পদ্মায় ভয়াবহ ভাঙ্গনে গোয়ালন্দের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেবগ্রাম ইউনিয়ন –
- Update Time : ০৯:৪৯:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
- / ৫১ Time View
আসজাদ হোসেন আজু, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
পদ্মার ভয়াবহ তান্ডবে প্রতি ক্ষনে ক্ষনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়ন। গত ৩/৪ দিনের অব্যাহত নদী ভাঙনে এই ইউনিয়নের হাজার হাজার বিঘা ফসলী জমি ও শত শত পরিববার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। এসকল পরিবার গুলো অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে।
বুধবার দুপুরে দেবগ্রাম মধু সরদার পাড়া গ্রামে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দু’এক মিনিট পর পরই নদীর পাড়ের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ছে নদীতে। ভয়াবহ এই পরিস্থিতি দেখতে নদীর পাড় জুরে ভীর করেছে শত শত মানুষ। এসময় কথা হয় ১০ নং যদু মাতুব্বার পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আকাশ মৃধা ও মকবুল হোসেনের সাথে। তারা জানান, তারা ২০/২৫ মিনিট আগে এখানে এসেছেন ভাঙন দেখতে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের চোখের সামনে অন্তত ১শ ফুট জায়গা নদী গর্ভে চলে গেলো।
অপরদিকে ওই সব এলাকার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বসত ভিটে থেকে দ্রুত ঘড়-বাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বসতভিটা থেকে চির বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফরিদা বেগম (৪৫) নামের এক গৃহীনি। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘ঘর ভাইঙ্গা নিয়া এক আত্মীয়র বাড়ি রাখতাছি। সেহানে রাইখা দমডা ফালাই, হেরপর দেহুম কোনে যাওয়ন যায়। এহানেতো ভাঙনের ডরে দম বন্দ হয়া আসতাছে।’
আর একটু এগুতেই চোখে পড়ল এক হৃদয়বিদার দৃঃশ্য। একটি পরিবার তাদের ঘর-বাড়ি, গরু-ছাগল নিয়ে একটি ট্রলার বোঝাই করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। নারী-পুরুষ-শিশুসহ প্রত্যেকেরই চোখে জল। তাদের বিদায় দিতে আসা গ্রামবাসীর চোখেও জল। এ বিদায় যেন অন্য রকম এক যন্ত্রনার। বছরের পর বছর যাদের সাথে কেটেছে, কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সব ছিন্ন করে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা। হয়তো আর কখনো এভাবে দেখা হবে না। বিদায় নেয়া পরিবারের সদস্য লালন সরদার (৪৮) কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘পাগলা নদী আমাগো একসাথে থাকতে দিলো না।’
দেবগ্রামের তোরাপ আলী সরদার (৬০), ফুলচাদ (৪৫), রিজিয়া বেগম (৩৮), আবুল শেখ (৫০), আফছার সরদার (৬৫)সহ অনেকেই জানান, সপ্তাহখানেক ধরে এ এলাকার নদী ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। প্রতি মুহুর্তে এ এলাকার মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় কোন জনপ্রতিনিধি বা সরকারের কেউ তাদের খবর নিতে আসেননি। তাদের সামন্যতম খোঁজ খবর পর্যন্ত নেননি।
এদিকে পদ্মা নদীর ভাঙনে বিস্তৃর্ণ এলাকার ফসলসহ জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় ওই এলাকার কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। চর দেলুনদী গ্রামের কৃষক আঃ ছালাম (৬০) জানান, নদী ভাঙনে তার ৮ বিঘা ফসলী জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। এ সময় তার পাশে থাকা নুর ইসলাম, সোহাগী বেগম, নুরজাহান বিবি সহ অনেকে বলেন, গত কয়েক দিনে চর বরাট, অন্তার মোড়, দেলুনদী, তেনাপচা, দেবগ্রাম সহ নদী পাড়ের জমিতে থাকা বিভিন্ন ধরনের ফসল নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তারা আরো জানায়, তারা প্রত্যেকেই ৩/৪ বার করে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছেন।
দেবগ্রাম ইউনিয়নটিকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষার দাবিতে গত মঙ্গলবার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী ১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী ও জেলা প্রশাসকের কাছে ইউপি চেয়ারম্যান আতর আলী সরদারের নেতৃত্বে স্মারকলিপি দিয়েছেন ইউনিয়ন বাসী।
দেবগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আতর আলী সরদার জানান, তার ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৫ নং ওয়ার্ডের শতশত পরিবার ভাঙন আতঙ্কে ভিটেমাটি ছাড়ছেন। এই কয়েক দিনে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার বসতবাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে অব্যাহত ভাবে ইউনিয়নটি নদী ভাঙনের শিকার হলেও এখন পর্যন্ত ভাঙ্গন রোধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি কর্র্তপক্ষ। এ ইউনিয়ন অর্ধেকের বেশী অংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বাকিটুকুও যাবার উপক্রম হয়েছে এখন। শত শত পরিবারের ঘর-বাড়ি ভাঙছে, তারা কোথায় যাবে। এখনই ভাঙ্গন রোধে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে গোয়ালন্দের মানচিত্র থেকে দেবগ্রাম নামের ইউনিয়নটি হারিয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবু নাসার উদ্দিন জানান, পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন সম্পর্কে ইতিমধ্যে প্রশাসন অবগত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে আজ (বুধবার) বিকেলে মাননীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী এমপি ও জেলা প্রশাসন মহোদয় ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করে ভাঙন প্রতিরোধে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষে দৃষ্টি আকর্ষন ও ক্ষতিগ্রস্থদের সহযোগিতায় সম্ভব সব রকম ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































