“৬০-এর দশকে রেলওয়ের এসডিও-দের ছিলো রাজকীয় ভাব”- লেখক- নুরুল হক আলম –
- Update Time : ০৭:১৬:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর ২০২১
- / ৫৩ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
আমরা ছোটবেলায় রাজবাড়ীতে সবচাইতে বড় অফিসার বলতে বুঝতাম রেলের এসডিও বা এএক্সইএন। সাব ডিভিশন শহরে একজন এসডিও থাকতো। আমরা তাকে বলতাম সিভিল এসডিও। সিভিল এসডিও আমাদের কাছে ছিল গুরুত্বহীন। ৬০ এর দশকের কথা বলছি। কেন গুরুত্বহীন বলছি সেকথা।
আমাদের বয়স তখন ৮/৯ বুঝি কম। সে সময়ে বিনোদন বলতে বুঝতাম ফুটবল খেলা। বড় বড় ফুটবল খেলার আয়োজন হতো রেলওয়ে ময়দানে। জনতার ঢল নামতো। রেশ থাকতো নির্দিষ্ট দিনের কয়েকদিন আগে ও পরে। রেলের মাঠে তিল ধরনের জায়গা থাকতো না। কিন্তু রাজবাড়ী রেলের সবচেয়ে বড়ো কর্মকর্তা রেলের এসডিও সাহেবের জন্য বরাদ্দ থাকতো নির্দিষ্ট আসন। সেই আমলে আমরা যেটাকে রাজকীয় আসন মনে করতাম সেটা হচ্ছে রেলের মাঠের পশ্চিম দিকে টিনের অনেক বড়ো একটা বাসা ছিলো, বাসার সামনে মাঠ বড়াবড় একটা লন। লনের সামনে অনেক উঁচু হেলান দেয়া যায় স্লিপার দিয়ে বানানো একটা বেঞ্চ। ওখানে বসে এসডিও সাহেব খেলা দেখতেন পরিষদ বর্গ সহ। রাজকীয় ভাব। আমাদেরতো মাথাই নষ্ট। আজকের দিনে রুপালী পর্দার নায়ক-নয়িকা বা ভি আইপি দের ব্যক্তি জীবন নিয়ে মানুষের যেমন আগ্রহ থাকে। সেই সময়ে রাজবাড়ীর বড়ো কর্মকর্তার ব্যক্তি জীবন নিয়েও মানুষের আগ্রহের সীমা ছিল না।
আমাদেরও শোনা কথা রেলের এক এসডিও সাহেব ছিলেন ইংরেজ তিনি সধারন মানুষের সাথে মিশতেন। সুখে দুখে পাশে দাড়াতেন। একবার এমনি এক অনুষ্ঠানে নিম্ন বর্ণ বাগদি মহিলার সাথে তার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে প্রেম ভালোবাসা। সবশেষে পরিণয় এবং এ পরিণয়ের সমাপ্তি ঘটে মহিলাটির দুঃখ জনক তিরোধানের মধ্যে দিয়ে। মৃত্যুর পর ভালোবাসার মানুটির কবর দেন বাসার দক্ষিণ দিকে বাসার সীমানা ঘেষে খুবই সযতনে। কবরটি এখনো আছে খুব অবহেলায়। আমরা ছোটবেলায় দেখেছি কবরটি, খুবই ঝকঝকে তকতকে, পাথর দিয়ে বাধানো। সোনা রতœ পাবার আশায় বহুবার রাতের আধারে কবরের ঢাকনা খুলে চেষ্টা চালানো হয়েছে।
রেলের লাল দুটো বাসা ছিল, রেলের এসডিও এবং পি ডাব্লিউ আই সাহেবের। সেই আমলে দেখার মতো, বাগানে ঘেরা সাজানো বাসা। বড়ো বড়ো টিনের কয়েকটা বাসা ছিল রেলের কর্মকর্তাদের। রাজবাড়ীতে দালান কোঠা ছিল না। শুধু ছোট বড়ো টিনের ঘর।
রাজবাড়ীতে এখন ৫/১০ তলা বহু বড়ো বড়ো বিল্ডিং। জেলা শহর। ডিসির বাংলো।এসপির বাংলো।পুরানো মানুষ, নতুন দেখে আনন্দ পাই। বিমোহিত হই। তারপরও পুরানোকে ফিরে দেখি। মনে হয় আগের দিনগুলো কতোই না সুন্দর ছিল।
গরীবের ডাক্তার, মাখন ডাক্তার। সেই আমলে মাখন বাবুকে চিনতেন না এমন লোক পাওয়া যেত না।অসুখ বিষুখে সবারই একমাত্র ভরসা, মাখন বাবু। একাডেমিক সনদ ছিল না। কিন্তু অভিজ্ঞতায় টৈ টুম্বর। পাস করা কোন ডাক্তার ছিল না রাজবাড়ীতে। ডাক্তার ছামদানী রেলের ডাক্তার ছিলেন উনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেশ কিছু দিন প্রাকটিস করেছিলেন। যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন। উনি এল এম এফ ছিলেন।এখনতো এমবিবিএস গুনে শেষ করা যাবেনা। এএফসি পিএস, এমডি। যদিও বর্তমান প্রয়োজনে অনেক কম।
রাজবাড়ীতে দুজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ছিলেন, ডাক্তার ইয়াহিয়া যিনি নিমতলা ডাক্তার নামে সমাধিক পরিচিত। সম্পর্কে তিনি বঙ্গবন্ধুর চাচাত ভাই। টুঙ্গিপাড়া একই বাড়ীতে বড়ো হয়েছেন। ডাক্তার সুরেন। আমার বন্ধু সমতুল্য। কলেজে একসাথে লেখাপড়া করেছি। সমাধিক পরিচিত গরীবের ডাক্তার হিসেবে। পরবর্তীতে বদু ডাক্তার সাহেব যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিলেন। ডাক্তার সাহেবরা সবাই গত হয়েছেন। রেখেগেছেন হাজারো ম্মৃতি। সবাই চলে যায়। যেতে হয়।
আমার বাবা রেলওয়েতে চাকরি করতেন। রেলওয়ে ক্লাবের সম্পাদক ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে রেল ফুটবল লীগে চাম্পিয়ন হয়েছিল ৬০ এর দশকে। দুই বোন জামাই রেলওয়েতে কর্মরত ছিলেন। সবাই গত হয়েছেন। স্বাভাবিক ভাবেই আমি রেলের প্রতি খুব দুর্বল।
মানুষের মাঝে অনেকেই বেঁচে থাকতে চায়। সবার কি সেই সৌভাগ্য হয়?
লেখক- নুরুল হক আলম, অধ্যক্ষ, রাজবাড়ী কিন্ডার গার্টেন।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































