শিশু ইতি। যে বয়সে একটু পর পর মা তার খোঁজ করবে। খেয়েছো নাকি? কোথাও চলে গেলো নাকি? কিন্তু ইতি’র ক্ষেত্রে তা নয়। আপন মনে ঘুরছে ফিরছে। দীর্ঘক্ষন পরও এরকম কাউকে চোখে পড়ল না। এক সময় এক ব্যাক্তি এসে ইতিকে বললেন, ‘মা এসো বাইরে যাই, এখানে স্যাররা জরুরী কথা বলছেন’। বুধবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে গোয়ালন্দ উপজেলার বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা পায়াক্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে গিয়ে এমনই দৃশ্য চোখে পড়ল। শুধু জুঁই বা ইতি নয়, দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর শত শত শিশুর মধ্যে এরকম মাত্র পনের জন শিশু বেড়ে উঠছে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লী সংলগ্ন পায়াক্ট বাংলাদেশ নামের একটি সংস্থার তত্ত্বাবধানে।
পায়াক্ট বাংলাদেশ এ কর্মরত শেখ রাজীব জানান, তারা যে সকল শিশুকে লালন পালন করেন, তাদের মায়েরা তাদের খোঁজ খবরও রাখেন না। বরং একটু বড় হলে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্তৃর কাজ ঠিক করে নিতে আসেন, অথবা নিজের পেশায় লিপ্ত করতে পরিকল্পনা করতে থাকেন। আর বেশীর ভাগ শিশুর বাবার নামের জায়গায় তার নিজের নামটি লিখে দেন বলে তিনি জানান।
পায়াক্ট বাংলাদেশের ম্যানেজার মজিবর রহমান জুয়েল জানান, সীমাবদ্ধতার সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে সংস্থার পরিচালক আবু ইউছুফ চৌধুরীর নিজস্ব অর্থায়নে ১৫টি শিশুর লালন পালন করছেন তারা। কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলাতে পারবেন তাও জানা নেই। শিশুদের থাকা-খাওয়ার পাশাপাশি লেখাপড়াসহ সেলাই প্রশিক্ষন দেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বেশ বড় একটা খরচ করতে হয়। কোন সংস্থা সহযোগিতার হাত না বাড়ালে যে কোন সময় এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে তিনি জানান।
অপরদিকে দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর কন্যা শিশুদের নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করে স্থানীয় বেসরকারী সংস্থা মুক্তি মহিলা সমিতি। বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে যৌনপল্লীর শিশুদের সমাজের মূল ¯্রােতে আনতে তারা নানা প্রকল্প বাস্তাবায়ন করে থাকে। মুক্তি মহিলা সমিতির কর্মকর্তা আতাউর রহমান খান মঞ্জু জানান, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর মায়েদের ৩৬০ জন কন্যা শিশুকে তারা মানুষিক বিকাশে নানা কার্যক্রম ও লেখা-পড়াসহ তাদের যাবতীয় খরচ বহন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে আর্থিক সহায়তা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশ নামের একটি সংস্থা। সেভ দ্যা চিলড্রেন এর আর্থিক সহায়তায় ৩-৫ বছর বয়সী ২০০ কন্যা শিশুকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লালন পালন করে থাকে। তাদের যথাযথ শিক্ষাদান ও মানুষিক বিকাশে তারা বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। এছাড়া আমেরিকান দাতা সংস্থা সেভিং মোজেস এর অর্থায়নে ০ থেকে ৫ বছর বয়সী ৫০ জন শিশুকে রাতে লালন-পালন ও ইংল্যান্ডের মুসলিম চ্যারিটির অর্থায়নে একই শিশুদের দিনে লালন-পালন করা হয়ে থাকে।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী ৪ বছর বয়সের উপরে কোন শিশু যৌনপল্লীর পরিবেশে বসবাস নিষিদ্ধ। কিন্তু আমরা যে সকল শিশুদের নিয়ে কাজ করছি, তাদের বেশীর ভাগই রাতে মায়েদের কাছে ফিরে গিয়ে ওই পরিবেশে বসবাস করছে। এতেকরে তাদের মানুষিক বিকাশ প্রচন্ড ভাবে বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আবার কন্যা শিশু একটি বড় হয়ে গেলে, তার নিজের মা মেয়েকে নিজের পেশায় যুক্ত করতে উঠেপড়ে লাগে। যেখান থেকে শত ভাগ কন্যা শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব হয় না। আমরা বুঝতে পারলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় রক্ষা করে থাকি। এ ক্ষেত্রে অনেককে সরকারী সেভ হোমে পাঠানো হয়ে থাকে।
৩০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় কন্যা শিশুদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, নাটক ও ফুটবল খেলার আয়োজন করা হয়। ‘প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ হবো ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়বো’ স্লোগানকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার গোয়ালন্দের দৌলতদিয়ায় বেসরকারি সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতি (এমএমএস) এ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। বিকেল ৩ টায় মুক্তি মহিলা সমিতির মাঠ হতে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুল মাঠে গিয়ে শেষ হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ মোস্তফা মুন্সি। মুক্তি মহিলা সমিতির সভানেত্রী মর্জিনা বেগম অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস পারভীন, গোয়ালন্দ পৌরসভার মেয়র মোঃ নজরুল ইসলাম মন্ডল, দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মন্ডল, রাজবাড়ী জেলা পরিষদের সদস্য নুরজাহান বেগম, মুক্তি মহিলা সমিতির প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আতাউর রহমান খান মঞ্জু প্রমূখ।
দৌলতদিয়া যৌনপল্লী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী যৌনকর্মীর সংখ্যা ১২/১৩শ হলেও বাস্তবে আরো বেশী। এদের কন্যা শিশুদের শিক্ষিত করে সমাজের মূল ¯্রােতে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হলেও অনেক কন্যা শিশুই মায়েদের পেশা গ্রহন করছে। অপরদিকে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যে কোন চাকরীতে পিতার পরিচয় বাধ্যতামুলক। এক্ষেত্রে যৌনকর্মীদের সন্তানদের নির্দিষ্ট কোন পিতৃপরিচয় নেই। মায়েদের ইচ্ছামত তাদের পিতার নাম দেয়া হয়। আর ওই সব পিতা তাদেরকে সন্তান হিসেবে স্বীকৃতিও দেয় না। পরিচয়ের এ বিষয়টি যৌনকর্মীদের সন্তানদের কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য বড় একটি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়



































































































