হিন্দী সিরিয়ালের ভিরে হারিয়ে যাচ্ছে রাজবাড়ী জেলার সিনেমা হলগুলো ॥ ব্যবসায়ীরা হতাশ

কাজী তানভীর মাহমুদ :

রাজবাড়ী জেলা শহরের ঐতিয্যবাহী বসুন্ধারা সিনেমা হল  ছবি-রাজবাড়ী বার্তা

রাজবাড়ী জেলা শহরের ঐতিয্যবাহী বসুন্ধারা সিনেমা হল।  ছবি-রাজবাড়ী বার্তা

আধুনিক যুগে মানুষের জীবনে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে সিনেমা’র ভুমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পূর্ববতী ও পরবর্তী সময়ে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের বিনোদনের প্রধান বিষয় ছিলো সিনেমা। বড় পর্দায় সিনেমা দেখার জন্য সৃষ্টি হয়েছিলো সিনেমা হল। স্বাধীনতার পরে দেশের মানুষের বিনোদন যোগাতে এ দেশে নির্মিত হয় অসংখ্য সিনেমা হল।

যুগের পরিবর্তনে অবাধ আকাশ বার্তা (ডিশ এন্টেনা), ভালো গল্পের ছবি, ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রির অধুনিকায়ন না হওয়া, উন্নত কারিগরি দক্ষতার অভাব ও বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত এর হিন্দী সিরিয়ালের করাল গ্রাশে মুখ থুবড়ে পড়েছে বর্তমানের বাণিজ্যিক সিনেমা হল গুলো। ঘরে ঘরে রঙ্গিন টেলিভিশন ও পশ্চিমা সংস্কৃতির রঙ্গিন আলোর ঝলকানিতে সাধারন দর্শক এখন আর অন্ধকার হলের বড় পর্দায় ছবি দেখতে আগ্রহী নন।

নদীতে পানি না থাকলে যেমন হয় শুধু ধূ ধু বালুচর। হল গুলোর অবস্থা এখন ঠিক তেমনি। এমন মরা পদ্মার মত অবস্থা রাজবাড়ী জেলার হল মালিকদের প্রধান রুটি রুজির কারবার সিনেমা হল গুলোর। সাধনা, চিত্রা, বসুন্ধরা, বৈশাখী, মধুমতি, আনারকলি, মোনালিসা, গোধূলি, মুন, মোনারোমা, তাজ, চন্দনা, নূপুর, ললিতা, লাবণী, অনিক, মমতাজসহ রাজবাড়ীতে স্বাধীনতার পরে সগৌরবে চলতো ১৯ টি দর্শকপূর্ণ সিনেমা হল।

বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার ৫ টি উপজেলায় ১৯ টি সিনেমা হলের মধ্যে ৩ টি চালু রয়েছে।

সদরে সাধনা সিনেমা হলে চলছে নায়ক অনন্ত জলিল ও নায়িকা বর্ষার ঈদের নতুন সিনেমা মোষ্ট ওয়েলকাম টু ও বসুন্ধরা সিনেমা হলে চলছে রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া নায়ক সাকিব খান ও নায়িকা অপু বিশ্বাস জুটির হিরো দ্যা সুপার স্টার ।পাশাপাশি জেলার নব গঠিত কালুখালী উপজেলায় বৈশাখী সিনেমা হলে চলছে নায়ক বাপ্পি ও নায়িকা ববি অভিনীত ছবি আই ডন্ট কেয়ার।

এছাড়া জেলা সদরের চিত্রা, গোয়ালন্দ মোড়ের মোনালিসা, গোধূলী, মুন, দৌলতদিয়া ঘাটের মোনারোমা, বালিয়াকান্দি উপজেলার মধুমতি, বহরপুরের ললিতা, লাবনী, মৃগী ইউনিয়নের আনারকলি, পাংশা উপজেলার তাজ, চন্দনা, নূপুর সিনেমা হল গুলো দর্শকের অভাবে এবং লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে।

জেলার মধ্যে উন্নত ও ভালো পরিবেশ সমৃদ্ধ শহরের সাধনা সিনেমা হলের মালিক পৌর মেয়র মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া জানান, গত ঈদের তুলনায় এবার অর্ধেক টিকিটও বিক্রি হয়নি। গত ঈদে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযেজনার ছবি ‘‘ভালোবাসা আজকাল’’ সিনেমা চালিয়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিলাম। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সিনেমা হল ব্যাবসা খুব ব্যাবসা সফল ছিলো।কিন্তু বাংলাদেশের ১-১১ এর সময়ের পর থেকে আর সিনেমা হলের কোন লাভ জনক ব্যাবসা নেই। বছরের ২ টি ঈদে কোনো রকম চলে।ঈদে ঢাকা থেকে গ্রাম গঞ্জের কিছু শ্রমিক ছুটিতে বাড়িতে আসে।মূলত তারাই বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঈদের সময়ে সিনেমা হলে আসে। তাছারা কিছু স্কুল-কলেজের টিন এজের ছেলে-মেয়েরা সিনেমা দেখতে আসে।

তিনি আরও জানান, যুগের পরিবর্তনে অবাধ আকাশ বার্তা (ডিশ এন্টেনা),ভালো গল্পের ছবির অভাব, ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রির অধুনিকায়ন না হওয়া ও বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত দেশের হিন্দী সিরিয়ালের প্রতি এখন মানুষ আসক্ত।এসবের করাল গ্রামে মুখ থুবরে পড়েছে বর্তমানের বাণিজ্যিক সিনেমা হল গুলো।ঘরে ঘরে রঙ্গিণ টেলিভিশন ও মোবাইলে ইন্টারনেটের কারনে বড় পর্দায় ছবি দেখতে দর্শকরা এখন আর হলে আসেনা।

সাধারন মানুষ এখন চায়ের দোকানে বসে সিনেমা দেখে।তাছারা ঈদে প্রতিটি টিভি চ্যানেলে একাধিক সিনেমা প্রচার করে।তাই হলে দর্শকের আগমন কম।সিনেমা তো এখন সবার হাতের মুঠোয়।

ভালো গল্প,নতুন মুখ,নায়ক-নায়িকার পরিবর্তন,ভালো ষ্পটে সুটিং করলে দেশের সিনেমা গুলো আরো দর্মক প্রিয় হত।পাশাপাশি হিন্দী সিরিয়াল বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।আমাবর্ষা যেমন চাঁদকে খেয়ে ফেলে তেমনি হিন্দী সিরিয়াল গুলো দিনে দিনে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিকে খেয়ে ফেলছে।

সাধনা সিনেমা হলের ম্যানেজার শহিদুর রহমান (৫৫) জানান,তিনি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে সিনেমা হল ব্যাবসায়ের সাথে জরিত। জীবনে বেশি সময়টাই দিয়ে দিয়েছেন সিনেমা জগত কে।অতীত সর¥ণ করতে গিয়ে তিনি বলেন ১৯৭৩ সালের দিকে কথা দিলাম, বধূ বিদায়, ময়না মতি, পুত্রবধূ, অ-শিক্ষিত, ভাত দে সিনেমা গুলো ছিলো পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসাথে দেখার মত ছবি। তখন এত টিভি ছিলোনা। তখন সবাই হলে এসে ছবি দেখতো।ব্যাবসাও ভালো ছিলো।

হঠাৎ করে ২০০০ সালের দিকে বাংলা ছবির জগতে অশ্লীল নামের এক ভয়ংকর অধ্যায় আসে। ফায়ার, মাডার, নুরা পাগলা, কুবা সামসু, দুধর্ষ কোপা, নিষিদ্ধ নারী, ভয়ংকর, সিটি টেরর, নগ্ন হামলার মত খারাপ সিনেমার কারনে দেশের সিনেমা জগত প্রায় ধংস্বের মুখে চলে গিয়েছিলো।

বর্তমানে এখন ভালো ছবি হচ্ছে। তবে এখনও তেমন দর্শক সাড়া নেই।

বসুন্ধরা সিনেমা হলে হিরো দ্যা সুপার স্টার সিনোমা দেখতে আসা ঢাকার মেকানিক সোবাহান জানান, ঈদের ছুটিতে রাজবাড়ী দেশের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। সে নায়ক সাকিব খানের একজন ভক্ত তাই বন্ধুদের সাথে হলে সিনেমা দেখতে এসেছে। সিনেমা টি তার অনেক ভালো লেগেছে।

(Visited 319 times, 1 visits today)