সৌদি আরব থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি: সাহিদা সুলতানা রীমা –
- Update Time : ০৫:৪০:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
- / ৮৬ Time View
দু’বছর আগের ঘটনা। মাটির টানে দেশে ফিরছিলাম। আমি ২৩ বছর সৌদি আরবে বসবাস করছি। বলা যায় আমার জীবনের একটা লম্বা সময় এখানে। পরিবারের সঙ্গেই থাকি সৌদি আরবে। যদিও এবার ফিরছিলাম একা।
সৌদি এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি ধীরে ধীরে দেশের মাটিতে ল্যান্ড করলো। যথাযথ নিয়মে সব ফর্মালিটিস শেষ করে লাগেজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছি। এ সময় প্রবাসীদের সঙ্গে কিছু আচরণে হতাশ হলাম। আবার বিদেশের উদ্দেশে নারী শ্রমিকদের যেতে দেখেও বুকটায় ধাক্কা দিয়ে উঠলো। হতাশ হলাম। কিছুক্ষনের জন্য ডুবে গেলাম একটি পুরোনো গল্পে। সেই গল্পটা কষ্টের। যে গল্পটা এখনো চোখ ভেসে ওঠে।
বেশ ক’বছর আগের কথা। হঠাৎ একটি মেয়ে এলো। মেয়েটি বাঁচতে চেয়েছিলো। মুক্ত হতে চেয়েছিল। আমরা ফ্লাইটে জন্য লাউঞ্জে অপেক্ষা করছি। দৌড়ে একটি মেয়ে এলো। এলোমেলো ঘোরাফেরা করছিলো সে, সেটা আগেই আমাদের চোখে পরেছিলো।
মেয়েটি আর্তনাদ করছিলো, ‘আমাকে বাঁচাও’। বলছিলো; ‘দয়া করে সাহায্য কর, আমাকে শারিরীক ও মানুষিক ভাবে নির্যাতন করে।
ভাঙা ভাঙা আরবি ও ইংরেজীতে কথা গুলো বলছিলো সে। সে পালিয়ে এসেছে। আর তাতে করেই মেয়েটি ইলিগ্যাল হয়ে গেলো। সৌদি আইন অনুযায়ি ওটা বেআইনি। মেয়েটিকে যদি তার ‘মালিক’ এসে ফিরিয়ে না নেয় তবে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবে। কোন এক সৌদি’র বাসার পরিচারিকা ছিল সে। তার চোখে জল, শরীর ভারসাম্যহীন। এদেশের আইনের কাছে আমরা বন্দী। কিন্তু কেউ কিছু করতে পারেনি সেইদিন। বিষয়টা এমন; যার বাসার পরিচারিকা সেই তার ভালো মন্দ দেখবে। যদি বাইরের আম জনতা এর মাঝে আসে সেটাও আইন বিরোধী। এমনকি কারো বাসাতে আশ্রায়ও দিতে পারবে না !
কিছুক্ষনের মধ্যেই উঁচু লম্বা দু’জন পুরুষ এলো। এ দেশে দুই ধরনের মানুষ আছে। যারা আদিবাসী তারা দেখতে সুশ্রী হয়, এমনটাই শোনা যায়। তোপ পরা ব্রাউন রঙা হন্তদন্ত দুই জন পুরুষ সামনে এলো। যুক্তিযুক্ত প্রমান ও কাগজ পত্র দেখিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে গেল। আইন বিরোধী কাজ দুরে বসে দেখা আর দর্শক হয়ে দেখা আর অনুমান করা ছাড়া কিছু করার নেই আমাদের। মেয়েটি বলেছিল, বাবা ও ছেলের নির্যাতনের স্বীকার সে। পরিস্কার হয়ে গেল এই সেই নর পিশাচ দুটো, যাদের শিকার হয়েছিলো মেয়েটি।
ভীষণ আহত হয়েছিলাম সেদিন যখন শুনলাম; বাংলাদেশ সরকার এদেশে যখন কাজের লোক পাঠাচ্ছিল। আজ তো চোখের সামনে দেখলাম তাদের নির্যাতনের দৃশ্য। নারী গৃহপরিচারিকা হয়ে যারা সৌদি আরবে পারি দিয়েছে, তাদের আহাজারি চোখের সামনে দেখলাম।
প্রতিটি নারী শ্রমিকেরই এমন ভিন্ন ভিন্ন গল্প আর অভিযোগ আছে। সংবাদ, ভাইরাল ভিডিও নিউজ মিডিয়া সব জায়গায় এ খবর স্থান পেয়েছে। এক হাজারেরও বেশি নারী রিয়াদ জেলে আটকা আছে। তারা নির্যাতিত। তারা বঞ্চিত, নায্য বেতন থেকে। কিন্তু তবুও থেমে নেই মেয়েদের বিদেশযাত্রা। কে বা কারা এবং কিভাবে যেন আমাদের দেশের নিরীহ নারী মেয়েদের প্রলভোন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে আসে।
ইন্দোনেশিয়া কিংবা আফগানরা কী পুরোপুরি নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দেয়নি? তবে বাংলাদেশ কেন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না? এই নারীদের কেউ পালিয়েছে, কেউ স্বেচ্ছায় পুলিশে ধরা দিয়েছে। অন্যদিকে মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে একটা শ্রেণী।
সৌদির আইন বেশ কড়া। বছর চারেক আগের একটি ঘটনা; কোন নিরাপত্তাকর্মী এ’কামা দেখার নাম করে ভিনদেশী কোন পরিবারের মেয়েকে নির্যাতন করে। বিচারে ৬ ঘন্টার মধ্যে তার মাথা কাটা যায়। কিন্তু চার দেওয়ালে বন্দী অসহায় ও কম শিক্ষিত আমাদের দেশের সহজ সরল নারীদের কাছে কী প্রমান আছে? সে যে অত্যাচারি, তার প্রমান কি করে করবে? কে শুনবে তার কথা?
আমরা কী এদেশের নৈতিকতা বিরোধী ও ইতর প্রজাতির মানুষের মানুষিকতা বদলে দিতে পারবো? সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা নিজেরা দৃঢ় থাকলে, আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করে মেয়েদের বাঁচাতে পারবো।
আর তাই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিনীত আবেদন, আমাদের মেয়েদের ফিরিয়ে নিন। নরী কর্মীদের ঘরে ফিরিয়ে নিন। আপনি খোঁজ নিন, এদেশে আমাদের নারীরা সামাজিকভাবে হেয় তো হয়ই, বরং অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। উন্নত জীবন তো দুরের কথা তাদের বেঁচে থাকাই দায়। দয়া করে তাদের পাশে দাড়ান। দেখবেন যেন আর একটি মেয়েকেউ যেন ভিন দেশে এসে কাঁদতে না হয়।
আমরা যারা সৌদি আরবে আছি; তাদের সম্মানের কথা মাথায় রাখুন। আমাদের মা-বোনদের সম্মানের কথা মাথায় রাখুন। দেশের সম্মানের কথাটুকুও মাথায় রাখুন। এভাবে ঢালাও নারী শ্রমিক বা গৃহ পরিচারিকা না পাঠানোই ভালো।
লেখক-
সাহিদা সুলতানা রীমা।
রিয়াদ, লাবান, সৌদি আরব এবং সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী, বাংলাদেশ।
০৪/০৯/২০২০।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































