“অবলা বসুঃ স্বামীর কীর্তিতে চাপা পড়া এক মহীয়সী নারীর কথা”- সুনীল কুমার বিশ্বাস –
- Update Time : ০৭:১৯:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ মে ২০২১
- / ৬৮ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
হতে পারতেন তিনি পাশ করা প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার,
কিন্তু তা না হয়ে হলেন স্বামীর সকল কাজের প্রেরণাদায়িনী – স্বামীর সকল সাধনার।
স্বামীর সাধনার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন নিরন্তর,
স্বামীর কর্মযজ্ঞের মাঝে নিজেকে আড়াল করে রাখলেও
তিনি নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের মাঝে রাখেননি বন্দীকরে।
সমাজের নানা গঠন মূলক কর্মকান্ডে রেখেছিলেন ব্যপ্ত করে।
বাংলার নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অগ্রগণ্য ভূমিকা হয়ে আছে চিরস্মরণীয়।
সমাজের পিছিয়ে পড়া, বঞ্চিত, অবহেলিত নারীদের জন্য তাঁর নানা কর্মকান্ড আর কল্যাণমুখী কাজের জন্য বাংলার ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে রবে আপন স্বকীয়তায়। তিনি আর কেউ নন- জগত বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর জীবন সঙ্গিনী অবলা বসু তাঁর নাম, নাম তাঁর অবলা হলেও সত্যি সত্যি ছিলেন না অবলা আসলে তিনি ছিলেন না বলা।
১৮৬৫ মতান্তরে ১৮৬৪ সালের ৮ই আগষ্ট বরিশালে এই মহীয়সী নারীর জন্ম, পিতা দূর্গামোহন দাস ছিলেন সে সময়ের একজন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, যদিও এ ব্যাপারে একেবারেই অজ্ঞ বর্তমান প্রজন্ম। তৎকালীন অখন্ড বাংলার সমাজ উন্নয়নে দূর্গামোহন দাসের ছিল ব্যাপক অবদান, মা ব্রহ্মময়ী দেবী ছিলেন পুরাদস্তুর গৃহিণী একজন। বরিশালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে অবলা প্রথমে কলকাতার বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে বেথুন স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করেন।
১৮৮১ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন এবং মাসিক ২০ টাকা হারে বৃত্তি পান। এ সময়ে অবলা রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন, তিনি ঠিক করেন তিনি ডাক্তারী পড়বেন। কিন্তু সে সময় কলকাতা মেডিকেল কলেজে মেয়েদের পড়ার সুযোগ ছিলনা কোন, একমাত্র মাদ্রাজ মেডিকেলেই এ সুযোগ ছিল তখন। এত দূরে মেয়েকে ডাক্তারী পড়ানোর ব্যাপারে দূর্গামোহন দাসের ছিল আপত্তিঘোর, কিন্তু অবলার প্রবল ইচ্ছে আর আগ্রহের কাছে বাবাকে মানতে হলো হার। অবশেষে তিনি মেয়েকে মাদ্রাজে পাঠাতে সম্মত হন, অবলা বাঙালি মেয়েদের মধ্যে প্রথম মেডিকেলের শিক্ষার্থী হলেন।
সুযোগ একটা হলো বটে কিন্তু মেয়েদের কোন হোস্টেল ছিলনা তখন, এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের বাড়িতে পেয়িং গেষ্ট হিসেবে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় দুই বছর পড়াশুনার পর শারীরিক অসুস্থতার জন্য অবলা পড়াশুনা শেষ না হতেই কোলকাতায় ফিরে আসেন। কোলকাতায় ফেরার আগে তাঁর ফার্মাকোলজি পরীক্ষা শেষ হয়ে যায়, ফল বের হবার আগেই তিনি ফিরে আসেন কোলকাতায়।
১৮৮৭ সালে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে মাত্র ২৩ বছর বয়সেই অবলার বিবাহ সুসম্পন্ন হয়, স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী হিসেবে তাঁর সব ধরনের কর্মকান্ডে সমর্থন যোগায়। তিনি ছিলেন স্বামী অন্তপ্রাণ, ছায়ার মতো ছিলেন পাশে সারা জীবন, স্বামীর বিজ্ঞান সাধনায় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সে ব্যাপারে ছিলেন সচেতন। অল্প বয়সেই মারা যায় তাঁদের একমাত্র সন্তান, তাই স্বামীর ছাত্রদের তিনি সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন।
জগদীশচন্দ্র বসু বিখ্যাত বিজ্ঞানী হলেও কর্মজীবন শুরুর কালে ছিলেন না তেমন সচ্ছল, এসময় অবলা শক্ত হাতে ধরেছেন সংসারের হাল। নিজে বিজ্ঞানের ছাত্রী হওয়ায় জগদীশের অনেক ধরনের কাজেই তিনি সাহায্য সহযোগিতা করতেন, বিজ্ঞান সাধনার জন্য জগদীশের “বসু মন্দির” প্রতিষ্ঠায় অবলার ছিল অবিস্মরণীয় অবদান। প্রখ্যাত স্বামীর সাথে একাধিকবার বিদেশ সফর করলেও খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করতেন বাসায়।
লিভারপুল ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশনের এক বৈজ্ঞানিক সভায়, জগদীশচন্দ্র বসুর বক্তৃতা শুনে বিশ্ব বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক লর্ড ক্যালভিন মুগ্ধ হন, তার প্রশংসা তিনি অবলা বসুকেই করেছিলেন। অবলা বসু নারী শিক্ষা প্রসারের কাজ করে গেছেন সারা জীবন। বাল্যবিবাহ রোধ,মেয়েদের জন্য শিক্ষার দ্বার অবারিত করাই ছিল অবলার জীবনের মূল ব্রত আর স্বপন। সে সময় নারীরা শিক্ষায় এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পুরুষের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় যৌতুক ও বাল্য বিবাহের কষাঘাতে ছিল জর্জরিত, অনেকে আবার অল্প বয়সে বিধবা হয়ে সমাজে প্রতিনিয়ত হতেন নিগৃহীত। সমাজের গলগ্রহ হয়ে তাদের থাকতে হতো কোণঠাসা, সহ্য করতে হতো নির্যাতন। অবলা বসু তাদের কথা ভেবেই প্রতিষ্ঠা করেন বাণী ভবন।
১৯১০ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে অবলা বসু ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের সম্পাদিকা হন, তিনি পুরো স্কুলটিকেই নতুন করে গড়ে তোলেন। বাংলার মেয়েদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে ১৯১৯ সালে “নারী শিক্ষা সমিতি” প্রতিষ্ঠা করেন, এটি ছিল একটি অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। সমাজের দানশীল মানুষের আর্থিক সহায়তায় এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলার গ্রামে-গঞ্জে তার কার্যক্রম শুরু করে, নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। পরে এই সংস্থা থেকেই নারীদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করেন, এই সংস্থার মাধ্যমে অবলা বসু ৮৮ টি প্রাথমিক ও ১৪ টি প্রাপ্তবয়স্কদের স্কুল চালু করেন। অবলা বসু তাঁর দিদি সরলা রায়ের সাথে যৌথভাবে গোখেল মেমোরিয়াল নামে আরো একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
এছাড়া আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর মৃত্যুর পর তাঁর সঞ্চিত এক লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি ” সিস্টার নিবেদিতা উইমেন্স এডুকেশন ফান্ড” প্রতিষ্ঠা করেন। এই ফান্ডে অবলা বসু ১০ লক্ষ টাকা দান করেন। এই ফান্ডের মাধ্যমে ‘এডাল্টস প্রাইমারি এডুকেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, এই ফান্ডের মাধ্যমে বয়স্ক অশিক্ষিতা নারীদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। নারী শিক্ষা বিস্তারের সাথে সাথে নারীদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যও প্রতিনিয়ত তিনি কাজ করে গেছেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর প্রেরণা ও সহায়তায় অবলা বসু সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য অনেক কল্যাণ মূলক কাজ করেছেন, ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন।
অবলা বসু তার ‘ নারী শিক্ষা সমিতির ‘ প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েদের শিক্ষার জন্য মহিলা শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়



































































































