আড়াইশ বছরের হরিজনরা জমি পায়নি আজও

জাহাঙ্গীর হোসেন  :

রাজবাড়ী পৌরশহরের দৌলতদিয়া-পোড়াদাহ রেলওয়ে স্টেশনঘেঁষে রেলওয়ের জমিতে গড়ে উঠেছে বিবেকানন্দ হরিজন পল্লী। প্রায় আড়াই শ বছর ধরে বংশপরম্পরায় হরিজনরা এ পল্লীতে বসবাস করে এলেও আজও তাদের ভাগ্যে জোটেনি মাথা গোঁজার একখণ্ড জমি। ফলে তীব্র আবাসন সংকটে ভুগছে তারা।

বিবেকানন্দ হরিজন পল্লীর বাসিন্দা গৌতম দাস, কৃষণ, পাপন, রবি লাল জানান, তাঁদের অনেকেই সরকারি কোয়ার্টারে মাসিক ভাড়া দিয়ে বসবাস করেন। আবার অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ও বিভিন্ন উপায়ে পাটকাঠি, টিনশেড ঘর তুলে স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা নিয়ে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। সরকারি জমিতে বহুকাল ধরে তাঁরা ও পূর্বপুরুষরা বসবাস করলেও তাঁদের ভাগ্যে আজও জোটেনি মাথা গোঁজার একখণ্ড ভিটে। বেশির ভাগ পরিবারের সদস্যের প্রধান আয়ের উৎস সামান্য বেতনে পৌরসভায় চাকরি। এ বেতনে জীবনের চাহিদা মেটানো দুষ্কর। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা (ন্যায্য হিস্যা) থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা। তেমন কর্মসংস্থান না থাকার কারণে তাঁরা সারা বছরই থাকেন আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে।

এদিকে হরিজনদের সরকারি কোয়ার্টারগুলো দীর্ঘদিন কোনো ধরনের সংস্কার না করায় সেখানে জরাজীর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিবেকানন্দ পল্লীসংলগ্ন পৌরসভার পানির ট্যাংক স্থাপন করা হলেও ওই পানি পান না হরিজনরা। অবশ্য ৪০টি টিউবওয়েল বসিয়ে সুপেয় পানির চাহিদা মেটাচ্ছেন তাঁরা। পল্লীর জন্য পৌরসভা থেকে পাঁচটি বাথরুম নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে দুটি সচল রয়েছে। এ দুটিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিন-চারটি পরিবার মিলে ল্যাট্রিনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়েছে।

হরিজন পল্লীর বাসিন্দা উত্তম দাস বলেন, বাংলাদেশে হাজং, কোচ, বানাই, মারমা, চাকমা, গারো, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, খাসিয়া, মণিপুরী, খুমি, খিয়াং, লুসাই, বম, ম্রো, রাজবংশী, হরিজন, ডোম, সুইপার, ঋষিসহ বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তারা তাদের স্বকীয়তা, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে। নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখে তারা যাতে অন্যদের মতো সমান মর্যাদা ভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু এসব বর্ণের মানুষ আজ অবহেলিত। হরিজনরা ওই পল্লীতে আড়াই শ বছর ধরে থেকেও জমির মালিকানা (দখলস্বত্ব) থেকে এখনও বঞ্চিত।

হরিজন পল্লীর বাসিন্দা রতন ভক্ত, মিতা সরকার, রাজকুমার, মিলন দাস হেলা, রাধা রানি, শ্যাম ভক্ত, রমেন সরকার ও সঞ্জয় সরকার বলেন, স্বাধীন দেশে বসবাস করেও তাঁরা যেন পরাধীন জীবনযাপন করছেন। সরকার সারা দেশে ভূমিহীনদের মধ্যে খাসজমি বন্দোবস্ত দিলেও তাঁরা পাননি। ঘর তুলতে না পারার কারণে পরিবারের লোকজন নিয়ে তাঁদের গাদাগাদি করে এক ঘরে বসবাস করতে হয়।

বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের রাজবাড়ী জেলা শাখার সভাপতি বাসুদেব মণ্ডল জানান, রাজবাড়ী বিবেকানন্দ পল্লীতে প্রায় ৮৫টি হরিজন পরিবারের ৯০০ লোকের বসবাস। তাদের মধ্যে কলেজে ১১, হাইস্কুলে ১৪, শিশুশ্রেণিতে ৭ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫০ জন পড়াশোনা করে। বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে সপ্তম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর ঝরে পড়ে। প্রায় ৬৫ জন পৌরসভায় ১৩০০ থেকে ২৭০০ টাকা বেতনে চাকরি করেন। তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে তাঁদের নামে জমি বন্দোবস্ত দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন হরিজন পল্লীর বাসিন্দারা।

(Visited 42 times, 1 visits today)