“আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস ও ভাষা আন্দোলন” – লেখক : শারমীন রেজা লোটাশ
- Update Time : ০৮:৩২:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
- / ৬৫ Time View

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
একুশে ফেব্রুয়ারি কি? প্রশ্নটা একটু বোকা বোকা লাগছে, তাইনা? উত্তরটা যদি এমন হয়- একুশে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ। উত্তরটাও বোকা বোকা লাগছে। বোকার মত প্রশ্ন করলে, উত্তরও বোকার মত হবে এটাই স্বাভাবিক। এখন আপনি সত্যি সত্যি বুকে হাত দিয়ে বলেন তো একুশে ফেব্রুয়ারির সঠিক এবং সবটুকু ইতিহাস জানেন। আপনি আপনার বাচ্চাদের সবটুকু ইতিহাস জানিয়েছেন। তারা জানে আপনি জানেন একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনে কি! কয়েক জন চোখ বন্ধ করে বলে ফেলবে একুশে ফেব্রুয়ারি আবার কি? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এখন আমার আরেকটি প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কি? কেন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বলা হয়? একুশে ফেব্রুয়ারির অন্য আরেকটি পরিচয়ও আছে সেটা কি জানেন? বছরের সব কয়টা দিন এক কিন্তু কিছু কিছু দিন আমরা ভিন্ন ভাবে কাটায়। আর এই ভিন্ন ভাবে কাটানোর কারণটাই হচ্ছে কোনো একটা উপলক্ষ। আমাদের জানতে হবে বুঝতে হবে কোন দিনটা উৎসব পালনের জন্য আর কোনদিনটা উৎসব বিমুখ কাটানোর জন্য। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জন্য কোনো উৎসবের উপলক্ষ নয়।
একুশে ফেব্রুয়ারি মানে এই না যে – আপনি মাথায় কত গুলো ফুল দিয়ে, হাত ভর্তি চুড়ি পরে, সুন্দর করে শাড়ি পরে প্রেমিকের হাত ধরে ঘুরে বেড়াবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি মানে এই না যে- আপনি এখানে সেখানে কনসার্ট বসিয়ে ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার মতো করে লাফা লাফি করবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি মানে এই না যে- আপনি “অ “, “আ ” এর মত করে কেক বানিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করবেন। একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করতে কি এত কিছু লাগে? সঠিক ভাবে জানুন না কেন অন্য দিন গুলো থেকে এই দিনটা আলাদা। যে কারণে ওই দিন কিছু তরুণ নিজেদের জীবন বিলীন করে দিয়ে ছিলো, নিজেদের রক্তে ঢাকার রাস্তা রক্তাত করেছিল সেই উদ্দেশ্যটাকে আমরা সঠিক ভাবে মেনে চলি। তাহলেই তো একুশে ফেব্রুয়ারি সফল। শহীদদের আত্মাও শান্তি পাবে। আমি অবাক হয়ে ভাবি তারা যদি নিজের চোখে আজ দেখতে পেতো তাদের জীবন দিয়ে পাওয়া সেই বাংলা ভাষা ভুলে আজ আমরা মম, ব্রো, ইয়ো তে কথা বলি, সাথে আবার মিশিয়ে নেয় পাঁচ মিশালি হিন্দি আর শহীদ দিবসকে আমরা আমাদের মতো করে উৎসব দিবস বানিয়ে পালন কর।
বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন। মৌলিক অধিকার রক্ষা কল্পে বাংলা ভাষাকে ঘিরে সৃষ্ট এ আন্দোলনের মাধ্যমে তদানীন্ত পাকিস্তান অধিরাজ্যের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলেও, বস্তু এর বীজ রোপিত হয়ে ছিল বহু আগে; অন্যদিকে, এর প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফল ছিল সুদূর প্রসারী। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান অধিরাজ্য ও ভারতঅধিরাজ্যনামক দুটি স্বাধীনরাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। পাকিস্তানেরছিল দুইটি অংশ: পূর্ব বাংলা (১৯৫৫ সালে পুনর্নামাঙ্কিত পূর্ব পাকিস্তান) ও পশ্চিমপাকিস্তান। প্রায় দুইহাজারকিলোমিটারের (প্রায় ১২৪৩ মাইল) অধিক দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে অনেক গুলো মৌলিক পার্থক্য বিরাজমান ছিল। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান অধিরাজ্য সরকারপূর্ব পাকিস্তান তথাপূর্ব বাংলাকে ইসলামী করণ তথা আরবি করণের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা, পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে আরবি হরফে বাংলা লিখন অথবা সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা আরবি করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়। আবার, সমগ্র পাকিস্তানের সকল ভাষা লাতিন হরফে লেখার মাধ্যমে বাংলার রোমানী করণের প্রস্তাবও করা হয়। এসকল ঘটনার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় অবস্থানকারী বাংলা ভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যত পূর্ব বাংলার বাংলা ভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিক ভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফল স্বরূপ বাংলা ভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে ওঠে।
আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু সংখ্যক ছাত্র ও প্রগতিশীল কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি এলে পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি বর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হন বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিক, সালাম, এম.এ ক্লাসের ছাত্র বরকত ও আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে। এছাড়া ১৭ জন ছাত্র-যুবক আহত হয়। শহীদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারির ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাত্রাসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ২২ ফেব্রুয়ারির পুলিশের গুলিতে শহীদ হন শফিউর রহমান শফিক, রিক্সা চালক আউয়াল এবং অলিউল্লাহ নামক এক কিশোর। ২৩ ফেব্রুয়ারির ফুলবাড়িয়ায় ছাত্র-জনতার মিছিলেও পুলিশ অত্যাচার-নিপীড়ন চালায়। এ নির্লজ্জ, পাশবিক, পুলিশি হামলার প্রতিবাদে মুসলিমলীগ সংসদীয় দল থেকে সেদিনই পদত্যাগ করেন। ভাষা আন্দোলনের শহীদ স্মৃতিকে আমন্ত্রন করে রাখার জন্য মেডিকেলকলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতারাতিছাত্রদের দ্বারাগড়ে ওঠে শহীদ মিনার, যা ২৪ ফেব্রুয়ারির উদ্বোধন করেন শহীদ শফিউর রহমানের পিতা।
২৬ ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিক ভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৪ সালের ৭ই মে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হলে ২১৪ নং অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উল্লিখিত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলা প্রবর্তিত হয়। সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন জারি করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো বাংলা ভাষা আন্দোলন, মানুষের ভাষা এবং কৃষ্টির অধিকারের প্রতি সম্মান জানিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে যা বৈশ্বিক পর্যায়ে সাংবার্ষিক ভাবে গভীর শ্রদ্ধা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে উদ্যাপন করা হয়।
লেখক : শারমীন রেজা লোটাশ, সদস্য, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়






































































































