শিশুতোষ গল্প : পোড়ো বাড়ির “কেলো ভুত”: – অমিতা রাণী সাহা –
- Update Time : ০৫:০২:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১
- / ১৩৮ Time View
রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
দশ/এগারো বছরের দুঃসাহসী বড় ভাই বল্টু দাদার হাত ধরে ছোট বোন ছুটকি যখন আম বাগানে গিয়ে পৌছুল তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। ফর্সা ভাবটা একটু বেড়েছে মাত্র। ছুটকি প্রথমে কিন্তু আসতে চায়নি। কারণ বাবুদের পোড়ো বাড়ীতে যে ভুত আছে -সে কথা সবাই জানে। ছুটকিও জানে। সেসব ভুতের নানা রকম কাহিনী। কেউ কেউ আবার নিজ কানে সেসব ভুতদের হাসি-কন্নার শব্দও শুনেছে। আজকাল নাকি কুচকুচে কালো রঙের, বিশাল আকৃতির এক ভুত দেখা যাচ্ছে। তার বড় বড় মূলোর মতো সাদা সাদা দাঁত আর বুকের উপর সাদা রঙের বড় বড় দুটো চোখ। সেই ভুতের ভয়ে কেউ বাবুদের বাগান বাড়ীর দিকে খুব একটা এগুতে সাহস করেনা। বোনের আপত্তি শুনে দাদা বললো- “ভয় কী ? আমি তোকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি, সেই মন্ত্র পড়ে বুকে ফুঁ দিলে ভুতের বাপেরও সাধ্য নাই কাছে আসে। আমার সাথে সাথে বল-ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি। রাম-লক্ষণ বুকে আছে করবি আমার কী?” সেই মন্ত্রটাই প্রাণ-পণে আওড়াতে আওড়াতে, দাদার হাত ধরে বাবুদের পোড়ো বাড়ীর আম বাগানের দক্ষিণ দিকটার বড় আমগাছটার তলায় এসে দাঁড়ালো ওরা। বড় গাছটার তলায় চার চারটি পাকা টুলটুলে আম পেয়ে বল্টু তো খুশিতে বাগবাগ।
ছুটকি বললো -“দাদা, এখনও কেউ আসেনি, বল ?”-“মনে হয়। কিন্তু ওদিকটা দিয়ে যদি কেউ ঢুকে পরে ?
ছুটকি ভিশন খুশি হয়ে বললো- “চল দাদা, কী সুন্দর আম! কেউ আগে ভাগে এসে যদি নিয়ে নেয় ? তাড়াতাড়ি চল।”
তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। বাগানের ভেতরের দিকটায় অন্ধকার আরও বেশি ঘনীভূত। আম কুড়ুনীদের অবিশ্রান্ত পদচারণায় একটি বছর ধরে গজিয়ে ওঠা আগাছা গুলো ধুলিসাৎ হয়ে গেছে এইটুকু যা সুবিধা। দাদার হাত ধরে যেতে যেতে ছুটকি অনবরত ভুতের মন্ত্রটা বিড়বিড় করে আওড়ে যাচ্ছিল। সিঁদুরে গাছের কাছাকাছি যেতেই বল্টুর মনে হলো-একটু নড়াচড়ার শব্দ। সে কান পাতল, দৃষ্টিটাকে আরও একটু প্রখর করার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুই নজরে পড়ল না। আরেকটু এগুতেই সে দেখতে পেল -একটি কালো কুচকুচে চারপেয়ে জন্তু। বিশাল একটা মাথার উপর বড় বড় দুটো সাদা রঙের চোখ। ভুত! বল্টু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। ছুটকি তখনও কিছুই দেখতে পায়নি। কিন্তু দাদা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ায় তার হাতে যে টানটুকু পড়ল তার মধ্য দিয়েই দাদার মনের সচকিত ভাবটি ছোট্ট ছুটকির বুকখানিতে সঞ্চালিত হয়ে তার বুকের ধুকপুকানিটাকে শতগুণ বাড়িয়ে দিল। সে আরও জোড়ে জোড়ে এবং দ্রুত গতিতে মন্ত্র আওড়াতে শুরু করল।
বল্টুর বুকের ভেতরটায় কেমন হিম হয়ে এলো। পা দুটো অবশ হয়ে আসছিল। ও ভাবল ছুটকী দেখতে পায়নি। মনে-প্রানে চাইছিল ছুটকী না দেখুক। কিন্তু ছুটকী ততক্ষনে দেখে ফেলেছে। সে” দাদা ভু—-।” এই পর্যন্ত বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। বল্টুর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সে খুব খারাপ কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিল কিন্তু ভুতটা হঠাৎ করে দূই পা দিয়ে একটা ভারী কী যেন তুলে নিয়ে অন্য দুটো পায়ে দৌড়ে দ্রুত আড়াল হয়ে গেল। ছুটকী লুটিয়ে পড়তেই বল্টুর মাথা থেকে ‘ভূত’ উধাও হয়ে গেল। সে বারবার ছুটকীকে সজাগ করার চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুতেই যখন সে জাগলো না তখন বল্টু খুব ভয় পেয়ে গেল। এ অবস্থায় ছুটকীকে বাড়ী নিয়ে গেলে ওকে প্রচন্ড মার খেতে হবে। উপায়ান্তর না দেখে সে ছুটকী ছুটকী বলে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল।
বৈশাখের শেষ। গাছে গাছে পাকা আমের হাতছানি। থাকনা যতই ভুতের ভয় বল্টুর মতো দুঃসাহসী ছেলের দল কী তা উপেক্ষা করতে পারে? বল্টুকে বেশিক্ষন অপেক্ষা করতে হলো না। অল্প সময়ের মধ্যেই বেশ কয়েকজন এসে উপস্থিত হয়ে গেল। বন্ধুদের সহযোগিতায় ছুটকীর জ্ঞান ফিরিয়ে কোলে তুলে বাড়ীতে নিয়ে এলো ও। আসার পথে বোনকে বারবার অনুরোধ করলো -বাড়ীতে এসব না বলতে।
দুপুরের মধ্যেই প্রচন্ড জ্বরে ছুটকী বিছানা নিল এবং প্রায় পনের দিন ধরে যমে- মানুষে টানাটানি করার পর মেয়েটি সুস্থ হলো বটে; তবে এতটাই দূর্বল হয়ে পড়লো যে -কথা বলার শক্তিই প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেলো। বলাই বাহুল্য যে, ঘটনাটা জানতে কারই আর বাকী রইল না। কথাগুলো এক মুখ থেকে অন্য মুখ হতে হতে এমন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করলো যে, সন্ধ্যা-রাত্রি তো দূরের কথা দিনের বেলাতেও কয়েকটি দুঃসাহসী দস্যি ছাড়া অন্য সবাই পোড়ো বাড়ীর ধারে -কাছে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেললো।
সবাই যখন কাল্পনিক ভুতের অতিপ্রাকিত ক্ষমতার নানা রকম গল্প রচনায় ব্যস্ত তখন দুজন মাত্র প্রত্যক্ষদর্শী এ ব্যপারে একেবারে নীরব হয়ে রইলো। একজন শক্তিহীন আর অন্যজন বিশ্বাস -আবিশ্বাসের টানাপোড়নে হিসেব মেলাতে খেই হারিয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। সে মনে মনে কেবলি ভাবতে লাগলো-সত্যি যদি ভুতই হয় তবে পা কেন মাটিতে ছিল? (বড়দের থেকে জেনেছিল ভুতের পা মাটিতে পরে না) ভারী জিনিসটা কী ছিল? সেগুলো কী আম? ভুত কেন আম কুড়ালো?
এ ঘটনার প্রায় মাস খানেক পরের কথা-একদিন ভোর বেলা ছেলেদের হৈচৈ শুনে লাঠি-সোটা নিয়ে বড়রা বাবুদের আম বাগানে যেয়ে দেখলো -কালু চোট্টা উপুর হয়ে পড়ে কাঁতরাচ্ছে। তার কোমরের সাথে কালো রঙের লুঙ্গি সাইজের একখানা কাপড় বাঁধা। নিম্নাঙ্গ উলঙ্গ। তাঁর কালো কুচকুচে নিতম্বের উপর দুই পাশে সাদা রঙের (সম্ভবত চুন দিয়ে) বড় বড় দুটো চোখ আঁকা !
********** লেখিকা- অমিতা রাণী সাহা, প্রধান শিক্ষক, রাজাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরাট, রাজবাড়ী।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































