বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি এখনো আগলে আছেন ভক্ত ওয়াজেদ মন্ডল

জাহাঙ্গীর হোসেন :

1

‘১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী ওয়াজেদ চৌধুরীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালাতে রাজবাড়ীতে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওয়াজেদ চৌধুরীর বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু ১০/১২ জন সঙ্গী নিয়ে আমার বাইসাইকেল চালিয়ে গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়িয়েছেন, ভোট চেয়েছেন। একদিন রাজবাড়ী জেলা সদরের বেলগাছি এলাকায় ওই বাইসাইকেলের চাকা পাংচার হয়ে যায়। তখন বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সঙ্গীরা পাশের জৌকুড়া এলাকার মোনাক্কা চেয়ারম্যানের বাড়িতে যান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রথম দেখাতেই সারা জীবনের মতো আমি তাঁর ভক্ত হয়ে যাই। ৫৮ বছর পর সেই প্রথম দেখার ঘটনা আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করছে। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত সেই বাইসাইকেলটিও রেখে দিয়েছি পরম যতেœ। আজ আমি জীবনের শেষ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। পরকালের ডাকের অপেক্ষা। আমার জীবনের শেষ চাওয়া সাইকেলটি জাদুঘরে পৌঁছে দেওয়া আর বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একটিবার সাক্ষাতের সুযোগ পাওয়া।’ কথা গুলো বলেন, রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামের ৭৯ বছর বয়স্ক আবদুল ওয়াজেদ মন্ডল।
তিনি আরো বলেন, ঘাতকরা ১৫ আগষ্ট আমার প্রিয় সেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। তারা কিভাবে ওই মানুষটিকে হত্যা করলো তা আজো আমি ভেবে পাই না। আমি চাই তার হত্যার সাথে জড়িত সকল ঘাতককে ফাঁসি দেয়া হোক। তিনি বলেন, ৬ মাস আগে শাররীক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এখন বেশ সুস্থ্য। তাই শুক্রবার তার বাড়ীতে ক্ষুদ্র ভাবে হলেও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হবে। তিনি এলাকার দরিদ্র মানুষের মধ্যে করবেন, খাবার বিতরণ।
মধুপুর গ্রামের একসময়ের অবস্থাপন্ন কৃষক উমেদ আলী মন্ডলের একমাত্র ছেলে ওয়াজেদ মন্ডলের সাংসারিক অবস্থা আজ ভালো নয়। এক বছর বয়সে মাতৃহারা হন। ১৯৬৫ সালে বিয়ে করেন জবেদা খাতুনকে। এই দম্পতির এক ছেলে ও তিন মেয়ে। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে ওয়াহিদুজ্জামান বকুল জায়গাজমি দেখেন। যেটুকু জমি আছে তা চাষাবাদ করে চলে তাঁদের সংসার।
তিনি বলেন, ‘মোনাক্কা চেয়ারম্যান ছিলেন আমার চাচাতো ভাই। আমি তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। বয়স ১৪ বছর। নতুন বাইসাইকেল কিনেছি। ইংল্যান্ডের ডানলপ কোম্পানীর বিএসএ মডেলের সাইকেলটি ২শত ২০ টাকায় ফরিদপুর শহরের সাইনোফোন নামের একটি দোকান থেকে কিনি। সেই সাইকেলে করে বাড়ি থেকে আমি মোনাক্কার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু মোনাক্কার বাড়িতে যাওয়ার পর তাঁর চোখ পড়ে উঠানে লিচুগাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা আমার সাইকেলটির ওপর।’ বঙ্গবন্ধু মোনাক্কার কাছে জানতে চাইলেন, সাইকেলটি কার? মোনাক্কার কাছ থেকে সাইকেলটি আমার জানতে পেরে বঙ্গবন্ধু আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোর সাইকেলটি কয়েক দিনের জন্য আমাকে দে। রাজবাড়ীর ওয়াজেদ চৌধুরীর বাড়িতে গিয়ে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত থাকবি। সেখানে তোর সাইকেল আমি ফেরত দেব।’ ‘কী আর করা, আমি রাজবাড়ীতে গিয়ে ওয়াজেদ চৌধুরীর বাড়িতে থাকতে শুরু করলাম। এর ১৫ দিন পর বঙ্গবন্ধু সাইকেল ফিরিয়ে দিয়ে কাছে টেনে বললেন, “ভালো থাকিস, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করিস। আর মানুষকে ভালোবাসতে শিখিস। পারলে রাজনীতি করিস। সেই থেকে আমি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত ও তাঁর রাজনীতির কর্মী বনে গেলাম।”
তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ধানমন্ডির বাড়িতে প্রথম দেখাতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে সেই সাইকেলটি কোথায় আছে জানতে চেয়েছিলেন। সাইকেলটি ফেরত না দিয়ে নিজের কাছে রাখার আবদার করলে হেসে তাঁকে অনুমতি দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মরে গেলে সাইকেলটি জাদুঘরে দিয়ে দিস।’ তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানান, রাজাকাররা তাঁর বাড়ি লুট করে তাঁকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। জবাবে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমার দেশকেও ওরা নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমার দেশও গরিব, তুইও গরিব। ভাবিস না, সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত সাইকেলটি দেখতে তার বাড়িতে প্রায়ই লোকজন আসেন। কেউ কেউ সাইকেলটি জড়িয়ে ধরে আবেগে কেঁদে ফেলেন। তা দেখে তার বুক গর্বে ভরে ওঠে। ভাবেন, সাইকেলটি এবার জাদুঘরে দিয়ে যেতে পারলে দায়িত্ব শেষ। আরেকটি ইচ্ছা বঙ্গবন্ধুকন্যার সাক্ষাৎ পাওয়া। তাঁর প্রত্যাশা, শেষ ইচ্ছা দুটি পূরণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সাড়া দেবেন।

(Visited 103 times, 1 visits today)