কবি নেহাল আহমেদ-এর গল্প “আরেক বসন্ত”

 “আরেক বসন্ত”

0000

আমি নিখিলেশ। বয়স একুশ। স্বভাব চেতনায় যাকে বলে দুরন্ত, তা নয়। ভদ্র সন্তান বললে নেহাৎ মন্দ হয় না। এই বয়সে কথাগুলোকে কাব্যকতা আর জীবনটাকে কল্পনার রঙিন ডানায় উড়াতে অমিতের কাছে প্রিয় হতে পেরেছি। অমিত আমার বন্ধু দুরন্ত আর সাহসী, আড্ডা বিতর্কের ঝড় তুলে সব কষ্টকে কোণঠাসা করে দেয় বিজয়ের তুড়িতে। হঠাৎ করে অমিত সেদিন সন্ধাবেলা এসে বললো, নিখিলেশ শোন ভালো রকম একটা ঝামেলায় পড়ে গেছি। শ্রাবণীকে তো চিনিস, আমার মামাত বোন। বললাম হুঃ দেখেছি ধর্মতলায় থাকে। প্রতিমার মতো চেহারা। বললো, তোকে দিয়েই হবে। একটা চিঠি এগিয়ে দিল, এটা পড়। চিঠিটা পড়লাম। খুব আহত বোধ করলাম-পুজোয় যাওয়ায় পর থেকে একটাও চিঠি দেয়নি এমনি সব অভিযোগ। আহা এমন একটা মেয়ে। ঠিক মেয়ে নয় মায়াবতী, যৌবন যেখানে এসে থমকে দাঁড়ায়। কি বুঝলি প্রশ্ন করায় বললাম হিংসে হচ্ছে। বললো, শ্রাবণী আমার হাতের লেখা চিনে না। তাছাড়া তোর হাতের লেখা আর আমার লেখা প্রায় একই রকম। আমার হয়ে উত্তরটা দিয়ে দিবি। দেখি কেমন কবিতা লিখিস। টাকা দে পঞ্চাশটা। টাকাটা দিতেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। আমি হতস্তম্ভ চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। লিখেছি-
অমিত,
কতদিন হল তোমার ওখান থেকে এসেছি। খরবটা নিলে না। তোমার বন্ধুদের চেয়ে আমি যে ভাল না, সে আমি জানি। ভেবেছিলাম কলেজ বন্ধে, তোমার কাছে যাব। চিঠি না দিলে ঠিক যাব না-শ্রাবণী। নিজের অজান্তেই লিখলাম।
শ্রাবণী,
তোমার দুটো অভিযোগের একটাও ঠিক না। প্রথমত, আমি এক বিপদজ্জক ঝামেলায় পড়েছিলাম। আর দুই, তুমি নিজেও জান না তুমি কত সুন্দর। সূর্যসাক্ষী, তোমার মতো সুন্দর মুখ জন্ম থেকে আর সে দেখেনি। কয়েক দিন পর আর একটা চিঠি এল। অমিত খুব ব্যস্ত ওর ছাত্ররাজনীতি নিয়ে। কলেজ নির্বাচন। উত্তর লেখার কাজটা আমারই রইলো। শ্রাবণী সুন্দর করে গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে-
অমিত,
তোমার মতো সুন্দর করে আমাকে আগে কেই সুন্দর বলেনি। বিপজ্জনক ঝামেলা আর জড়াবে না।
শ্রাবণী
এরপর থেকে অমিত জোর করে আমাকে যুদ্ধে নামল। অমিতের হয়ে উত্তরটা আমি দিয়ে যাই। কেমন যেন আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম দু’জন দু’জনার প্রতি। শ্রাবনী লিখল-
অমিত ভাবতে খুব অবাক লাগে। কি করে যে তোমার ওপর এতটা নির্ভশীল হয়ে পড়লাম। বিশ্বাস করো অমিত আমি যদি অন্য কোথাও কারো কাছে যাই। আমার মনটা তোমার কাছেই বাধা থাকে। তুমি ভেতরে সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। সুন্দর মানুষ। আমার জন্মন্তরে আমি লিখলাম তারপর-
শ্রাবণী
আততায়ীর ছুরির মতোই ধারালো তোমার উপস্থিতি। তোমার মধ্য থেকে তুমি বেরিয়ে আস, রঙিন্ সজসজ্জা ছিড়ে-এই অনাসৃষ্টি উৎসবে। আমার খুব ভয় হয়। তৃপ্তিহীন ঈশ্বরের মতো এই মুখ মর্মাহত না হয় এই আমার ব্যর্থতায়।
এরপর শ্রাবণী লিখলো-
অমিত
ফুলের স্তবকে রাজপ্রাসাদ। ময়ূর পুচ্ছে অভেদ্য প্রাচীর। শুক্লা দ্বাদশীর জোৎস্নায় আলোর দাপট। নীলপদ্ম ফুলের প্রবিষ্ট আসনে আমাকে অভাবী ঈশ্বরের রাজ সংস্করণের চুম্বন এঁকে দিয়ে যাবে এক যুবক। যে পুরুষ। আমি তার পথ চেয়ে বসে থাকি।
শ্রাবণী
চিঠিটা পড়ে মনে হলো আমি উশ্বর হয়ে গেছি। এক হাতে আমার সকাল বেলার কষ্ট। অন্যহাতে বিকেল বেলার জন্ম। আমি লিখলাম-
শ্রাবণী,
এই হাতে আগ্নেয়াস্ত্রের বন্ধুত্ব। অনবরত আমাকে যুদ্ধ করতে হয় আমার বিরুদ্ধে। টাল-মাটাল জীবনের স্রোতে কেবলই উচ্চারিত হয় ব্যর্থতার ধ্বনি। কুকুরের নৈশক্রন্দনের ধ্বনি বুকে নিয়ে রক্তে বাজে নিষ্ঠুর সানাই। শশত্র“ মৃত্যুর আলিঙ্গন ছেড়ে সে সৎ পথ বহু দূরে। বারবার পা হকরে পড়ে যাই। শিরদাঁড়ায় ভর দিয়ে ধ্বংসক্রামিক পুরুষ হতে আমাকে চুম্বন করতে হয় বিশ্বাস ঘাতকতার ওষ্ঠ। তোমার ভালবাসা হৃদয়ে নিয়ে আমি সে পুরুষ প্রত্যাখ্যান করি।
এরপর শ্রাবণী তার অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যত এক করে লিখলো-
অমিত,
তোকে আমি হৃদয়ে রাখবো। ছুটিতে আসছি।
শ্রাবণী
এরপর সত্যি সত্যি শ্রাবণী এল। অমিতের কাছে। অমিতের পাশে। আজ ওরা গ্রামে যাচ্ছে। আমার যাওয়ার কথা ছিল। বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করলাম।
বসন্তের প্রথম সকাল আজ। শ্রাবণী আর বসন্তবরণ করবে অমিতের সঙ্গে। গ্রামের মেঠোপথ। কৃষ্ণচূড়ায় লালফুল। কোকিলের কুহুতান, বাউকুড়ানি ঝড়ে আচল উড়বে। গন্ধ ছড়াবে ঋতুবতী আমের মুকুল। আমার কষ্টের জোয়ারে। রাত্রে চাঁদ অনেটা নিচে নেমে এসে আলো ছড়াবে। আমি শ্রাবণীকে খুঁজবো হয়তো কোন অবসরে। বাউকুড়ানি ঝড়ে। কোকিলের কুহু তানে, কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলে ফুলে। শুধু নিখিলেশের কথা কেউ জানবে না।

(Visited 101 times, 1 visits today)