কবি নেহাল আহমেদের ছোট গল্প “বিভ্রান্ত”

কবি নেহাল আহমেদ

কবি নেহাল আহমেদ

প্রথম প্রথম অফিসে এসে মন বসত না, এখন মোটামুটি ভালই লাগে, কাজ শেষ হওয়ার পরও অনেকক্ষণ অফিসে বসে থাকি। বন্ধু-বান্ধব বলতে যা বোঝায় তা এখনও হয়ে ওঠেনি। আস্তে আস্তে পরিবর্তন হচ্ছে শহরটা। কোনো মহল্লা শহর পরিবর্তন হলে চোখে পড়ে। এ শহরটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন মোটামুটি। এখানকার লোকজনও ভাল। প্রকৃতি এদের দান করেছে উদারতা। সহজেই সবাইকে আপন করে নেয়। বিশেষ একটা কাজের জন্য এখানে আসা। তার প্রায় কিছু করতে পারি নাই। আশ্চর্য লোকটার সঙ্গে যতবার ভাব জমাতে চেষ্টা করেছি, প্রত্যেকবার কেমন যেন সুক্ষèভাবে এড়িয়ে গেছেন। একই অফিসে চাকরী করি, পরিষ্কার পরিপাটি পোাশাক পরিচ্ছদ। সুদর্শন ভদ্রলোক। সবসময় কেমন যেন ঘোরের মধ্যে থাকেন। হঠাৎ করেই সুযোগটা এসে গেল। অফিস ছুটির কিছুক্ষণ আগে ভদ্রলোক রুমে এলেন। বিনয়ের সঙ্গে বসতে বললাম। দুটো কফির অর্ডার দিয়ে বললাম ! কি সৌভাগ্য অলোক বাবু আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।
ঃ কিছু মনে করবেন না জয়ন্ত দা। আপনার সঙ্গে অবিচার করা হয়েছে। ঠিকভাবে খোঁজ খরব নিতে পারিনি। আসলে আপনার সম্পর্কে ভাল করে কিছুই জানি না।
ঃ আরে না- না। আমরা সকলে এত ব্যস্ত যে …
ঃ ঠিক তাও না, আমার ব্যক্তিগত সমস্যা আছে। চাকরিটা ছেড়েই দিতাম। কিন্তু নিঃঙ্গতা পেয়ে বসতে পারে সেই ভয়েই ছাড়ছি না।
ঃ অলোক দা, যদি কিছু মনে না করেন, আমার সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। সমস্যা একা বয়ে বেড়ানো খুব কষ্ট।
ঃ ঠিক কিভাবে বলব, বুঝতে পারছি না। বিয়ে করেছি উনিশ বছর। আঠারো বছরের এক সন্তান। খুবই ব্রিলিয়ান্ট, চমৎকার দেখতে। সমস্যা হচ্ছে আমার স্ত্রীকে নিয়ে।
ঃ কি রকম সমস্যা !
বিয়ে করার পর দেখছি। দারুন হাসিখুশি, ঝটপট, স্মার্ট শিক্ষিত সুন্দরী মেয়ে। কয়েক বছর পর থেকেই কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ছেলের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবে।
ঃ বলেণ কি ! ডাক্তার দেখান নি।
ঃ হ্যাঁ, তা তো দেখিয়েছি। এটা একটা মানসিক রোগ, মাঝখানেই ভালোই ছিল। কিন্তু দু বছর হলো মনে হয় অতীতের কোন স্মৃতি কিংবা কোন ঘটনা বয়ে বেড়াচ্ছে।
ঃ আপনার সঙ্গে শেয়ার করে না ?
ঃ না, খুব শক্ত মেয়ে। তাছাড়া সুন্দরী মেয়ের দু’একটা সম্পর্ক থাকতেই পারে। সেটা আমি স্বাভাবিক ভাবেই নেতাম। ওর সব বন্ধুদের তো আমি চিনি। আমার মনে হয়নি তেমন কোন জটিল সমস্যা আছে।
ঃ কোথাও বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেন। চেঞ্জ অনেকটা কজে আসে।
ঃ সেই রকম ভাবছিলাম। কিন্তু অফিস থেকে অর্ডার এসেছে ঢাকায় যেতে হবে কিছুদিনের জন্য।
ঃ সঙ্গে ওকে নিয়ে যেতে পারেন।
ঃ তা সম্ভব না, আমাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হবে। তাছাড়া ছেলের ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
অফিসের কাজটা খুব জরুরী ?
ঃ হ্যাঁ। প্রজেক্ট ইনট্রাকশন না করলে অনেকের খুব অসুবিধা হয়ে যাবে।
ঃ তা হলে তো সত্যিই খুব সমস্যা।
ঃ জয়ন্ত বাবু একটা কথা বলি, প্রথম থেকেই আপনাকে খুব ফ্রেন্ডলি মনে হয়েছে। আমার অবর্তমানে আপনি যদি ওদের একটু ‘টেক কেয়ার’ করেন। তাহলে ঘুরে আসতে পারি। আছাড়া আমার একটা বোন থাকে, এর মধ্যে হয়ত ও এসে যাবে।
ঃ কি বলেন অলোক দা। এতো আমার সৌভাগ্য। তাছাড়া একজনের অসুবিধায় আরেক জন না এগুলে কিসের সহমর্মী, সহকর্মী। প্লিজ আমাকে লজ্জা দিবেন না।
ঃ না তা বলছি না। ওরা যদি অসুবিধায় পড়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে দিব। থ্যাংকস্ জয়ন্ত বাবু।
প্রথম দু’দিন খুব অস্থিরতার মধ্যে কাটল। এই প্রথম যোগাযোগের একটা সুযোগ এলো। কিন্তু কি করে যাই। অলোক দা বাড়িতে নেই। তাছাড়া জয়িতা কি আমাকে মিনে নিতে পারবে। বিয়ের পর খুব একটা যোগাযোগ নেই। দীর্ঘদিন আমার বাইরে থাকার ফলে সেটা আরও স্থায়ী হয়েছে। এত জেদী মেয়ে আমারও সাহস হয়নি দেখা করতে। তাছাড়া কি করে ওর সামনে দাঁড়াব। বিয়ের পর জয়িতা একবারই আমার বাসায় আসে। কি করে যে কি হয়ে গেল …। কিন্তু এটা স্পষ্ট মনে হচ্ছে জয়িতাই জোর করে আমাকে ইমপ্রেস করে। ও যখন চলে যায় তখন ওর চোখমুখে ক্রুর হাসি। শরিরটা ঠিক করতে করতে বলল প্রতিশোধ নিলাম। আমি তো হতভম্ব ! বললাম এটা কেমন প্রতিশোধ হলো। নিজে এসে আতœসমর্র্পণ করলি, আবার বলছিস প্রতিশোধ !
ঃ হ্যাঁ প্রতিশোধ, তুৃই আমাকে যথেষ্ট অবহেলা করিস। তোর উপর জিদ করেই বিয়ে করলাম অলোককে।
ঃ কিন্তু আজকে যা হয়ে গেল এটা তোর প্ল্যান করা। অলোককে কেন ঠকাচ্ছিস ?
ঃ এছাড়া কোন উপায় জানা নাই। তোকে আমি এক মুহূর্তও শান্তি দিব না। আমার গর্ভে বেড়ে উঠবে তোরসন্তান কিন্কু তুই কোনোদিন পিতৃত্ব দাবী করতে পারবি না।
ঃ জয়িতা এটা তুই কি করলি। এতে তো হিতে বিপরীতে হতে পারে।
ঃ তা পারে কিন্তু বাজি ধরতে গেলে জীবন দিয়েই ধরতে হয়। জয়িতার চোখমুখে বিজয়ের উল্লাস। আমাকে আর কিছু বলতে দিল না। বেরিয়ে গেল বিজয়িনীর বেশে। এ যেন নতুন এক জয়িতা। অন্য দেবী। অনাবিস্কৃত। তারপর থেকে আর কোন যোগাযোগ নাই। ইতোমধ্যে আমি দেশের বাইরে চলে যাই। ইচ্ছা ছিল আর ফিরব না কোনোদিন। কিন্তু পারি নাই। ওখান থেকে অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঠিকানা খুজে পাইনি। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরে এসে অনেক কষ্টে ঠিকানা খুঁজে পাই। বলা দরকার এটা আমার বন্ধুর একটা প্রজেক্ট। বন্ধুর সহযোগিতায় আমার এখানে চাকরির নাম করে আসা। আমার আশা যখন আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসছি তখনই সুযোগটা এলো।
কিন্তু কী করে দেখা করি। বুঝতে পারছি ভেতরে আস্তে আস্তে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছি। জয়িতার এটা এমন একটা খেলা যার শুরু আছে শেষ নেই। পরের দিন সকালে অফিসে এসে দেখি সতের-আঠারো বছরের একটি ছেলে ওয়েটিংরুমে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। দারুণ দেখতে, চোখে মুখে দারুন সাম্প্রতিক আতœবিশ্বাস। আমাকে দেখতে পেয়ে নমষ্কার জানাল দু’হাত এক করে। আমি চমকে উঠলাম কোন রকমে নিজেকে সামলিয়ে বললাম, ’তুমি অলোকদার ছেলে ?’
ঃ হ্যাঁ, বাবা ঢাকা যাওযার আগে আপনার কথা আমাকে বলেছে। মা খুব অসুস্থ আর আপনাকে রিবক্ত করছি করছি বলে খারাপও লাগছে।
বুকের বা পাশটা একটু ব্যাথা করে উঠল। প্রচুর সময় নিয়ে গ্লাসে রাখা জলটুকু খেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম। এক্ষুণি যেতে হবে। উত্তরে হ্যাঁ বলল। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়ে বেরিয়ে পালঅম। গাড়িটার কাছে পৌঁছতে যেন একটু সময় বেশি লাগল। দু’জন গাড়িতে উঠে বসলাম; তুমি রাস্তাটা বলে দিও। ছেলেটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম কিছু বলবে। না, টিক আছে হেসে উত্তর দিল। আরে অদ্ভুত তো হাসলে দেখি জয়িতার মতো ওর গালটায় টোল পড়ে। তুমি হাসছ কেন আবার জিজ্ঞাসা করলাম, আঙ্কেল হয়ত খেয়াল করেনি, তোমার সঙ্গে আমার অ™ু¢ত একটা মিল আছে কি বলত ?
ঃ কী মিল তুমিই বল।
ঃ আমাদের দু’জনের বিউটি টিট।
ঃ আরে সত্যি তো, তোমার দেখি তোমার মা’র মতো হাসলে গালে টোল পড়ে।
ঃ আরে না, মেন হলো। সত্যি তোমার মায়ের গালে বুঝি টোল পড়ে।
ইতোমধ্যে ফাঁকা রাস্তার মধ্যে চলে এসেছি, কথাটা হঠাৎ মুখ ফসকে রেবিয়ে গেছে। ওর সামনে সাবধানে কথা বলতে হবে। খুব বুদ্ধিমান ছেলে, মাথাটা কেমন যেন জ্যাম হয়ে আসছে, সেই সব দিনের কথা খুব মনে পড়ছে। একবার জয়িতা আর আমি। না খুব দ্রুত চালানো হচ্ছে কি নামে তোমার। মৈত্রী, আঙ্কেল একটু সাবধানে চালাও। হঠাৎ হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।। সামনে অন্ধকার দেখছি। একি জয়িতা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কি করছে। খুব ঘুম পাচ্ছে, ঘুম-স্বপ্ন, সামনে কি অনন্ত সুখের দরজা। ভেতরে হাসিমুখে কে দাঁড়িয়ে। জয়িতা, ওর সিঁথিতে সিঁদুর কেন। কিছুই মনে পড়ছে না। স্বপ্ন ঘুম-ঘুম। দরজা-জয়িতা, সিঁদুর, ঘুম-ঘুম…।

(Visited 60 times, 1 visits today)