“একজন আত্মভোলা মানুষ”- ড. কাজী মোতাহার হোসেন (চতুর্থ পর্ব): লেখক: শিপন আলম
- Update Time : ০৮:১৩:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মে ২০২২
- / ৬৮ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
ভুলোমনা স্বভাবের কারণে তিনি জীবনে ট্রেন মিস করেছেন অসংখ্যবার। একবার ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঢাকা থেকে ভোরের ট্রেনে রওনা দিয়েছেন জেনে আয়োজকরা তাঁর জন্য রেলওয়ে স্টেশনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। পরপর দু’টো ট্রন পদ্মা আর তিস্তা স্টেশনে ভিড়লেও তাঁর আসার কোন খবর নাই। আয়োজকরা হতাশ হয়ে ফিরে গেল। সকালে রওনা দিয়ে এখনো না আসায় তাঁর পরিবার বিচলিত হয়ে পড়ল। পরে জানা গেল পুরো ব্যাপারটা। তাঁর দশম সন্তান ফাহমিদা খাতুন ‘আমাদের আব্বু’ শিরোনামে স্মৃতিচারণমূলক একটি লেখায় এ ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেছেন এভাবে- ‘পাশাপাশি দুটো লাইনে দাঁড়িয়েছিল তিস্তা আর কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, আব্বু পরেরটাতে উঠে পড়েছেন। পরপর স্টেশনগুলো যখন পার হচ্ছেন তখন ওঁর অবাক হওয়ার পালা- এই ময়মনসিংহ লাইনেও তাহলে আরেকটা ঘোড়াশাল, আরেকটা নরসিংদি আছে? খুব অদ্ভুত তো? পাশের লোকটিকে জিজ্ঞেস করে জানলেন, তিনি চট্টগ্রামে যাচ্ছেন! ব্যাপার বুঝে লোকজন তখন টিকিট চেকারকে বলে আব্বুকে ভৈরব নামে অন্য ট্রেনে ময়মনসিংহ পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে, তাই উনি সন্ধ্যা নাগাদ পৌছলেন ময়মনসিংহে!’
কাজী সাহেবের এই ভুলোমনা স্বভাব খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন রাজবাড়ী জেলার আরেক কৃতী সন্তান; হাবাসপুর-বাহাদুরপুরের অহংকার; বাংলাদেশের দ্বান্দ্বিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পথিকৃৎ, বাংলাদেশের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার জনাব মোহাম্মদ আবু হেনা। তাঁর পিতা মরহুম আমানত আলী মল্লিক ছিলেন কাজী সাহেবের সমসাময়িক, বন্ধুসদৃশ ও গ্রামে দাবা খেলার সঙ্গী। সেই সুবাদে বাল্যকাল থেকেই তিনি নানা উপলক্ষে কাজী সাহেবের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। এরকমই একটি অনুষ্ঠানে তাঁর দেখা কাজী সাহেবের আত্মভোলা স্বভাবের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘স্মৃতি থেকে লেখা’ প্রবন্ধে।
ঘটনাটি ১৯৭৭ সালের। তিনি তখন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব। ওই বছর রাজবাড়ী জেলার শতবর্ষী বিদ্যালয় হাবাসপুর কে রাজ উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন মেধাবী ছাত্র ড. গোলাম রব্বানী ব্রাজিলের আমাজন বনে মশা ও ম্যালেরিয়া নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে মশার কামড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হাবাসপুর- বাহাদুরপুর প্রাক্তন ছাত্র সমিতির পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি শোকসভা আয়োজন করা হয়। উক্ত শোকসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে কাজী মোতাহার হোসেন সাহেবকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় উপস্থিত সবাই একে একে অকালপ্রয়াত মরহুম ড. গোলাম রব্বানীর জীবন ও কর্মের ওপর বক্তৃতা প্রদান করেন। এরপর সভার সভাপতি হিসেবে আবু হেনা স্যার কাজী সাহেবকে তাঁর ভাষণ প্রদানের জন্য অনুরোধ জানালে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে ধীরে ধীরে এলাকার অনগ্রসরতার কথা, সাধারণ মানুষের কথা, প্রাক্তন ছাত্র সমিতির কথা বলতে থাকেন। কিন্তু যে উপলক্ষে সভাটি আয়োজন করা হয়েছিল সেই প্রয়াত ড. গোলাম রব্বানী সম্পর্কে কোন কথা না বলায় আবু হেনা স্যার আশঙ্কা করেন যে, ঐটা যে একটি শোকসভা ছিল তিনি হয়তো তা বেমালুম ভুলেই গেছেন। তাই বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে আবু হেনা স্যার দ্রুত একটি কাগজে লিখে তাঁর হাতে দিয়ে বিনীতভাবে তাঁকে সভার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত করলে তাঁর খেয়াল আসে। তখন তিনি ড. রব্বানীর অকাল মৃত্যুর জন্য গভীর দুঃখপ্রকাশ করেন এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। উল্লেখ্য ড. গোলাম রব্বানী মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে ব্রাজিলীয় এক মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর কোন সন্তান ছিল না।
এরকমই আত্মভোলা ছিলেন তিনি। তাঁর আত্মভোলা স্বভাব নিয়ে আরও কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো এ পর্বে।
লোকসাহিত্য বিশারদ মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন একবার তাঁর নতুন গাভীর দুধ খাওয়ার জন্য কাজী সাহেবকে তাঁর শান্তিনগরের বাসায় নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তিনি বাসার কাছাকাছি গিয়ে বাসার নাম্বার ও মনসুর উদ্দিনের নাম উভয়ই ভুলে যান। কাছাকাছি থাকা এক দোকানদারকে তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন ‘মাথায় বাবরী চুল এক বাউল কবির বাসা কোথায়?’ দোকানদার বাসা দেখিয়ে দিলে অতঃপর তিনি তাঁর বাউল কবির বাসায় পৌছান।
তাঁর এক ভাস্তির নাম ছিল তুরু। তিনি স্বামীসহ পুরান ঢাকার খাজা দেওয়ান রোডে বসবাস করতেন। কাজী সাহেব একবার তাঁর বাসায় বেড়াতে যান। কিন্তু পথ চলতে গিয়ে তিনি ভাস্তি জামাইয়ের নাম ভুলে যান, সেই সাথে তার বাসার নাম্বারও। উপায় না পেয়ে তিনি তখন বাড়ি বাড়ি উঁকি দিয়ে জিজ্ঞস করেন, ‘তুরুর মা কি এই বাসায় থাকে?’ ভাস্তি জামাই কাজী সাহেবের আত্মভোলা স্বভাবের কথা আগে থেকেই জানতেন। তাই কাজী সাহেবকে রাস্তায় ইতস্তত ঘুরাঘুরি করতে দেখে তিনি তাঁকে বাসায় নিয়ে যান।
আরেকটি ঘটনা। তিনি তখন ফজলুল হক হলের হাউস টিউটর। মিসেস কাজী একদিন তাঁকে মৌলভীবাজার থেকে বাজার করে আনতে তাগাদা দিলেন। তিনি বাজারে গেলেন ঠিকই কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন একটি বই। বাজার শেষ করে তা ঠেলাগাড়িতে তুলে দিয়ে নিজে গাড়ির মধ্যখানে বসে বইটি পড়তে পড়তে বাসায় আসেন। কেউ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন বইটি অসমাপ্ত অবস্থায় বাজারে যাওয়ার তাড়া পান। তাই বইটি সঙ্গে নিয়েছিলেন। বাজার করা ও বই পড়া দুটোই একসাথে করলেন। ভালোই তো হলো। নিজে যাই বলুন না কেন কাজী সাহেবের সহধর্মিণী বিষয়টিকে ভালভাবে নেন নি। ভবিষ্যতে বিপদের আশঙ্কায় এরপর থেকে মিসেস কাজী আত্মভোলা এ স্বামীকে আর কখনো বাজারে পাঠাননি।
একবার তিনি তাঁর সেগুনবাগিচার বাসায় বেশ কয়েকজন অধ্যাপক বন্ধুকে দুপুরের খাবারের জন্য দাওয়াত করেন। কিন্তু মিসেস কাজীকে তা বলতে ভুলে যান। অবশ্য ভালো বাজার করার জন্য তিনি নিজেই সকালে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যান। আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ যথাসময়ে হাজির হলেন। মিসেস কাজীকে জানালেন যে কাজী সাহেব তাদের দাওয়াত করেছেন। মিসেস কাজীর তো তখন চক্ষু চড়কগাছ। এতোজন সম্মানিত মেহমানকে তিনি কী খাবার পরিবেশন করবেন তা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই তার গলদঘর্ম অবস্থা। মনে মনে হাজারটা গালি দিলেন ভুলোমনা স্বামীকে। যাইহোক তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করে অতিথিদের আপ্যায়ন করলেন। সন্ধ্যায় কাজী সাহেব বাসায় ফিরলেন বটে কিন্তু তখনও বাজার ছাড়াই। মিসেস কাজীকে কোন ধরণের ভণিতা না করেই বললেন বাজারে যাওয়ার পথে দাবা খেলা দেখে বসে পড়লাম। খেলা শেষ হলো সন্ধ্যায়। তাই আর বাজারে যাওয়া হয়নি।।
এর আগে কোন এক পর্বে বলেছিলাম যে, কাজী সাহেব এতোই আত্মভোলা ছিলেন যে মাঝে নিজের বাড়িটি পর্যন্ত চিনতেন না। এ সম্পর্কে একটি ঘটনার অবতারণা করছি যাতে পাঠকগণ তাঁর আত্মভোলা স্বভাবের মাত্রা সম্পর্কে অনুধাবন করতে পারেন। তাঁর একই গ্রামের প্রতিবেশী মরহুম আজিজুল কাদেরের ‘অন্তরঙ্গ আলোকে কাজী মোতাহার হোসেন’ শিরোনামের লেখা থেকে ঘটনাটি সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ঘটনাটি বলতে গিয়ে কাজী সাহেব নাকি নিজেই অনেক হেসেছিলেন। তিনি কাজী সাহেবের প্রত্যক্ষ বয়ানের মাধ্যমে ঘটনাটি উল্লেখ করেছিলেন। এখানেও তেমনটি করা হলো।
‘একবার আমি কৃষি বিষয়ক কমিশনের সদস্য হয়ে দু’বছরের জন্য করাচীতে ছিলাম। আমার অবর্তমানে আমার স্ত্রী বাড়িটির দোতলা নির্মাণের কাজ শেষ করে। একথা আমাকে জানিয়েছিল কিনা মনে নেই। দু’বছর পর করাচী থেকে ফিরে সেগুনবাগিচা এসে আমার নিজ বাড়ি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বাড়ির সামনে এসে বাড়িটি দোতলা দেখে আমার বাড়ির মনে হলো না। আমিতো একতলা বাড়ি করেছিলাম। শেষে পাড়ারই এক বাড়িতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা কাজী মোতাহার হোসেনের বাড়িটি কোথায়? বাড়িওয়ালা ওই দোতলা বাড়িটি দেখিয়ে দিল। আমি বাড়িতে ঢুকে স্ত্রীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। স্ত্রী বুঝতে পেরে বললেন, বাড়িটি দোতলা করেছি সেকথা তো চিঠিতে জানিয়েছিলাম। বলাবাহুল্য চিঠির কথা আমি ভুলে গিয়েছিলাম।’
লেখক: শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































