সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন এবং অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের দাবি -দোলন দাস –
- Update Time : ০৮:৩৮:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২১
- / ৫৫ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ সিডও। CEDAW এর Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women.
নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারন পরিষদে গৃহিত হয়। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সনদটি কার্যকর হতে শুরু করে। বাংলাদেশ সরকার ৩৬ বছর আগে ১৯৮৪ সালে সিডও সনদের অনুমোদনকারী রাষ্ট্রসমূহের একটি হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
নারীর প্রতি বিদ্যমান সকল প্রকার বৈষম্যমূলক কর্মকান্ড, রীতিনীতি, প্রথা ও চর্চা নিষিদ্ধকরণ এবং নারীর প্রতি বৈষম্য প্রদানকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠির বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনে নিয়ে আসা জরুরী। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এবং জনসাধারণের কল্যানার্থে সিডও সনদ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। এ পর্যন্ত ১৮৫টিরও বেশি দেশ সিডিও সনদ গ্রহণ করেছে। ১৬০টি দেশ সিডিও সনদের ধারাগুলো তাদের জাতীয় সংবিধান ও আইনে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
সিডিও সনদের পূর্ণ অনুমোদন এবং অভিন্ন পারিবারিক আইনের প্রতিষ্ঠার দাবি প্রসঙ্গে নিম্নে আলোচনা করা হলোঃ
সিডিও সনদের পূর্ণ অনুমোদন জরুরি কেননা নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ সিডও ( CEDAW )। এটি হলো একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার দলিল।
এটি জাতিসংঘের একটি মৌলিক মানবাধিকার দলিল। ১৯৮১ সালে এটি সেপ্টেম্বর মাসের ৩ তারিখ সারাবিশ্বে কার্যকর হয়। ৩ সেপ্টেম্বর সারাবিশ্ব সিডও দিবস পালিত হয়ে থাকে।
জাতিসংঘ গৃহিত সিডও সনদ জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর মানবাধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে নারীর পক্ষে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বলা যায় এটি এক মাইল ফলক। আমরা জানি সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে চরম বৈষম্য বিরাজমান। সেই বৈষম্য অবসানের লক্ষেই নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদটি গৃহিত হয়েছে। জাতিসংঘের নারীর মর্যাদা বিষয়ক কমিশন, বিভিন্ন ওয়াকিং গ্রুপ ৫ বছর ধরে এই সনদ প্রণয়নের জন্য কাজ করে।
এই সনদে স্বাক্ষরকারী জাতিসংঘ সদস্যদেশগুলো এই সনদের ধারাগুলো নিজ নিজ দেশে কার্যকর করতে অঙ্গিকারবদ্ধ। সিডও সনদের মূল কথা হচ্ছে সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশে যুগ যুগ ধরে নারী যে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে আসছে তার যথাযথ স্বীকৃতি এই সনদ।
সারাবিশ্বে নারীর প্রতি যে বৈষম্য তা নির্মূল করতে হলে সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন প্রয়োজন। সিডও সনদ সম্পূর্ণরূপে অনুমোদিত হলে নারীর বৈষম্য একটু হলেও কমবে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে যুগ যুগ ধরে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা বা নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সিডও বাস্তবায়নে জাতিসংঘের পাশাপাশি রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদের সমান দায়িত্ব আছে।
নারীর প্রতি হওয়া সকল প্রকার বৈষম্য, অন্যায়, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপিড়ন বন্ধ করতে সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন প্রয়োজন। সিডও সনদ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের এই সনদ সারাবিশ্বেই অনুমোদন করা প্রয়োজন।
অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠার দাবি
ধর্ষণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আসুন নারী ও কন্যার প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। ব্রিটিশ শাসনামলে ও অভিন্ন পারিবারিক আইনে পরিবর্তন এসেছে। হিন্দু পারিবারিক আইন সংস্কার হয়ে বিবাহ আইন, সতীদাহ প্রথা রদ আইন, বাল্যবিবাহ বন্ধ আইন হয়েছে। পাকিস্তানি আমলে মুসলিম পারিবারিক আইনেও কিছু পরিবর্তন দেখা যায়।
৭২-এর সংবিধানের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের সমঅধিকার, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। পারিবারিক আইনগুলো পর্যালোচনা করে একটি সমতাপূর্ণ আইন প্রণয়ন হলে সংবিধানের মূল লক্ষ্য পূরণ হবে। বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে বৌদ্ধ সাংস্কৃতিও গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তুু বৌদ্ধদের জন্য আলাদা কোন আইন নেই। হিন্দু পারিবারিক আইন দ্বারা বৌদ্ধ সমাজ পরিচালিত হলেও বৌদ্ধ নারীরা কোন অধিকার পায় না।
মারমা নারীদেরও এখনো সম্পত্তিতে কোন অধিকার নেই। বান্দরবন জেলার নারীরা সম্পদের চার ভাগের এক ভাগ পায়। আদিবাসী নারীদের অধিকার অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন হলে সব শ্রেণির সব ধর্মের নারীদের অধিকার সংরক্ষিত হবে।
অনগ্রসরতা থেকে নারীদের মুক্তি দিতে পারে এই অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। পরিবার একটি প্রতিষ্ঠান এখানে সকলের সমান অধিকার থাকা জরুরি। অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। নারীর ক্ষমতায়ণ করতে হলে কিন্তু জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ বৈষম্য দূর করতে হবে।
অভিন্ন পারিবারিক আইনের দাবিতে অন্যতম ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। মহিলা পরিষদ সর্বদাই নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মহিলা পরিষদ নারীদের প্রতি হওয়া সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে, যেমন- যৌতুক, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, এসিড নিক্ষেপ, নারী ও শিশু পাচার ইত্যাদি বিষয়গুলো মহিলা পরিষদ কাজ করে যাচ্ছে নারীর উন্নয়নের লক্ষ্যে।
তাই বলা যায়, অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠা করা কতটা প্রয়োজন তা নারীর প্রতি বৈষম্য দেখলেই বোঝা যায়। অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই, আর কোন বিকল্প হতেও পারে না। তাই অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠার দাবি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন এবং অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।
নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপের জন্য সিডও সনদ বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। সারাবিশ্বে সিডও সনদ কার্যকর হওয়া আবশ্যক। নারীর প্রতি সম্মান প্রতিষ্ঠা, নারীর মানবাধিকার রক্ষা, নারীর মৌলিক চাহিদা পূরণ, নারীর সমধিকার প্রদান ইত্যাদি আবশ্যক। নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপের অন্যতম ও প্রধান সনদ এই সিডও ( CEDAW ) ।
লেখক- দোলন দাস , সদস্য ও কর্মী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































