রাজবাড়ীতে চলাচলরত ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে প্রতিদিন চুরি হচ্ছে সাড়ে ৪ শতাধিক লিটার ডিজেল

জাহাঙ্গীর হোসেন :

340

চালক, মাস্তান, সাংবাদিক, জিআরপি পুলিশসহ রেলওয়ের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রকাশ্য যোগসাজসে একটি চক্র রাজবাড়ীর বিভিন্ন রুটে চলাচলরত ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে প্রতিদিন চুরি করছে সাড়ে ৪ শতাধিক লিটার ডিজেল। এ চুরির ঘটনা কয়েক বছর আগে রাতের বেলায় হলেও বর্তমানে দিনে ও রাতে সমানতালে করা হচ্ছে।
জানাগেছে, বৃটিশ আমল থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটের সাথে দক্ষিণ ও উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম বাহন ট্রেন। বর্তমানে রাজবাড়ী-খুলনা, রাজবাড়ী-রাজশাহী, রাজবাড়ী-পোড়াদহ, রাজবাড়ী-ফরিদপুর, কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া, রুটে বেশ কয়েকটি ট্রেন নিয়মিত ভাবে চলাচল করছে। প্রতিদিন এ ট্রেনের ইঞ্জিন গুলো খুলনার ডিপো থেকে কয়েক হাজার লিটার তেল নিয়ে রাজবাড়ীতে আসে। ইঞ্জিনের চালকরা ওই তেলের অংশ বিশেষ রাজবাড়ীর একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক তেল চোর চক্রের একাধিক সদস্য জানান, রাজবাড়ীর জেলা সদরের বেলগাছি, জেলার কালুখালী ও পাংশা রেলষ্টেশন এলাকায় তারা অবস্থান করে। তারা বস্তা বন্দি করে ৫৫ লিটারের একাধিক খালি তেলের ড্রপ জেলা সদরের সূর্যনগর এবং পাংশা রেলষ্টেশন থেকে ট্রেনের বগি ও ইঞ্জিনে তোলে। চালকরা প্রতিটি ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে প্রতিদিন ১১০ লিটার করে তেল চুরি করে তা ওই ড্রাপ গুলোতে ঢুকিয়ে রাখে। যে তেল বেলগাছি, কালুখালী ও পাংশা রেলষ্টেশনে নামিয়ে দেয়। তিনি আরো বলেন, প্রায় ৫ বছর ধরে নিয়মিত ভাবে ওই তেল চুরি করা হচ্ছে। আগে এ তেল রাতের বেলায় নামানো হতো। তবে এখন সে বিষয়টি অপেন সিক্রেট হওয়ায় দিনের আলোতেই নামানো হয়। মূলত জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য তাজু মেম্বার, জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের দফাদার মোসলেম মোল্লা, কালুখালী ষ্টেশন সংলগ্ন তেল ব্যবসায়ী রানা চৌধুরী ও পাংশার খালেকসহ ৫ জন ব্যক্তি এ তেল চোর চক্রের নেতৃত্বে রয়েছে। তারা কালুখালী রেলষ্টেশনে আসা নকশীকা কাঁথা ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে ২৫০ লিটার, একই ষ্টেশন আসা কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া ট্রেন থেকে ১শত লিটার, বেলগাছি রেলষ্টেশন আসা মেইল ট্রেন থেকে ১ শত লিটার তেল নামিয়ে থাকেন। তার হিসেবে প্রতিদিন সাড়ে ৪ শত লিটার তেল ওই সব ইঞ্জিন গুলো থেকে নামানো হয়। বর্তমানে এ তেলের সরকার নির্ধারিত প্রতি লিটারের মূল্য ৬৯ টাকা। সে হিসেবে প্রতিদিন রাজবাড়ী থেকে চুরি হচ্ছে ৩১ হাজার ৫০ টাকার তেল। যা মাসের হিসেবে দাঁড়ায় ৯ লাখ ৩১ হাজার ৫ শত টাকায়। এর মধ্যে ইঞ্জিন চালকদের প্রতি লিটার তেল বাবদ দিতে হয় ৪৫ টাকা হারে। এ হিসেবে প্রতিদিন চালকদের দিতে হয় ২০ হাজার ২ শত ৫০ টাকা। আর মাসে দিতে হয় ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫ শত টাকা। তারা চোরাই এ তেল বাজারে বিক্রি করেন প্রতি লিটার ৬৫ টাকায়। প্রতিলিটারে তাদের ক্রয় মূল্য থেকে আয় থাকে ২০ টাকা। প্রতিদিন ২০ টাকা হালে ৪৫০ লিটার তেলে আয় হয় ৯ হাজার টাকা। মাসে তাদের আয় হয় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। চুরির এ টাকার ভাগ দিতে হয় রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) কে প্রতি মাসে ৪৮ হাজার টাকা, মাস্তানদের ৪৫ হাজার টাকা, স্থানীয় প্রশাসন ও কতিপয় নামধারী সাংবাদিককে ৩৯ হাজার টাকা। তাদের লাভ থাকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা। যে টাকা চোর চক্রের প্রধান ওই ৫ জন ভাগাভাগি করে নেন।
রাজবাড়ী সদরের বেলগাছি এলাকার বাসিন্দা ও জেলা বাস্তুহারালীগের সভাপতি আশরাফুল আলম আক্কাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওই চোর চক্রের সদস্যরা অত্যান্ত ক্ষমতাশালী। তাদের উপর কথা বলার কেউ নেই। রাজবাড়ী অঞ্চলের রেলওয়ের লোকসান এ তেল চুরির কারণে আরো বেশি হচ্ছে। চোরেরা রাতারাতি হচ্ছেন বিত্তশালী। তিনি আরো বলেন, কালুখালীর তেল চোর চক্রের অন্যতম সদস্য রানা চৌধুরীর তেল বিক্রির দোকানে এখনো কয়েক হাজার লিটার মজুদ তেল করা রয়েছে। স্থানীয় পেট্রোল পাম্পের তেলের চাইতে ট্রেন ইঞ্জিনের তেল একটু মোটা। ফলে এ তেল চিহ্নিত করা কোন ব্যাপার না। যে কেউ দেখলেই এ তেল চিহ্নিত করতে পারেন। তিনি আরো বলেন, পেট্রোল পাম্পের তেলের চাইতে ট্রেনের ইঞ্জিনের তেলের চাহিদা বাজারে বেশি। তাছাড়া দাম লিটার প্রতি ৪ টাকা কম হওয়ায় স্যালো ইঞ্জিন চালিত নছিমন, করিমন, পাওয়ার টিলারসহ ডিজেল চালিত যানবাহন চালকরা ওই তেল সংগ্রহ করতে অধিক ব্যস্ত থাকেন। তিনি মনে করেন, রাজবাড়ীর রেলকে বাঁচাতে হলে জরুরী ভিত্তিতে ট্রেনের ইঞ্জিনের তেল চুরি বন্ধ করতে হবে।
তেল চোর চক্রের অন্যতম সদস্য ও জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের সাবেক সদস্য তাজু মেম্বার জানান, তারা ট্রেনের ইঞ্জিন চালকদের সহায়তায় তেল চুরি করে থাকেন। তবে তার দাবী, দিনে তারা ১ শত থেকে দেড় শত লিটার তেল চুরি করে থাকেন। একই সাথে তিনি এ সংক্রান্ত রিপোর্ট না করার অনুরোধ জানান এবং এ প্রতিনিধির সাথে দেখা করারও আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তেল চোর চক্রের অপর সদস্য ও জেলা সদরের মিজানপুর ইউনিয়নের দফাদার মোসলেম মোল্লা জানান, তিনি ১০ বছর আগে তেল চুরির সাথে জড়িত ছিল। তবে এখন তিনি এ চুরির সাথে জড়িত নন। কারা এ তেল চুরি করেন, তাও তিনি জানেন না। তবে তিনি এ প্রতিনিধির সাথে দেখা কারার আগ্রহ দেখান।
রাজবাড়ীর ট্রেন ইঞ্জিন চালকদের সংগঠন রানিং স্টাফ শ্রমিক সমিতির সভাপতি চালক বিপ্লব কুমার সরকার জানান, তেল চুরির বিষয়ে তিনি কোন কথা বলবেন না।
রেল ইঞ্জিন গুলোর দেখভালকারী রাজবাড়ী রেলওয়ের লোক ফোরম্যান বিজয় কুমার ঘোষ জানান, তোল চুরি হয় বা না হয় সে বিষয়টি ট্রেনের ইঞ্জিন চালকরা জানেন। বিষয়টি তার নয়।
রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, চুরির ভাগ নেয়াতো দুরের কথা, তেল চুরির বিষয়টিই তার জানা নেই।

(Visited 73 times, 1 visits today)