“বাংলার নারী আন্দোলন ও সুফিয়া কামাল” – লেখক : হুসনে নাহিদ প্রিয়া
- Update Time : ০৬:৩৩:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৩
- / ৭২ Time View

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
‘সুফিয়া কামাল’ এমন একটি নাম, যে নামটির কথা স্মরণ করতেই আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় এমন একটি মুখ ভেসে উঠে যিনি ছিলেন, একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগঠক, সমাজ সংস্কারক, মানবদরদী ও অকুতোভয় সংগ্রামী একজন নারী।
সুফিয়া কামালের জীবনের (১৯১১-১৯৯৯) দীর্ঘ ৮৮ বছর পর্যালোচনা করলে শত নারী আন্দোলনের ইতিহাস উম্মোচিত হয়। আঠারো শতক ছিলো নারী অবরোধের যুগ, উনিশ শতক ছিলো নারী জাগরণের যুগ, আর বিশ শতক হলো নারীর আতœপ্রতিষ্ঠার যুগ, উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে যে কয় জনমুষ্টিমেয় নারী সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী শিক্ষার প্রসার এবং ঘরে -বাইরে নারীর মুক্তির জন্য আন্দোলন – সংগ্রামে সক্রিয় ভ’মিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন অন্যতম। সমাজ সংস্কার, জনহিতকর কাজ, নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির লক্ষে নবাব ফয়জুন্নেসা যে আলোর মঙ্গল দ্বীপ জ্বালিয়েছিলেন সেই মঙ্গল দ্বীপ বহন করে সমাজকে এগিয়ে নিয়েছেন সুফিয়া কামাল। নারী সংগঠন, আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে, নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ ৭২ বৎসর সংগ্রাম করে নারী সমাজকে অবরোধ বাসিনী থেকে আলোক বর্তিকায় নিয়ে এসেছেন। নিজের লেখালেখি দিয়েও হয়েছেন নারীর প্রেরণাস্থল। নারী সমাজকে লেখালেখিতে উৎসাহিত করেছেন এই মহীয়সী নারী।
১৯৯১ সালের ২০ শে জুন বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদ পরগনার এক স¤্রান্ত জমিদার পরিবারে সুফিয়া কামালের জন্ম। তার বাবা সৈয়দ আব্দুলবারী এবং মাতা সৈয়দা সাবেরা খাতুন। কবির বাংলা শিক্ষার হাতে খড়ি মায়ের কাছে। জমিদার বাড়ীতে বাংলা ভাষাকে নীচু বর্গের ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু বিদ্রোহী, মুক্ত-চেতনার কবি সুফিয়া কামালকে তার মা-ই বাংলা ভাষা পড়িয়েছেন এবং ছেলেদের পোশাকপরিয়েকিছুদিনভাইদের সাথে স্কুলেপাঠিয়েছেন। তাদের বাড়িতে ছিলো বিশাল লাইব্রেরী। নানা ধরণেরপত্র-পত্রিকা আসতো বাড়ীতে। সেগুলো তিনি পড়তেন। এভাবেই তিনি স্বশিক্ষায়ি শক্ষিত হয়ে উঠলেন।
আঠারো ও উনিশ শতকের ইংরেজ শাসনের আধুনিকতার প্রভাবে ঐ সময় সমাজ, নারীর আতœসচেতনতা, মর্যাদাবোধ বিকশিত হতে থাকে। রাজা রাম মোহন রায়ের আন্দোলনে ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা বিলোপ আইন, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যা সাগরের ১৮৫৬ সালে হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন, ১৮৫৭ সালে বাংলার জেলায় জেলায় নারী শিক্ষালয় স্থাপনের কর্মসূচী, ১৯২৫ সালে মেয়েদের ভোটাধিকার আইন পাশ হয়। তারপর দীর্ঘ বিরতির পর কবি সুফিয়া কামালের হাত ধরে নারী জাগরণ ও নারী মুক্তির আন্দোলন শুরু হয়। ১৯২৩ সালে বেগম সুফিয়া কামালের স্বামীর কর্মস্থল কলকাতা হওয়ার সুবাদে তিনি স্থায়ী ভাবে কলকাতা বসবাস করা শুরু করেন। নিয়মিত সাহ্যিত চর্চা ও নানাবিধ সামাজিক কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত করলেন। বোরকা ওপর্দার আড়াল থেকে মুসলিম নারীদের বের করে আনার জন্য ১৯২৯ সালে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন “মহিলা সওগাত” পত্রিকা বের করেন এবং সেই পত্রিকায় প্রথম কোন নারীর লেখা ও ছবি ছাপা হয়। সেই নারী হলেন কবি সুফিয়া কামাল। ১৯২৩ সালে কলকাতা আসার পর সুফিয়া কামাল বেগম রোকেয়ার আঞ্জুমানে খাওয়াতে মহিলা সমিতির সদস্য হয়ে বস্তিতে কাজ করেছেন। একই সাথে বয়স্ক শিক্ষা কেন্দ্রে পাঠ দান ও শিশুশিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করেন। ঐ বছরই বেগম রোকেয়া মৃত্যুর পর রোকেয়ার রেখে যাওয়া কাজ গুলোতে নিজেকে সম্পূর্ন ভাবে নিয়োজিত করলেন। যুক্ত হলেন অলইন্ডিয়া উইমেন্স এসোসিয়েশনের সাথে । এই সময় তিনি অনেক নারী নেত্রীর সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সহিংসতা তাকে সামাজিক আরেক সামাজিক আন্দোলনের মুখোমুখি করে। কাজ করেন লেডি ব্রেবোন কলেজের আশ্রয় কেন্দ্রে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ঢাকায় উঠলেন সলিমুল্লাহ এতিম খানার অস্থায়ী আবাসে। নারী নেত্রী নীলা রায় বেগম সুফিয়া কামালকে মহিলা আতœরক্ষা সমিতির উদ্যোগে গঠিত সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ শান্তি কমিটির সাথে যুক্ত করেন। ১৯৪৮ সালে জুঁইফুল রায়, নিবেদিতা নাগ প্রমুখের সাথে গড়ে তোলেন পূর্ব পাকিস্থান মহিলা সমিতি। এর সভানেত্রীহন সুফিয়া কামাল। ১৯৫৩ সালে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনসংশোধনের দাবি নিয়ে সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় “পূর্ব পাকিস্থান মহিলা সংসদ”। ১৯৫৮ সালে মার্শলল’ জারি এবং ১৯৬১ সালের বীন্দ্র শতবর্ষ উদযাপনের আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সফল ভাবে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া ১৯৬৬ সালে ৬দফা এবং ১৯৬৯ এর গণঅভ’্যথানের আন্দোলন সংগ্রামে তিনি অগ্রনী ভ’মিকা পালন করেন। ১৭৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি সাহসীকতার সাথে প্রতিবাদী ভ’মিকা পালন করেন।
সুফিয়া কামাল ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে অগ্রগামী নারী সংগঠন “বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের” প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আজীবন এই পদে থেকে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। “নারী মুক্তির অর্থই মানব মুক্তি”-এই চেতনায় মানব মুক্তির ব্রত নিয়ে নারী সমাজকে সচেতন ও সংগঠিত করার কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বদা স্বোচ্চারছিলেন। নারী পুরুষের সমতাপূর্ণ মানবিক, অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দেশের সকল গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ছিলো তাঁর অগ্রনী ভ’মিকা। “মহিলা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করে সুফিয়া কামাল সারা দেশের নারীদের মানবতার মুক্তিতে একযোগে জাতি গঠনের কাজে এগিয়ে আসার আহŸান জানিয়েছেন। সুফিয়া কামালের গুণ এবং আদর্শের কথা বাংলার নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য এতো অল্প কথায় লিখে বা বলে শেষ করা যাবে না। বাংলাদেশের নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, হত্যা, নারীর প্রতিসহিংসতা ক্রমাগত ভাবে বেড়েই চলেছে। সুফিয়া কামালের আদর্শে দীক্ষিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। নারী – পুরুষের সমতাপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার এই লড়াই লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত চলবেই। পরিশেষে ২৪ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে নারী সমাজের বাতি ঘর এই মহা মানবীর প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা।
লেখক – হুসনে নাহিদ প্রিয়া,স্বাস্থ্য ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা।
Please Share This Post in Your Social Media
-
সর্বশেষ
-
পাঠক প্রিয়







































































































