রাজবাড়ীতে দলিত জনগোষ্টির বিকল্প কর্মসংস্থানে

সোহেল রানা, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

risvi

দলিত, হরিজন ও বেদে সম্প্রদায় নিগৃহিত ও দলনের শিকার। চরম অবহেলিত, বিচ্ছিন্ন, উপেক্ষিত জনগোষ্টি হিসেবে এরা সমাজে পরিচিত। জেলে, সন্যাসী, ঋষি, বেহারা, নাপিত, ধোপা, হাজাম, নিকারী, পাটনী, কাওড়া, তেলী, পাটিকর ইত্যাদী তথাকথিত নি¤œবর্ণের জনগোষ্টি এ সম্প্রদায়ভুক্ত। সমাজে অন্যান্যে জনগোষ্টির সঙ্গে এদের সামাজিক বৈষম্যের সৃষ্টি করা হয়েছে।
দলিত সম্প্রদায়ের বেশির ভাগ পরিবার প্রধানরা ১৫শত টাকা বেতনে পৌরসভা, হাট-বাজার ঝাড়–, বিভিন্ন সরকারী -বেসরকারী অফিসের কাজ, বাঁশ ও বেতের তৈরী তৈষশপত্র বিক্রি, সেলুন, জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করে। এদের জন্য সরকার কোঠা চালু থাকলেও এখন আর তাদের চাকুরী মিলছে না। ফলে পরিবার –পরিজন থেকেই শুধুরা শিক্ষার প্রতি অনিহা প্রকাশ করে। তাই ৬-৭ বছর বয়স হলেই শিশুরা তাদের পিতা-মাতার সাথে কাজে জড়িয়ে পড়ে। তবে দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন পরিশ্রমী। তাদের অধিকার, দাবী আদায়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, প্রাপ্তিসহ সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে পাড়া মহল্লায় সমবায় সমিতি গড়ে উঠছে। এক সময় দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন অবহেলার কারণে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টি হয়ে ওঠে। শারি সংস্থার পরিচালনায় স্থানীয় এনজিও সমন্বিত প্রমিলা মুক্তি প্রচেষ্টা রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ, পাংশা, রাজবাড়ী সদর, কালুখালী, বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ও পল্লীতে সভা-সমাবেশ ও উদ্বুদ্ধকরন সভা করে আসছে। এখন তাদের সরকারী প্রাপ্তি, সুযোগ-সুবিধা, সমাজের অন্যান্যে মানুষের মত তাদেরও অধিকার আছে স্বচেতন হয়ে উঠছে। দলিত সম্প্রদায়ের সমাজে প্রচলিত আইন ও নীতিমালা , কুসংষ্কার, দুর্নীতি, সামাজিক ও সাংষ্কৃতিক প্রথা, মুল্যেবোধ, রীতিনীতির বাধ্যবাধকতা এসব কিছুই অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। এটাই বাস্তবতা।
গোয়ালন্দ রেলওয়ে ডোম পল্লী, রাজবাড়ী বিবেকান্দ পল্লী, পাংশা ঋষি পল্লী, বালিয়াকান্দি পুর্ব মৌকুড়ী ঋষি পল্লী, বহরপুর ঋষি পল্লী, কালুখালী , পুর্বমৌকুড়ী, হাড়ীখালীসহ এসকল পল্লীর পাশে কোন খেলার মাঠ নেই। ফলে খেলাধুলায় পিছিয়ে পড়ছে। তাদের পেশায় অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজন কাজ করায় তারা বেকার হয়ে পড়ছে। এখন তাদেরকে বিকল্প পেশা গ্রহন করতে হচ্ছে। অনেকে সেলুনের কাজে ঝুকে পড়ছে। তবে এখন লেখাপড়াও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে দলিত সম্প্রদায়ের লোকদের মাঝে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ মতে বাংলাদেশে প্রায় ৪৩.৫৮ লক্ষ দলিত জনগোষ্টি, ১২.৮৫ লক্ষ হরিজন জনগোষ্টি এবং ৭.৮০ লক্ষ বেদে জনগোষ্টি রয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাঁশফোর, ডোমার, রাউত, তেলেগু, হেলা, হাড়ি, লালবেগী, বাল্মিগী, ডোম ইত্যাদী হরিজন সম্প্রদায়। যাযাবর জনগোষ্টিকে বেদে সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিত। বেদে জনগোষ্টির শতকরা ৯৯ ভাগ মুসলিম এবং শতকরা ৯০ ভাগ নিরক্ষর। ৮টি গোত্রে বিভক্ত বেদে জনগোষ্টির মধ্যে মালবেদে, সাপুরিয়া, বাজিকর, সান্দার, টোলা, মিরশিকারী, বরিয়াল সান্দা ও গাইন বেদে ইতাদি। এদের প্রধান পেশা হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, তাবিজ-কবজ বিক্রি, সর্প দংমনের চিকিতসা, সাপ ধরা, সাপের খেলা দেখানো, সাপ বিক্রি, আধ্যাতিœক স্বাস্থ্য সেবা, শিংগা লাগানো, ভেষজ ঔষুধ বিক্রি, কবিরাজি, বানর খেলা, যাদু দেখানো প্রভৃতি। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে পাইলট কর্মসুচির মাধ্যমে ঢাকা, চট্রগ্রাম, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, নওগাঁ, যশোর, বগুড়া এবং হবিগঞ্জ জেলায় ৬৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৩-১৪ সালে নতুন ১৪ জেলাসহ ২১টি জেলায় এ কর্মসুচি বাস্তবায়িত হয়। ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, চট্রগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুমিল্লা, পাবনা, নওগাঁ, দিনাজপুর, নীলফামারী, যশোর, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং হবিগঞ্জ। এ অর্থবছরে সাত কোটি ছিয়ানববই লক্ষ আটানব্বই হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ২১ জেলায়ই বিকল্প কর্মসংস্থানের এ কার্যক্রম চলছে। এ জন্য ৯,২২,৯৪,০০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নতুন ১৪ জেলা গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, নেত্রকোনা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, লক্ষীপুর, রাজশাহী, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ, বগুড়া, সাতক্ষিরা, বরিশাল এবং মৌলভী বাজার এ কার্যক্রম সম্প্রসারনের কাজ চলছে।
এ কার্যক্রমে স্কুলগামী দলিত, হরিজন ও বেদে শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষে ৪ স্তরে জনপ্রতি মাসিক প্রাথমিক ৩শত টাকা, মাধ্যমিক ৪৫০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিক ৬০০ টাকা এবং উচ্চতর ১০০০ হাজার টাকা হারে উপবৃত্তি প্রদান করা। এদেরকে বৃত্তিমুলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয়বর্ধক মুলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করে গড়ে তাদের সমাজের মুল ¯্রােতধারায় ফিরিয়ে আনা। ৫০ বছর বা তার উধেৃ বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল ব্যাক্তিদের বিশেষ ভাতা জনপ্রতি ৪০০ টাকা করে প্রদান। এসকল সেবা প্রদান করা হয় । সরকারকে আরো প্রকল্প গ্রহনের মাধ্যমে দলিত সম্প্রদায়ের ভাগ্যেন্নয়নে এগিয়ে আসতে হবে।

(Visited 74 times, 1 visits today)