বাবাকে খুব মনে পরে: সালাম তাসির –
- Update Time : ০৭:৫৮:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২০
- / ৭৫ Time View
বাবা তুমি নেই তবুও তোমার সবুজ ছায়া এখনো মাথার উপর শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। সেই কৈশরে নীড়ে ফেরা পাখির মত তোমার ক্লান্ত দেহের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি নির্ভারতায়। তোমার নীতি আদর্শ মনে ধারণ করে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছি। এখনো তোমার ভাবনাগুলোকে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে দেখি সত্য, সুন্দর আর কল্যাণের পথেই তুমি হেঁটেছো জীবনভর। নৈতিকতা ও মানবিক গুণাবলির সমন্বয় ঘটিয়েছো অবলীলায়। বড়দের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করার মধ্যে কোন কার্পণ্য করো নাই কখনো। তুমি ন্যায় অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করে দিতে সহজেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তোমার দৃঢ় অবস্থান আমাকে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে সাহস জুগিয়েছে। অন্যের সম্পদ না বলে নেয়া অর্থ চুরি করা, আর চুরি করা মহাপাপ কথাটা তোমার মুখে বহুবার শুনেছি এবং এই সত্যটাক মননে ধারণ করেছি সেই শৈশব থেকেই।
আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। গ্রামের স্কুল থেকে ফেরার পথে বন্ধুরা মিলে রাস্তার পাশে থাকা প্রকাণ্ড এক আম গাছ থেকে ঢিল ছুড়ে একটা আম পেরেছিলাম। বাড়ী এনে বাড়ান্দায় রাখতেই বাবার তীর্যক দৃষ্টি গিয়ে পড়ে আমের উপর। আমার পা কাঁপছে মা চোখের ইশারায় আমাকে দ্রুত ঘরে যেতে বললো। বাবা উচ্চস্বরে মা’কে ডেকে জানতে চাইলো এই আম কোত্থেকে এনেছে কার গাছ থেকে পেড়েছে? ততক্ষনে আমি দরজার আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে বাবার কথা শোনার চেষ্টা করছি। বাবা মা’কে বলছে এই আম যে গাছ থেকে থেকেই আনুক না কেন এখনই সেই গাছের যে বোটায় ঝুলে ছিলো সেই বোঁটায় যেন লাগিয়ে রেখে আসে। বাবা ছিলেন কৃষক। কৃষকদের কষ্ট অনুপাতে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে মাঝে মাঝে তিনি নিজেকে চাষাভূষা বলতেন। বাবার রুদ্রমূর্তি দেখে সেদিন আমার মা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। যদি আমাকে একবার ধরে তাহলে রেহাই নেই। বাবা খুব নীতিবান ছিলেন আবার রাগীও। শুধু বাড়ীর মানুষ নয় গ্রামের অনেকেই তাকে সমীহ করে চলতেন। বাবা বাড়ীর বাইরে চলে গলে আমি দ্রুত আমটি নিয়ে সেই গাছের কাছে যাই কিন্তু বড় গাছে ওঠা সম্ভব ছিল না বলে গাছের গোড়ার একটা ডালে পাটের দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখে আসি। স্বাক্ষী হিসেবে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েছিলাম বাবা যদি সত্যতার প্রমাণ করতে বলেন।
বাবা নেই বহুদিন। বাবাকে খুব মনে পড়ে। ১৯৮৭ সালের ১৭ এপ্রিল আমদের ছেড়ে গেছেন। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। বাবা আছরের নামাজ পড়েন এবং জায়নামাজে বসা অবস্থায় স্ট্রোক করেন। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরন করেন। আমি তখন রাজশাহীতে। যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টেলিফোন ব্যবস্থাও সহজলভ্য ছিলো না। তাই আমাকে মৃত্যুর খবর জানানো সম্ভব হয়নি বিধায় আমার গ্রামের এক ছোট ভাই সুভাষ (রাবি’র ছাত্র) ও তখন বাড়িতে। সুভাষ রাতের ট্রেনে রাজশাহী রওয়ানা দিয়ে ভোরে পৌঁছায়। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করি তুমি এত সকালে কেন আসছো? সুভাষ আমাকে বাবার অসুস্থতার খবর জানায়। হাসপাতালে ভর্তি তাই এখনই বাড়ী যেতে হবে। এ কথা শুনে আমি শক্তিহীন হয়ে পড়ি কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে স্টেশনে আসি এবং ট্রেনে উঠি পোরাদহ স্টেশনে এসে অন্য ট্রেনে রাজবাড়ী এসে পৌঁছািই দুপুরে। ট্রেন থেকে নামতেই দেখি আমার ভাতিজা বাবলু দাঁড়িয়ে। রেলগেটে গিয়ে রিকসায় উঠলাম তিনজন হাসপাতালে যাবো কিন্তু বাবলু বললো দাদা এখন সুস্থ তাই বাড়ী নিয়ে গেছে। আমার সন্দেহ দানা বাঁধতে লাগলো তাহলে কি বাবা নেই? বাড়ীর পথ অনেকটাই হাঁটতে হতো। অনেক মানুষের সাথে রাস্তায় দেখা কেউ স্বাভাবিক ভাবে আগের মত কথা বললো না। একজনকে বলতে শুনলান আর কিছুক্ষণ দেরি করতে পারতো না? আমি শুনেছি তবে বোধগম্য হয়নি তখন। বাড়ী ঢুকতেই বড় ভাইয়ের মেয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বললো কাকা, দাদা নেই। আমি বাবার প্রাণহীন দেহ খুঁজতেই বড় ভাই বলছে আমার কথা কেউ শুনলো না। আমি জানতাম এমন একটা ঘটনা ঘটতে পারে।
আমি সেদিন বাবার কবর দেখেছিলাম বাবাকে দেখতে পারিনি। সেদিন শুক্রবার ছিলো আমি কখন বাড়ী পৌঁছাবো কেউ জানে না। তাই আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসী বাবাকে দাফন করে জুম্মার নামাজ পড়তে যাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন।
বাবাকে কবরে রেখে সবাই যখন মসজিদের পথে আমি তখন বাড়ী পৌঁছালাম। বাবাকে শেষ দেখা হয়নি আমার।
আমি এখনও বাবার আমৃত্যু লালন করা আদর্শের অনুসারী। বাবার সততা আর নিষ্ঠার কাছে অনেককেই হারতে দেখেছি। বাবার পড়ালেখা সার্টিফিকেট সর্বস্ব ছিল না। হয়তো প্রাথমিকেই আটকে গিয়েছিলো। তবে তার প্রজ্ঞালব্ধ জ্ঞান ছিলো ঈর্ষা করার মতো। আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ি বাবা আমার ইংরেজি উচ্চারণে ভুল শুধরে দিতেন। ১ লা জানুয়ারির উচ্চারণ পহেলা জানুয়ারি হবে এটা বাবার কাছেই শিখেছিলাম। তাঁর হাতের লেখা ছিলো দৃষ্টিনন্দন। এখনও অনেকেই প্রশংসা করেন।
বাবাকে লিখে কখনো শেষ করা যায় না। উপরে ভালো থেকো বাবা। দোয়া করি বেহেস্তের সবগুলো দরজা খোলা রবে তোমার জন্য।
লেখক- সালাম তাসির
কবি, গীতিকার,নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়



































































































