বস্তির বাসিন্দা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্বপ্না জিপিএ-৫ পেয়েছে

জাহাঙ্গীর হোসেন :

Rajbari- (3)- 13.08.2014

প্রতিবন্ধী বাবার পাপড় বিক্রির সামান্য আয়ে খেয়ে না খেয়ে চলে সাত জনের সংসার। এর ওপর রয়েছে পড়াশোনা, জামাকাপড়সহ অন্যান্য খরচ। পদে পদে প্রতিবন্ধকতা। সব মিলিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্বপ্না আক্তার স্বপ্নচারী। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তার কার্পণ্য ছিল না। ফলে কোনো বাধা আর শেষ পর্যন্ত বাধা থাকেনি। আটকাতে পারেনি এই মেধাবীকে।
জন্মান্ধ স্বপ্না আক্তার রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে। এখন তার একটাই স্বপ্ন- ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে বড় সরকারি কর্মকর্তা হওয়া।
গত বুধবার কলেজ প্রাঙ্গণে কথা হলো স্বপ্নার সঙ্গে। বাড়ি জেলা শহরের বিনোদপুর এলাকার রেলওয়ে কলোনির বস্তিতে। জন্ম থেকেই অন্ধ। তারা তিন বোন ও এক ভাই। ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড় সে। প্রতিবন্ধী বাবা আকুব্বর মোল্লা পাপড় ভাজা বিক্রেতা। মা রোকেয়া বেগম গৃহিণী। মেজ বোন রতœা আক্তার ঢাকায় গৃহপরিচারিকার কাজ করে। ভাই লুৎফর রহমান মোল্লা ও ছোট বোন মরিয়ম আক্তার স্কুলে পড়ে। পরিবারে চরম দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী।
স্বপ্না জানায়, ছেলেবেলায় তার দেখা হয় রাজবাড়ী জেলা শহরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলের প্রধান শিক্ষক বোরহান উদ্দিন হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি তাকে মেয়ের মতো কাছে টেনে নেন। তাঁর সহযোগিতায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে স্বপ্না ভর্তি হয় জেলা শহরের ইয়াছিন উচ্চ বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয় থেকে সে ‘এ’ গ্রেডে এসএসসি পাস করে। এরপর মানবিক বিভাগে ভর্তি হয় রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজে। এ কলেজ থেকেই এবার এইচএচসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে স্বপ্না জিপিএ ৫ পাওয়ার কৃতিত্ব দেখাল।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই মেধাবী বলে, ‘আমাকে ব্রেইল পদ্ধতির বই পড়তে হয়। এসব বই সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল ব্যাপার। এইচএসসির বই সংগ্রহ করতে আমার খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার টাকা। আগামীতে অনার্সে ভর্তি হলে উপায় কী হবে- তা ভেবে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। তবে আল্লাহ সহায় হলে এ বাধা আমি ডিঙিয়ে যাবে। লেখাপড়া শেষ করে আমি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। আমার একটাই স্বপ্ন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করে বড় সরকারি কর্মকর্তা হওয়া। তাহলেই সম্ভব হবে বস্তি থেকে পরিবার তুলে এনে নির্দিষ্ট কোথাও মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেওয়া।’
শিক্ষক বোরহান উদ্দিন হাওলাদারের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্না বলেন, ‘স্বপ্না আমার পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠেছে। আমার স্বামী ওকে নিজের মেয়ের মতো কাছে টেনে নিয়ে লেখাপড়া শিখিয়ে আসছেন। ওর অর্থের অভাব দূর করতে নানা চেষ্টাও করেছেন। যে কারণে সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সমাজের নানা মানুষের সহযোগিতা পেয়ে স্বপ্না আজ অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারছে।’
সহপাঠী রিমা রানী হালদার বলে, ‘স্বপ্না নিয়মিত ক্লাস করত। ক্লাসের সবাই ওকে ভালবাসত। অত্যন্ত মেধাবী হওয়ায় শিক্ষকরাও ওর প্রতি আলাদা দৃষ্টি দিতেন।’
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাকসুদুর রহমান খান বলেন, ‘স্বপ্না এই কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হওয়ার পর আমরা দেখতে পাই যে মেয়েটির লেখাপড়ায় ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। যে কারণে শুরু থেকেই শিক্ষকরা ওর পাশে দাঁড়ান। ওর যাতায়াতের ব্যয় বহন করার পাশাপাশি উপবৃত্তি প্রদান এবং বই কেনার জন্যও সহযোগিতা করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা ইউনির্ভাসিটিতে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ওর। আমরাও চাই সে সফল হোক। তবে ওর জন্য এই কলেজের দরজা সব সময় খোলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে সে এখানে পড়ার সুযোগ পাবে।’
এদিকে, গত বুধবার এইচএসসির ফল প্রকাশের পর স্বপ্নাকে কাছে ডেকে নেন রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম খান। তিনি তাৎক্ষণিক ১০ হাজার টাকা প্রদান করাসহ ওর পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

(Visited 38 times, 1 visits today)