পদ্মায় নির্বিচারে শিকার করা হচ্ছে মহাবিপন্ন প্রজাতির বাঘাইড় মাছ
- Update Time : ১০:০৬:০৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ নভেম্বর ২০২৩
- / ১৩৬ Time View

আজু শিকদার, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
নিষিদ্ধ হলেও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পদ্মায় নির্বিচারে শিকার ও বিক্রি করা হচ্ছে মহাবিপন্ন প্রজাতির বাঘাইড় মাছ। রীতিমত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে চড়া দামে এই মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। বাঘাইড় মাছ শিকার ও বিক্রয় বন্ধে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ নেই সংশিষ্টদের। এভাবে অবাধে বাঘাইড় মাছ নিধন অব্যাহত থাকলে অচিরেই প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, প্রমত্তা পদ্মা-যমুনা মিলিত হয়েছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের অদুরে। পদ্মা-যমুনার এই মোহনায় জেলেদের জালে ধরা পড়ে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। এ সকল মাছের সাথে প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে বন্য প্রাণি সংরক্ষণ বিভাগ কর্তৃক চিহ্নিত মহাবিপন্ন প্রজাতির বাঘাইড় মাছ। সূ-স্বাদু হওয়ায় বাজারে এই মাছের ব্যাপক চাহিদা। তাই শিকার করা ওই সকল বাঘাইড় মাছ প্রকাশ্যে উচ্চ মূল্যে বিক্রিও করা হচ্ছে। ধরা পড়া বাঘাইড় মাছের ছবি ও মাছ ব্যবসায়ীর ফোন নম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে মুহুর্তের মধ্যেই তা ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে। এই মাছ বিক্রির জন্য ইতিমধ্যে দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ীরা সারাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। অথচ মহাবিপন্ন প্রজাতির এই মাছ ক্রয়-বিক্রয় ও পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে আইনের তোয়াক্কা না করেই চলছে বেচাকেনা। বাঘাইড় মাছ বাংলাদেশ বন্যপ্যাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ২নং তফসিলভুক্ত একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। এই আইন অনুযায়ী- বাঘাইড় মাছ শিকার, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন কিংবা দখলে রাখার অপরাধে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদন্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড-ই হতে পারে।
স্থানীয়রা জানান, পদ্মা নদী থেকে শিকার করা বাঘাইড় মাছ প্রায় প্রতিদিনই দৌলতদিয়া ঘাট মাছের আড়তে বেচা-কেনা হয়ে থাকে। ৫ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত বাঘাইড় মাছ এ এলাকায় বেশী ধরা পরে। আর মাঝে মাঝে বিশাল আকৃতির দু’একটা ধরা পড়লে ভিডিও ধারন ও ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে মাছ ব্যবসায়ীরা। সেই সাথে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একাধিক মিডিয়ায় খবরটি ছড়িয়ে দেয়া হয় সারা দেশে। এরপর সারাদেশের ভোজনরসিকরা বড় আকৃতির ওই সকল বাঘাইড় মাছ কিনতে যোগাযোগ শুরু করে দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ীদের সাথে। এভাবে উচ্চ মূল্যে বাঘাইড় মাছ বিক্রি হয়ে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে।
পদ্মা নদীতে মাছ শিকার করা জেলেরা জানান, ৫/১০ কেজির বাঘাইড় মাছ পদ্মা নদীতে প্রায় প্রতিদিনই পাওয়া যায়। মাঝে মধ্যে বড় আকারের বাঘাইড় মাছও জালে ধরা পড়ে। বিক্রিতে কোন সমস্যা হয় না। কারণ বাঘাইড় মাছ অত্যন্ত সু-স্বাদু হওয়ায় বাজারে ভালো দামে বিক্রি হয়। আর যদি বড় সাইজের বাঘাইড় মাছ ধরা পরে, তাহলে মাছ ব্যবসায়ীরা নদীতেই তাদের সাথে যোগাযোগ করে কিনে নেয়। তারা এখনো পর্যন্ত কোনদিন বাঘাইড় মাছ শিকার করার দায়ে দন্ডিত হননি বলে জানান।
দৌলতদিয়া ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী আজগর আলী জানান, পদ্মা নদীতে প্রায় সব সময়ই বাঘাইড় মাছ ধরা পরে। সারা দেশ থেকেই তাদের কাছে ক্রেতারা বাঘাইড় মাছ কিনে থাকেন। বেশীর ভাগ বাঘাইড় মাছ ফোনে ফোনে যোগাযোগ করে বিক্রি করা হয়। এছাড়া বড় আকারের বাঘাইড় মাছের জন্য আগে থেকেই ঢাকার বড় বড় ব্যবসায়ীরা তাদের কাছে বলে রাখেন। তাদের চাহিদা মত বাঘাইড় মাছ পাওয়া গেলে পৌঁছে দেয়া হয়। অপর মাছ ব্যবসায়ী মো. সোহেল মোল্লা বলেন, আমরা শুনেছি যে বাঘাইড় মাছ শিকার করা বা বিক্রি করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু এ বিষয়ে প্রশাসন থেকে তাদেরকে কখনো কিছু জানানো হয়নি এবং কোন প্রকার অভিযানও চালানো হয়নি।
চাঁদনী এন্ড আরিফা মৎস্য আড়তের মালিক মো. চান্দু মোল্লা জানান, পদ্মা নদীর দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় প্রচুর পরিমানে বাঘাইড় মাছ ধরা পড়ে এবং তিনিও মাঝে মধ্যে জেলেদের কাছ থেকে কিনে বিক্রি করে থাকেন। তবে তিনি জানেন যে, বাঘাইড় মাছ শিকার ও ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ তাই তিনি বেশী একটা কেনেন না। তিনি বলেন, ‘একটা মোটামুটি বড় বাঘাইড় মাছের দাম ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দাম হয়। যদি এত দামের মাছটি প্রশাসনের কেউ জব্দ করেন, তাহলে তার বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়ে যাবে। এই ভয়ে তিনি বাঘাইড় মাছ না কেনারই চেষ্টা করেন। যদি কখনো কেনেনও তবে সেই মাছ পরিচিত ব্যাক্তির কাছে বিক্রি করে থাকেন, যাতে কোন ঝামেলা না হয়।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট ‘আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ’ (আইইউসিএন) এর লাল তালিকায় রয়েছে ‘মহাবিপন্ন’ বাঘাইড় মাছ।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ্যাডভোকেট অভিজিৎ সোম বলেন, বাঘাইড় মাছ বন্যপ্রাণি সংরক্ষন আইনে শিকার, পরিবহন ও বিপনন দন্ডনীয় অপরাধ। তবে মৎস্য আইনে এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। এখানে আইনের কিছুটা অসামজস্যতা বিদ্বমান। অথচ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মাছের সাথে মারা পরড়ছে বাঘাইড় মাছ। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এই মাছের অস্তিত্ব থাকবে না। বিপন্ন প্রজাতির এই বাঘাইড় মাছ রক্ষায় আইনের অসামজস্যতা দুর করে সময়োপযোগী ও বাস্তবতার নিরীক্ষে মৎস্য বিভাগ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে আইনটি সংস্কার করা প্রয়োজন।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান জানান, বন্যপ্রাণি সংরক্ষন আইনে বাঘাইড় মাছ শিকার বা বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও মৎস্য আইনে এ ধরনের কিছু নেই। তাই মৎস্য আইনে এ সকল জেলে বা মাছ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তাদের কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহনের সুযোগ নেই। তবে তারা এ বিষয়ে জেলেদের সচেতন করে থাকেন। তবে স্থানীয় প্রশাসন ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেন বলে তিনি জানান।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসেন জানান, পদ্মা-যমুনার মোহনায় প্রতিনিয়ত জেলেদের জালে বাঘাইড় মাছ ধরা পড়ার বিষয়টি ইতিমধ্যে তাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে বন্যপ্রাণি অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালকের সাথে কথা বলেছি। তারা বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইন ২০১২ যাচাই-বাছাই করে নির্দেশনা দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































