কমরেড মতিউল ইসলাম লাল সালাম ‘বীর শহীদের জীবন কাব্য’

এ্যাডঃ লিয়াকত আলী বাবু :

I6500144

স্বাধীনতা’র সবে মাত্র এক বছর পার হয়েছে। নতুন উদ্দীপনায় জাগ্রত দেশের মানুষ। চারিদিকে বিজয়ের নিরন্তর আকন্ঠ উদ্দীপনা। বাংলার পথে-প্রান্তরে তখনও শহীদ বীর মুক্তি যোদ্ধাদের রক্তের আল্পনায় আঁকা বাংলার মানচিত্রের মাঝে নতুন সূর্য উদয়ের রক্তিম ছবি যেন স্বাধীনতার প্রজ্বলিত শিখা অনির্বাণ। তারই মাঝে ঘটে যায় এক নির্মম লোমহর্ষক ঘটনা। ১লা জানুয়ারী ১৯৭৩ সাল। সেদিন ভিয়েতনাম সরকারের সাথে সংহতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রউনিয়নের একটি মিছিল বের হয়। ঘটনাটা ঘটে যায় ঐ মিছিলের মুখে।
সাবেক ফরিদপুর বর্তমান রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার বাহাদুরপুর গ্রাম। বাহাদুরপুর নামের সেই বীর বাহাদুরদের অহংকারী গ্রামের একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারে এক বীর বাহাদুরের জন্ম হয়েছিল। যার নাম রাখা হয়েছিল ‘মতিউল ইসলাম’। ১৯৭১ সালে মতিউল ইসলাম সবে মাত্র দুরন্ত যৌবনে পা’রাখা এক টগবগে তরুণ যুবক। বাবা ছিলেন এ অঞ্চলের তুখোর এক প্রতিবাদী রাজনীতিবিদ। নাম মোসলেমউদ্দিন মৃধা। মোসলেমউদ্দিন মৃধা তখন রাজবাড়ীর তথা সাবেক ফরিদপুর জেলার পশ্চিমাঞ্চলের আওয়ামী লীগের একজন শক্তিশালী নেতা। আওয়ামী লীগের পক্ষে পাকিস্তান গণপরিষদের একজন নির্বাচিত সদস্য। আওয়ামী লীগের সেই তুখোর নেতা মোসলেমউদ্দিন মৃধার সন্তান মতিউল ইসলাম। মতিউল ইসলাম ছোট বেলা থেকেই কোন এক সাম্যবাদের বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যাবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন। যৌবনের শুরুতেই দেশ মাতৃকার স্বাধীকার আদায়ে সন্মুখ সাগর সমরে ঝাপিয়ে পরেছিল অকুতোভয় এক মুক্তি সেনার বেশে। যুদ্ধ দিয়েই যেন তার জীবনের জয় যাত্রা শুরু। এরপর যুদ্ধ জয়ে লাল সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে বীরের বেশে ফিরে আসে মাতৃ গৃহে। কিন্ত মনের অতল গহীনে তখনও সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার অপুর্ণ আকাঙ্খা’র দোলাচল যেন অনুক্ষন অনলদ্রোহে অনুরিত হতে থাকে। দেশ মুক্তির বছরেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পন। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পন মানেই স্বপ্নের লক্ষ্যে পৌঁছানোর সোনালী সোপানে পা’রেখে দূর্জেয় লক্ষ্যে পেঁছানোর শুভযাত্রা’র সুচনা করা। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের ঊর্বষী আলোর জ্বলন্ত প্রদীপ যেন লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়ার দীপ্যমান আলোক বর্তিকা। প্রগতিমুখী ছাত্র ছাত্রীরা তখন দলে দলে জড়ো হচ্ছিল ছাত্র ইউনিয়নের বিজয়ী পতাকা তলে। ছাত্র ইউনিয়নের তুখোর ছাত্র নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম তখন ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি। সমাজতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার উজান পালে তখন বিপ্ল¬বের প্রবল ঝড়ো বাতাস লাগতে শুরু করেছিল। আর বিপ্লবের সেই ঝড়ো হাওয়ায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল সমাজতন্ত্রের দু’ঘোন্টি পালের বিজয়ের সফল তরী। ঐ ঝড় বুর্জোয়াদের নজরে পরে যায়। আর তখনই বুর্জোয়া রাজনীতিকদের মাথা ঘুরে উঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোর বিরোধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন ভিয়েতনামে বর্বর নগ্ন হামলা চালাচ্ছিল। তারা লক্ষ লক্ষ ভিয়েতনামীদের তাজা তপ্ত রক্তে হাত রাঙাচ্ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন অহংকারে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর। কিন্তু এ দিকে নতুন স্বাধীনতার আলোকবর্তিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উজান পালে উছ্লে উঠা ঝড়ো বিপ্ল¬বের সামাজতান্ত্রিক বিজয় তরী এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ঘামিয়ে তুলতে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম হারাম হয়ে যায়। আর সে কারণেই সামাজতান্ত্রিক বিপ্ল¬ব রুখে দেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি তথ্য কেন্দ্র স্থাপন করে। কেন এই স্বাধীন দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য কেন্দ্র স্থাপন হল ? ছাত্র ইউনিয়নের দুরদর্শী নেতারা বুঝে ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আসল উদ্দেশ্য। প্রতিবাদী হয়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের সকল নেতা কর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিসের তথ্য কেন্দ্র করা হয়েছে ? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত তথ্য কেন্দ্র স্থাপন মানেই এ দেশের স্বপ্নের স্বাধীনতার উপর কালির আঁচর লেপে দেওয়ার সামিল। শুরু হয়ে যায় মার্কিন সম্রাজ্যবাদ বিরোধী মিছিল মিটিং। মার্কিন সম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুহুর্মুহু শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশ বাতাস। মার্কিন সম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী দোসরদেরও প্রতিবাদের ঝড় দেখে সহসাই টনক নড়ে উঠে। তাঁরাও প্রমাদ গুনতে থাকে। ঐ প্রতিবাদী ঝড়কে যে কোন মুল্যে থামিয়ে দেওয়ার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠে মার্কিন সম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারীরা। মার্কিন সম্রাজ্যবাদীরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ষ্পষ্ট বিরোধীতাকারী হলেও ক্ষমতার সিংহাসনে পাকাপোক্ত ভাবে টিকে থাকার জন্য মার্কিন সম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন থামাতে বাংলাদেশের সরকারও সেদিন মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যদি প্রশ্ন রাখা হয় কেন ? উত্তর হবে রাজনৈতিক কারনে। সর্ব প্রথম এ পৃথিবীতে মানুষ নাকি আসতে না’রাজ ছিল। এ পৃথিবীতে না আসার জন্য মানুষ স্রষ্টার কাছে ক্ষমা চেয়ে সে কি আকুতি মিনতি। কিন্ত পৃথিবীতে আসার পর পরই মানুষ অমরত্ব পাওয়ার জন্য হেন কাজ নাই যা সে করতে চায় নাই। ঠিক ক্ষমতায় আসার জন্য এবং চিরকাল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মানুষ সেই একই কাজ করতে থাকে। মানুষ বলে আমি ক্ষমতা চাই না। আমি চাই মানুষের মুক্তি, আমি চাই মানুষের শান্তি। কিন্ত মানুষ ক্ষমতার মসনদে বসার পর পরই সেই বিশ্বাসী চোখ সহসাই উল্টিয়ে ফেলে। তখন সে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য অমরত্বের বর খুঁজতে থাকে। চিরদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার কোথায় পাওয়া যায় সেই অমরত্বের অমৃত ফল ? ক্ষমতার অমরত্বের জন্য যদি লক্ষ মানুষের জীবন নিয়ে নিতে হয় তাতোও কোন পরোয়া নেই। তবু আজীবন ক্ষমতায় টিকে থাকতেই হবে। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান রচিত এবং কার্যকর হয়। আর সেই স্বাধীন দেশের প্রবিত্র সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে বর্নিত আইনানুগ অধিকারের আলোকে জনসভা, সমাবেশ বা শোভাযাত্রার যে সাংবিধানিক অধিকার দেওয়া হয়েছিল সেই অধিকার বলেই সেদিন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন একটি সাধারন সমাবেশ এবং শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিল। শোভাযাত্রাটি ছিল আইনের আঁওতায়। ১৯৭৩ সালের ১লা জানুয়ারী। স্বাধীনতার মাত্র এক বছর ১৫ দিন অতিবাহিত হয়েছে মাত্র। সেদিনটাও ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আরেকটি সোনালী সকাল। সেদিন সকালেও স্বাধীনতার এক নতুন সূর্য উঠেছিল। বাংলার স্বাধীনতা বিরোধী মার্কিন সম্রাজ্যবাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে তথ্য কেন্দ্র স্থাপন করেছিল এবং তারই পাশাপাশি ভিয়েতনামে যে অমানবিক নগ্ন হামলা চালানো হচ্ছিল তারই প্রতিবাদে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা প্রেস ক্লাবের সামনে সববেত হয়। এ কথা শতত সত্য যে সেটা ছিল এক শান্তিপুর্ন সমাবেশ। এর পর ঢাকা প্রেস ক্লাব থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সেই শান্তিপুর্ন শোভাযাত্রা। স্বাধীন দেশ। সেই স্বাধীন দেশে কোন শান্তিপূর্ন শোভাযাত্রায় পুলিশের হামলা হতে পারে এটা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারে নাই। সে দিন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের শান্তিপূর্ন সেই শোভাযাত্রাটি ঢাকা প্রেস ক্লাবের পশ্চিমে চামেলী হাউজের পাশে অর্থাৎ ঢাকা হাইকের্টের মুখোমুখি আসতেই পুলিশের প্রবল বাধার মুখে পরে। শান্তিপূর্ন অভিযাত্রায় পুলিশের বাধা কেন ? পুলিশ সেদিন ঐ একই গতানুগতিক ধরাবাহিকতায় এক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ফেলে। সে দিন মনে হয়েছিল কোন এক পরাধীন দেশে স্বাধীনতার অভিযাত্রায় পুলিশ মনে হয় মরনপনে বাধা দিচ্ছে। যেন ক্ষমতা হারানোর ভয়। আর সেদিন’ই স্বাধীন বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল এক বিয়োগান্তক কালো ইতিহাস সৃষ্টির ঘটনা। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের শান্তিপূর্ন সেই শোভাযাত্রা লক্ষ্য করে হঠাৎ করেই ছুটে আসে পুলিশের নির্মম বুলেট। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের পাতায় সেদিন লেখা হয়ে যায় এক নির্মম মর্মন্তুদ বিয়োগান্তক করুন কাহিনী। পুলিশের ছোড়া সেই বুলেটে সেদিন মুক্তিযোদ্ধা মতিউল ইসলাম এবং টাঙ্গাইলের মির্জা আঃ কাদেরের বুক ঝাঁঝড়া হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা লুটিয়ে পরে স্বাধীন দেশের সেই পরিচিত রাজপথে। যে পথ তারা স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজী রেখে প্রতিদিন শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করে রাখতো সারাক্ষণ। ফিনকি দিয়ে ছুটে চলে তপ্ত রক্তের বিপ্ল¬বী ফাল্গু ধারা। রক্তাক্ত হয় স্বাধীন দেশের মুক্ত অবয়ব। পুনর্বার রক্তে রঞ্জিত হয় সমাজতন্ত্রের ক্ষুদিত লাল নিশান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যায় ফুঁসে উঠে বিপ্ল¬বী জলোচ্ছাসে। ডাকসু’র ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের হাত সেদিন রক্ত জমাট বজ্রমুষ্টিতে কেঁপে উঠে। ডাকসু’তে শাসকের আজীবনের সন্মাননা দেওয়া সদস্য পত্র বিপ্লবী করতেলে হয় ছিন্ন ভিন্ন। মুছে যায় শাসকের আজীবনের সন্মাননা’র সদস্য পদ। নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় সারা দেশে ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও কমিউনিষ্ট পার্টির সকল কার্য্যালয় ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা হয় নির্বিবাদে। এদিকে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের নির্মম সেই হত্যাকান্ডে স্তম্ভিত হয়ে পরে জাতির বিবেক। বলোতো বিবেক ! সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে সে কি নির্মম অবিচার ? সেদিন দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে ঘটে যাওয়া সেই অপরাধের কোন বিচার হয় নাই। এখনো হৃদয়ের নিটোল নিভাঁজে সেই বিচারের দাবী সযতেœ তুলে রাখা আছে। একদিন সেই বিচার হবেই হবে। এ মৃত্যু কখনোই বৃথা যেতে পারে না। বৃথা হতে দেওয়া যায় না। বৃথা যেতে দেব না। জেনে রেখ বিপ্লবীদের কখনো মৃত্যু হয় না। এখনো রাজবাড়ীর বাহাদুরপুরের কাজীপাড়া গ্রামে শুয়ে থেকে মতিউল নিরন্তর বিপ্লবের সাহস যোগায়। এমনি ভাবে যুগ যুগ ধরে বিপ্ল¬বীরা অমর হয়ে আছে, অমর হয়ে থাকবে। কমরেড মতিউল ইসলাম এবং কমরেড মির্জা আঃ কাদের আজ ভিয়েতনামের জাতীয় বীরের মর্যাদায় সমাসীন। অনেকেই হয়তো জানেনই না যে কমরেড মতিউল ইসলাম এবং কমরেড মির্জা আঃ কাদের ভিয়েতনামের জাতীয় বীরের মর্যাদা পেয়েছে। ভিয়েতনামের ইতিহাসে তারা যুগ যুগ জিও থাকবে। হে বীর তোমাদের জন্য রইল বিপ্লবী লাল সালাম। তোমরা যুগ যুগ জিও হও। লেখক ঃ সাবেক সম্পাদক,রাজবাড়ী জেলা বার এসোসিয়েশন।

(Visited 187 times, 1 visits today)