“একটি অপরিণত প্রেমপত্র”- লেখক : শিপন আলম –
- Update Time : ০৮:৪৩:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ অগাস্ট ২০২১
- / ৫০ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
সালটি হয়তো ১৯৯৭-৯৮ হবে। অমিত তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সবেমাত্র ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে। শৈশবের সংকীর্ণ খোলস থেকে বের হয়ে কৈশোরের অবারিত পথে পা বাড়িয়েছে সে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শৈশবের সোনাঝরা দিনগুলো কেটেছে তার। বিদ্যালয়টি নিজ পাড়াতে অবস্থিত হওয়ায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত একটানা সেখানেই পড়েছে সে। দুই একজন পার্শবর্তী গ্রাম থেকে আসলেও অধিকাংশ সহপাঠীই ছিল নিজ পাড়ার। ত্রিশজন সহপাঠী একসাথে পাশ করলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তার সাথে ভর্তি হয়েছিল মাত্র কয়েকজন। জীবনে সেই প্রথম বিচ্ছেদের মুখোমুখি হয় সে। অনেক কাছের বন্ধুরা দূরে চলে যায়। জীবনের বাঁকে বাঁকে যে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা রয়েছে এর আগে সে সম্পর্কে তার কোন ধারনাই ছিল না। আশেপাশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়ে। কারও বা লেখাপড়াই হয়নি আর।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তার সাথে যারা ভর্তি হয়েছিল তাদের মধ্যে দুজনের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল খুবই গাঢ়- সোহান আর মিজান। একই পাড়াতে বাড়ি তাদের। একসাথে নদীতে গোসল করা, খেলাধুলা করা, ঘুরাঘুরি করা, মারামারি করা, পাখির বাসা খোঁজা- সবই ছিল তাদের নিত্যকার কাজকর্ম। বয়স অল্প হলেও তিনজনই একটি মেয়েকে খুব পছন্দ করতো, বলতে গেলে ভালোও বাসতো। শুনতে একটু কেমন মনে হলেও ঘটনাটি এরকমই। তাদেরকে ইঁচড়েপাকা বললেও অত্যুক্তি হবে না।
মেয়েটি ওদের ক্লাসেই পড়তো। একই সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডিও পার হয়েছে। তার নাম ফারিহা। বিপরীত জেন্ডারের প্রতি তাদের ভাল লাগার শুরু হয়তো ওই মেয়েটার মাধ্যমেই। পাশের পাড়াতেই ছিল ওর বাড়ি। বাজারে বা স্কুলে আসতে যেতে ওর বাড়ির পাশ দিয়েই আসতে-যেতে হতো। তিনজনই ছুটির দিনগুলোতে আর বিকেল বেলায় একসাথে ওর সন্ধানে ঘুরে বেড়াতো। তিনজনই জানতো যে তারা প্রত্যেকেই ফারিহাকে ভালবাসে অথচ তাদের মধ্যে এটি নিয়ে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, কোন মনোমালিন্য ছিল না। তিনজনের সখ্যতায়ও ভাটা পড়ে নি কখনো। কৈশোর প্রেমের এ এক অদ্ভুত উপাখ্যান।
ফারিহাদের আর্থিক অবস্থা ওদের মতোই ছিল। বাবা একটু খাম-খেয়ালি স্বভাবের ছিল। কোন নির্দিষ্ট পেশা ছিল না তার। যখন যা মনে আসতো তাই করতো। কখনো হয়তো বাসের কন্ডাক্টর, কখনো মেকানিক, কখনো বা নিজেই বাজারে মুদি দোকান খুলে বসতো, কখনো বা বাড়ির পাশে ধান, গম ভানার মেশিন দিতো ইত্যাদি। মা গৃহিণী হলেও পুরোদস্তুর সংসারি ছিলেন। তিনিই পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট পরিবারটিকে পরম যত্নে আগলে রেখেছিলেন। তাই ছোটবেলাতেই ফারিহাও হয়েছিল তার মায়ের মত- যথেষ্ট সংযমী ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। সংসারের অভাব অনটনের কারণে সে হয়তো মাঝে মাঝে বিকেল বেলায় হাতে ছোট একটা বাটি নিয়ে দু একজনকে সাথে নিয়ে বাড়ির পাশের ছোট মাঠটিতে কলমির শাক, পাটের শাক তুলতে যেতো। কিন্তু অমিতদের জ্বালায় সেটিও সম্ভব হতো না। তারা ওর গায়ে চিমটি কাটতো, চুল ধরে টান দিতো, বাটি কেড়ে নিতো, শাক ফেলে দিতো, বাটির মধ্যে কখনো কখনো মাটির টুকরো দিতো ইত্যাদি। দুষ্টুমির মাত্রাটা বেশি হলে ও তখন তাদের ‘বাবাকে বলে দিব’ বলে ভয় দেখাতো। দেখা যেতো তখন আর তারা ওকে কিছু বলতো না। কিন্তু পরে আবার ঠিকই বিরক্ত করতো। ইভটিজিং এর বিষয়টি তখন এতো জনপ্রিয় হয়নি। হলে হয়তো অতি অল্প বয়সেই তাদের ইভ টিজিং এর মামলার শিকার হতে হতো।
তিনজনের মধ্যে অমিতের হয়তো ফারিহার প্রতি একটু বেশিই দূর্বলতা ছিল। সোহান আর মিজানের ব্যাপারেও সে ছিল সন্দিহান। তাই দুজনকে নিয়ে তার ভয়ের কমতিও ছিল না। যদি তাদের কেউ তার আগে নিজের পছন্দের কথা জানিয়ে দেয় আর ফারিহাও রাজি হয়ে যায় তখন তার কি হবে- এই আশঙ্কায় তাই সে আর বেশিদিন তার আবেগকে চেপে রাখতে পারলো না। কিভাবে কি করা যায় তা নিয়ে সে বিস্তর ভাবতে লাগলো। মানুষ ছোট বলে তার ভাবনার জগৎও ছিল ছোট। চিন্তার পরিধিও ছিল সংক্ষিপ্ত। একবার ভাবলো ফারিহার সাথে খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে তার এক চাচাতো বোনের মাধ্যমে সে ফারিহাকে তার ভাল লাগার কথাগুলো বলবে। পরক্ষণে মনে হলো যদি তার চাচাতো বোন পরিবারের অন্য কারো কাছে বলে দেয় তাহলে সে ধরা পড়ে যাবে। ছোট হলেও তার একটা মান সম্মান আছে। এটি কোনভাবেই খোয়ানো যাবে না। তাহলে কি করা যায়? সে আরও ভাবতে লাগলো। কারণ একটি বইতে সে পড়েছিল- ভাবনায় দুয়ার খোলে। এখনকার মতো মোবাইল তখন এতো সহজলভ্য ছিলো না। খুব অল্প সংখ্যক ধনী মানুষদের নাগালে ছিল এ আশ্চর্য যন্ত্রটি। ইন্টারনেট আসলেও ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটস অ্যাপ এগুলোর কোন হদিস ছিল না। এসব কারো ধারণাতেই ছিল না তখন। তখন মনের কথাই হোক আর আনুষ্ঠানিক যোগাযোগই হোক সব প্রয়োজনেই সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ছিল চিঠির আদানপ্রদান। মনের কথাগুলো পরম যত্নে লণ্ঠন বা চেরাগের নিভু নিভু আলোয় জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠতো প্যাডের রঙিন পাতায়। সেসব চিঠির প্রতিটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকতো হৃদয় নিঙড়ানো আবেগ আর ভালবাসা। অমিতের যেখানে বাস সেখানকার পাড়া-পড়শিদের মধ্যে চিঠি পড়ার লোকের খুব অভাব ছিল। তাই মাঝে মাঝেই তার ডাক পড়তো চিঠি পড়ে শুনানোর জন্য। হয়তো এক প্রতিবেশীর ছেলে ঢাকাতে ছোটোখাটো চাকরি করে, অনেকদিন বাড়ি আসে না- তার নিকট থেকে প্রাপ্ত চিঠি যখন সে পড়া শুরু করতো তখন তার বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই গোল হয়ে নিবিষ্ট হয়ে মুগ্ধতার সহিত ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের সুরত আলীর পুঁথি পাঠের মতো তার চিঠি পড়া শ্রবণ করতো। চিঠি পড়া শেষ হলে অমিতকে তারা গুড়, মুড়ি, চিড়া, গাছ থেকে পাড়া পেয়ারা ইত্যাদি খেতে দিতো। চিঠি পড়তে পারার সুবাদে অতটুকু বয়সেই পাড়ার মধ্যে তার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
চিঠি পড়ার কথা ভাবতেই তার মাথায় এলো চিঠির ভাঁজেই ফারিহাকে তার মনের কথাগুলো জানাবে সে। শুক্রবারের বাংলা সিনেমাতেও সে দেখতো নায়ক নায়িকারা প্রেম নিবেদন করছে হয় সামনাসামনি নয়তো চিঠির মাধ্যমে। সিনেমার নায়কদের মতো সামনাসামনি বলা তার দ্বারা সম্ভব নয়। এরকম সাহস হতে তাকে নায়কদের মতো বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু অতো ধৈর্য তার নেই। তাই অনেক ভেবেচিন্তে কোন এক শুভক্ষণে যখন বাড়িতে কেউ ছিল না তখন চিঠিটি লিখলো সে। কোন রকম ভণিতা না করেই শুধু মূল কথাগুলো লিখলো সে। ভণিতা করার মতো জ্ঞানও অবশ্য তখন তার হয়ে ওঠেনি। চিঠিটির কথা ছিল এরকম-
“ফারিহা, আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। তুমি যদি আমাকে ভালবাসো, বলো। আর যদি না ভালবাসো তাও বলো। মা-বাবা, ভাই-বোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা- কেউ যেন জানতে না পারে….
আরও হয়তো কিছু কথা লিখলো তবে মূল কথাগুলো এরকমই। আজ আর সে মনে করতে পারে না।
চিঠি লেখা শেষ করে পড়লো আরেক বিড়ম্বনায়। চিঠিটা রাখবে কোথায়? কারণ তারা দুই ভাই এক পড়ার টেবিল ব্যবহার করতো। ফলে টেবিলের ড্রয়ারে রাখার কোন সুযোগ ছিল না। ভাই ছিল তার চেয়ে বড়। ফলে রুমে তার কর্তৃত্বই বেশি ছিল। অনেক ভেবে চিন্তে চিঠিটি রাখলো ইসলাম শিক্ষা বইয়ের মলাটের মধ্যে। তার এই চিন্তার উৎসও তখন বাংলা সিনেমা। স্যাটেলাইট আর ইন্টারনেটের এ যুগে এখনকার ছেলেমেয়েদের এসবের উৎস হয়তো আরো অনেক কিছু। কিন্তু তখনকার দিনে বাংলা সিনেমাই ছিল অমিতদের শেখার ও জানার অনেক বড় উৎস। অমিত সিনেমায় দেখতো নায়ক-নায়িকারা বলছে – প্রেম পবিত্র জিনিস, স্বর্গ থেকে আসে স্বর্গে চলে যায়। লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ এই পবিত্র প্রেমের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে, জীবনে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয়েছে ইত্যাদি নানা রকম আবেগপূর্ণ যুক্তি তখন তার মাথার মধ্যে বিচরণ করতে লাগলো।
সে যাইহোক, সিনেমার প্রেম আর বাস্তবের প্রেম যে এক নয় তা বুঝতে তার বেশিক্ষণ বিলম্ব হলো না। সিনেমার পবিত্রতা আর বাস্তবের পবিত্রতাও যে এক নয়- এটিও সে বুঝতে পারলো। কারণ বইটা যতই ধর্ম বই হোক না কেন এই বইয়ের মলাটের ভেতর রাখাটাও যে মস্ত বড় ভুল ছিল তা বুঝতে পারলো ঘটনা ঘটার পরে…
এর কিছু দিন পূর্বে ভাইয়ের শার্টের পকেট থেকে অমিত কিছু টাকা মেরে দেয়। তখনকার দিনে ব্যাংক ব্যবস্থা এতো শক্তিশালী ছিল না। মানুষের হাতে এতো টাকা পয়সাও থাকতো না যে তারা ব্যাংকে জমা রাখবে। অধিকাংশ মানুষই ছিল ব্যাংক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তখন টাকা জমা করার অদ্ভুত কিছু উপকরণ ছিল যা মনে করে অমিতের এখনো হাসি পায়। অনেকেই কোমড়ে নাইলন বা কট জাতীয় শক্ত সুতা প্যাঁচানো এক ধরণের বন্ধনী (স্থানীয় ভাষায় যাকে গাজো বলা হতো) ব্যবহার করতো টাকা চুরি যাওয়া বা হারানোর ভয়ে। গোসলের পানিতে ভিজে যাতে নষ্ট না হয় এজন্য সাধারণত কাঁচা টাকা রাখা হতো এ প্রক্রিয়ায়। তবে কাগজের টাকাও রাখা হতো যদিও তা পলিথিনে মুড়ে। আর ভিজে গেলে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হতো। অনেকেই আবার বিশেষ করে অল্প বয়সীরা ঘরের খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি খাম্বায় ছোট গর্ত করে তার মধ্যে তাদের স্বল্প সঞ্চয় সংরক্ষণ করতো। উৎসবে বা পুজা পার্বণে সেটি নিচের দিক থেকে আরেকটি গর্ত করে সেই টাকা পয়সা বের করা হতো।
অমিতের বেলায়ও হয়েছিল এমনটিই। সামনে ছিল গাশ্মীর মেলা। বড় ভাই হয়তো অনেক কষ্টে এক টাকা, দু টাকা করে বাঁশের খাম্বায় জমানো টাকাগুলো বের করে শার্টের পকেটে রেখেছিল মেলায় খরচ করবে বলে। তাই টাকা না পেয়ে ভাইয়ের মাথা খারাপ হয়ে যায়। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল টাকাগুলো অমিতই নিয়েছে। কারণ মাঝে মধ্যেই তাদের একে অপরের টাকা মেরে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। তাই টাকা না পাওয়া মাত্রই তার ভাই টেবিলের ড্রয়ার, তোশকের নিচে সব জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলো। সেখানে না পেয়ে সবশেষে এলো অমিতের বইগুলোর কাছে। সবগুলো বই খোঁজার পরে ইসলাম শিক্ষা বইয়ের মলাট খুলতেই কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে এলো। সন্ধ্যা বেলায় রুমে প্রবেশ করতেই তার বড় ভাইয়ের সাথে দেখা। দেখামাত্রই সে তার সদ্য লেখা প্রেমপত্রটির দু একটি লাইন জোরে জোরে আওড়াতে লাগলো-
“তুমি যদি আমাকে ভালবাসো, বলো। আর যদি না ভালবাসো তাও বলো। মা-বাবা, ভাই-বোন, শিক্ষক-শিক্ষিকা- কেউ যেন জানতে না পারে।”
কথাগুলো খুব দ্রুতই অমিতের স্মৃতিতে আঘাত করলো। সাথে সাথে সে তার ইসলাম শিক্ষা বইয়ের মলাট খুলে দেখে ফারিহাকে লেখা তার চিঠিখানা নেই। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। এতো গোপনীয়তা, এতো চিন্তা ভাবনা, এতো কৌশল খাটিয়েও উদ্ধার হলো না তার। ঘটনার আকস্মিকতায় সে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। বুঝতে পারলো এমন পরিস্থিতিতে টাকাগুলো নিয়ে বড় ভাইকে খেপানো তার ঠিক হয় নি। তৎক্ষণাত তার বড় ভাই বাম হাতে চিঠিখানা নিয়ে ডানহাত বাড়িয়ে বললো- “আমার টাকা?”
ভাইয়ের হাতে চিঠিখানা দেখে অমিতের অনুশোচনার সীমা রইলো না। শিকার ধরতে গিয়ে শিকারি যেন সহসা নিজেই শিকার হয়ে গেল। অগত্যা ভাইকে তার টাকাগুলো ফেরত দিতে হলো এবং ফারিহাকেও আর চিঠিখানা দেওয়া হলো না।
লেখকঃ শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































