“পোড়ো বাড়ির পাঠশালা” – অমিতা রাণী সাহা –


রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :
বিচ্ছু দলটির অনেকগুলো অতিপ্রিয় কাজের মধ্যে একটি ছিল মোল্লাদাড়ি খাওয়া। এই অদ্ভুত নামটি ওদের মুখেই প্রথম শুনেছিলাম। নামটি কে কবে দিয়েছিল জানিনা, কিন্তু মোল্লাদাড়ি ছিল একরকমের বুনোলতার ফল। দেখতে অনেকটা জালের কাঠির মত। খোসাটি সবুজ রঙের আর ডিমের খোসার মতো মুড়মুড়ে। এরই ভেতরে আধ-খানা কলাই ডালের মত ৫/৬টি বীজ হতো। পাকলে ঐ বীজের উপর টক-মিষ্টি স্বাদের একটা রসালো আবরণ তৈরি হতো। ঐ একটু খানির জন্য ওরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিত। সাত সমুদ্র তেরো নদী বললাম এ কারণেই যে, মোল্লাদাড়ির কাছে পৌঁছানো খুব একটা সহজ কোন কাজ ছিল না। এ জন্য ওদেরকে যেতে হতো জমিদার সুরেন্দ্রনাথ রায় মহাশয়ের পোড়ো বাড়ির মন্ডপ দালানের ছাদে। মন্ডপ দালানের পূর্বপাশে একটি বিশাল বেলগাছ ছিল। তারই ডালপালা ছাদের প্রায় অর্ধেকটা অংশ ঢেকে ঝোপের মতো সৃষ্টি করেছিল। এই ডালপালা গুলির আশ্রয়ে প্রশয়ে মোল্লাদাড়ি লতাগুলোর এতটাই বাড়-বাড়ন্ত হয়েছিল যে, বেল গাছের অস্তিত্ব বুঝে ওাঠাই প্রায় ভার হয়ে দাড়িয়েছিল।

সে ভাল, কিন্তু সমস্যাটি ছিল এখানেই যে, ঐ ছাদে যাওয়ার কোন সিঁড়ি ছিল না। ওখানে যেতে হলে ভিতর বাড়ির আঙিনা জুড়ে গজিয়ে ওঠা ঝোঁপ ঝাঁড়ের মধ্যে দিয়ে বিলি কেটে-কেটে অসংখ্য খোঁচা-খাঁচি খেয়ে তবে পৌছুতে হতো নীচ তলার সিঁড়ি ঘরে। এর পর এক রাশ ময়লা আবর্জনায় স্তুপ পেরিয়ে সিঁড়ি-দরজা। শ্যাওলাযুক্ত স্যাঁত-সেঁতে, বড়-বড় ধাপের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হতো দোতলায়। কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ আর নিঃস্তব্ধতা। সব মিলিয়ে একটা গা ছম-ছমে ভুতুরে আবহ। তার ওপর আবার বড়দের দেখানো সাপ খোপের ভয়। বড় বড় সাপের খোলসের উপস্থিতি মাঝে মাঝেই প্রমান করে দিয়েছে যে-সে ভয়টাও অমূলক কিছু ছিল না। সিঁড়ি মুখের ঘর খানার ঠিক পূব পাশের ঘরখানাতে ছিল আরো ভুতুরে ব্যাপার। ঠিক যেন রূপকথার রাক্ষস খোক্ষসের আস্তানা। পা ফেলার জায়গাটি পর্যন্ত নেই। পুরো ঘর ভর্তি শুধু হাড় গোড় তবে হাড়গুলো মানুষের নয় ঃ পাখপাখালির-এই যা ভরসা। এই রাক্ষস-খোক্ষসের আস্তানা ঘরটির উত্তর পাশে মন্ডপ দালানের ছাদ লাগোয়া ছোট্ট একটু ঝুলবারান্দা। তারই কার্নিশ বেয়ে অতি সাবধানে পৌঁছাতে হতো মোল্লাদাড়ির ছাদে। পা ফসকালেই অবধারিত মৃত্যু। পুরো পথটাই ছিল বেশ বিপদজনক। কিন্তু তা বলে ওরা কখনও থেমে থাকেনি। আমার তো মনে হতো মোল্লাদাড়ির চেয়ে অ্যাডভেঞ্চারটাই ওদেরকে বেশি টেনেছে।

সেদিন রবিবার। স্কুলের তাড়া ছিল না। সকাল সকাল দস্যি গুলো মোল্লাদাড়ির ছাদে গিয়ে উপস্থিত। কিন্তু ওদের মধ্যে ইতি নামের ছোট্ট মেয়েটি কার্নিশ বেয়ে মন্ডপের ছাদ পর্যন্ত পৌছানোর বিদ্যোটা তখনও রপ্ত করে উঠতে পারেনি। সে ঝুলবারান্দার কার্নিশ ধরে দাড়িয়ে নিবিড় ভাবে বন্ধুদের হাতের সঞ্চালন পর্যবেক্ষণ করছিল আর “ঐ যে একটা, ঐ যে একটা” বলে বন্ধুদের কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছিল। এমন সময় তার কানের কাছে একটা “ফুড়–ৎ” শব্দে সচকিত হয়ে ফিরে তাকাতেই দেখল-একটা দোয়েল পাখি বেরিয়ে যাচ্ছে। একটু বাদে আবার “ফুড়–ৎ” করে ঘরে ঢুকলো পাখিটি। এবার তার মনোযোগ সরে এল দোয়েল পাখিটির দিকে। এই ফড়–ৎ, ফুড়–তের কারণ অনুসন্ধান করতে দিয়ে সে যা আবিস্কার করলো তার আনন্দ এতটাই প্রবল ছিল যে; সে আনন্দের ঢেউ ঝুলবারান্দা পেরিয়ে মন্ডপের ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পলকমাত্র দেরী হল না। সবাই পড়ি-মরি করে ছুটে এল। বলাই বাহুল্য যে এই আবিস্কারের কাছে মোল্লাদাড়ি নিতান্তই তুচ্ছ বিষয় হয়ে দাড়ালো। যে কয়েকটি ফল সংগ্রহ করা হয়েছিল তা এই আনন্দের জোয়ারে কোথায় ভেসে গেল তার সন্ধানে কারও আর কোন আগ্রহ মাত্র রইলো না।
পুরো বাড়িটার কোন ঘরেই তখন আর একখানিও জানালা দরজার কপাট বা চৌকাঠ কোনটাই অবশিষ্ট ছিল না। শুধুমাত্র তার স্মৃতি-চিহ্ন স্বরূপ দেয়ালে ফোঁকর গুলি রয়ে গেছে। তারই একটি ফোঁকরে দোয়েল পাখিটা হয়তো পরম নিশ্চিতে বাসা বেঁধেছিল। বাসায় চারটি ছানা। ছানা গুলোর তখওন চোখ ফোটেনি। ইতির এই মহা আবিস্কার স্বচক্ষে দেখে আনন্দে সবাই ইতিকে জড়িয়ে ধরল। মা পাখিটা ওদের মাথার উপর দিয়ে ঘুরছিল আর প্রাণ-পণে কিচির-মিচির করছিল। ইতি বললো,“চল লুকাই, দেখি মা পাখিটা কী করে?” ওরা লুকিয়ে পড়ে সবাই নিশ্চুপ হয়ে রইল। এবার মা পাখিটা বাসায় এল। খানিকটা এদিক ওদিক তিড়িং বিডিং করে আবারও ফুড়–ৎ করে বেরিয়ে গেল। ইতির নির্দেশে ওরা লুকিয়ে রইলো। মা পাখিটা মুখে একটা তাজা ঘাস ফড়িং ধরে নিয়ে ফিরে এল-সবুজ রঙের ঘাস ফড়িং। পা গুলো তখনও নড়ছিল। দোয়েলটা বাসায় ঢুকে খাবারটা বাচ্চার মুখে গুজে দিয়েই আবারও দে ছুট। ওরা সবাই বেরিয়ে এল। বাচ্চাগুলির কাছে গিয়ে মুখ দিয়ে দোয়েল পাখির মত “টিস—-” করে শব্দ করতেই বাচ্চাগুলো গলা উঁচিয়ে আকর্ণ প্রশস্ত মূখগহবর প্রসারিত করে হা করে খাবারের জন্য অপেক্ষা করে রইলো। কেউ কোন কথা বললো না কিন্তু চোখে চোখে Interaction টা হয়ে গেল। ইতি মুখ দিয়ে একটি মাত্র শব্দ উচ্চারণ করলো, “চল।” এর পর সিঁড়িতে পাঁচ জোড়া কঁচি কঁচি পায়ের ছন্দায়িত দুপ্দাপ্ শব্দ। ওরা সবাই জানে ওদের গন্তব্য, কারণ এই কাজটি এর আগে আরও অনেকবার করেছে ওরা।

বাহির বাড়ীর বৈঠকখানা ঘরের অনেকটা ফাঁকা জায়গা। বড়দের কাছে শুনেছি ফুলের বাগান ছিল। তখন মাঝে মাঝে দু/একখানা শান বাঁধানো বসবার জয়গার ভগ্নাবশেষ ছাড়া আর কোন চিহ্ন মাত্র তো ছিলই না বরং বড় বড় ছন গাছে পুরো আঙিনা ঢেকে গেছিল। তারই মধ্যে ঘাস ফড়িংয়েরা ছট্ ছট্ করে লাফিয়ে বেড়াতো। এই পোড়ো বাড়িটা ওদের এতটাই নখদর্পণে ছিল যে, সেটিও চোখ এড়ায়নি। একটু বাদে সেই দুরন্ত পদ-শব্দ গুলি এসে থেমে গেল ছনের আঙিনায়। ফড়িং ধরতে গিয়ে ছনের ধারালো পাতা ছোট ছোট হাত গুলিকে আঁচড়ে দিচ্ছিল আবার কারও থাবার মধ্যে ফড়িং বেচারা দুই নম্বর কর্ম (পায়খানা) করে মাখামাখি করে দিচ্ছিল। কিন্তু তাতে কী! ওসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাববার মত অবকাশই তখন কারো ছিল না। প্রত্যেক বাচ্চার জন্য দুটি করে মোট আটটি ফড়িং ধরে নিয়ে ওরা ফিরে এল রাক্ষস-খোক্ষসের আস্তানা ঘরটিতে। এবার খাওয়াবার পালা। ইতি শর্ত বেধে দিল-সে একাই খাওয়াবে। যদি সে খুঁজে না পেতো তাহলে তো কেউ দেখতেই পেত না। দেখতে পেরেছে এটাই ঢের-অকাট্য যুক্তি। এ যুক্তি খন্ডবার সাধ্য আর কারও হল না। হবেই বা কী করে? ইতি বয়সে অনেকের চেয়েই ছোট হলেও স্কুলে সে এবার ডাবল প্রমোশন নিয়ে ওদের চেয়ে এক ক্লাস উপরে ২য় শ্রেণিতে উঠে গেছে তাছাড়া স্কুলে তো ও প্রায়ই ওদের মাস্টার সেজে পড়ায়ও। ইতির কথা অমান্য করে সাধ্য কী ওদের শেষ পর্যন্ত ফয়সালা হল এই যে, ইতি খাওয়াবে, অন্য সবাই পাশে দাড়িয়ে দেখবে কিন্তু ছুঁতে পারবে না। ইতি বাসার কাছে মুখ নিয়ে শব্দ করে, “টিস—–।” বাচ্চাগুলো গলা লম্ব করে প্রচন্ড বড় রকমের হা করে। হা করা মুখের মধ্যে একটা আস্ত ফড়িং গুজে দিতেই গপ করে গিলে নেয়। সবাই মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটি দেখছিল, কিন্তু ইতির কাকাতো বোন বিভা ফয়সালাটি মেনে নিতে পারেনি। সে বার বার ইতিকে অনুরোধ করেই চলছিল, “দেনা একটু, একটা খাওয়াই।” কিন্তু ইতি বিভার সে আকুতিতে কর্ণপাত মাত্র না করে একে একে সবগুলো ফড়িং গিলিয়ে দিয়ে তবে খান্ত হল। ফেরার সময় সবাইকে আবার খুব করে শাসিয়েও দিল, “শোন, আমাকে ছাড়া এদিকে কেউ আসবি না কিন্তু। যদি কিছু করিস তাহলে কিন্তু আমি তোদের সাথে আড়ি দিয়ে দিব।” ইতির সাথে আড়ি হবে এ কথা ওরা কেউ ভাবতেও পারে না। শান্তা, সালমা আর নারান (নারায়ন) নিতান্ত ভালমানুষের মতো মুখ করে সব মেনে নিল। কিন্তু বিভা বিষয়টি মন থেকে মেনে নিতে পারল না। সে রাগে গজ গজ করতে করতে সেদিনের মতো বাড়ী ফিরলো। দেরি করে বাড়ী ফেরার জন্য বিভার পিঠে দুপ্দাপ্ দু’ঘা পড়ল। একে তো ইতির কাছে ভীষণভাবে নিগৃতীত হওয়ার জ্বালা তার ওপর আবার পিটুনি-সব মিলিয়ে বিভাকে বেপরোয়া করে দিল। সে গগন বিদায়ী চিৎকারে বাড়ী মাথায় করে নিল। ইতির মা খুব শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। মারলেন না বটে; তবে প্রচন্ড বকা দিলেন।



দুপুরের খাবার পর মায়ের পাশে শুয়ে ভাত ঘুম দিতে গিয়ে কিছুতেই ঘুম এল না ইতির। দুচোখ জুড়ে শুধু পালকহীন, চোখ না ফোঁটা, মুখ হা করা পাখির ছানাগুলোর ছবিই ভাসছিল। মা একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হতেই আস্তে করে উঠে পড়ল সে। কোন রকম শব্দ না করে পা টিপে টিপে রান্না ঘরে ঢুকলো। অতি সন্তর্পনে আলমািির খুলে বিস্কুটের কৌটাটা নামাল ইতি। গুনে গুনে চার খানা বিস্কুট নিয়ে আবার জায়গামত রেখে দিল। আবারো পা টিপে টিপে বিভাদের ঘরের জানলায় উঁকি দিল। বিভা বিছানায় বসে পুতুল নিয়ে খেলছিল। খেলছিল বললে ভুল হবে। নাড়াচাড়া করছিল মাত্র। মনে মনে সে ইতিরই অপেক্ষায় ছিল। ইতি ইশারা করতেই আন্তে করে বেরিয়ে এল সে। ইতি বললো,-“চল যাই।” বিভা বললো, “চল।”
খানিক আগেই বিভার মনে ইতির প্রতি যে রাগ, অভিমান ছিল এখন আর তার লেশ মাত্র বাঁকী ছিল না। যেতে যেতে বিভা জিজ্ঞাসা করলো, “ফড়িং ধরবি?”
ÑÑÑনা। ইতি বিভাকে বিস্কুট চারখানা দেখিয়ে বললো, “ভালো হবে না, বল?” বিভা ইতির চেয়ে বছর খানেকের বড়। লেখাপড়াটা ঠিকমত আয়ত্ত করতে না পারলেও ব্যবহারিক জ্ঞানটা ইতির চেয়ে একটু বেড়েছে বই কী? ও বললো “দুর! খেতেই পারবে না, গলায় আটকে যাবে। কেমন শক্ত; দেখছিস না?” (পাখিরা ফড়িং খায়-সে কথা ইতি জানতো। কিন্তু ও ভেবেছিল বিস্কুটের চেয়ে ভাল খাবার আর হতেই পারে না) একটু অপ্রতিভ হয়ে বললো, “তাহলে?” একটু ভেবে নিয়ে আবার বললো, “আচ্ছা চল, ভিজিয়ে নেই। তাহলেই তো নরম হয়ে যাবে। দাদুকে দেখিস না? শক্ত বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে নরম করে খায়।” পোড়োবাড়ির পথে পরতো মাত্র একখানা ঘাট বাধানো ছোট একটি পুকুর। ইতি মায়ের কাছে শুনেছিল ওটা নাকি জমিদার বাড়ীর বাসন ধোয়া পুকুর ছিল। বিভা পুকুরে নেমে কচুর পাতায় করে একটুখানি জল নিয়ে এল। তাতে বিস্কুটগুলি মেখে নিয়ে গন্ধ শুকে ইতি বললো, “কী সুন্দর গন্ধ! খুব ভালো খেতে হবে, বল?” —–দেখি।” গন্ধ শুকে বিভা বললো “হু”।


আসবার সময় বিভার মনে আশা জেগেছিল আজ হয়তো ও বাচ্চাগুলোকে একটু ছুঁতে পারবে, খাওয়াতে পারবে। কিন্তু ইতি তখনও তাকে সেই সুযোগটা দিলই না। বিভা বহু ভাবে ইতিকে অনুরো করল, “দেনা একটু , একবার মাত্র।” কিছুতেই কোন কাজ হল না। ইতির নিয়ে যাওয়া অতি মজার খাবারটি (ইতির মতে) চোখ না ফোঁটা পাখির বাচ্চা গুলো স্বাভাব সুলভ আচরণে গপগপিয়ে গিলে নিল। খানিকটা বাঁকী থাকতেই বাচ্চা গুলো নিজে থেকে আর মুখ খুলছিল না। ইতি কিন্তু ছাড়বার পাত্রী নয়। সে জোড় করে মুখ হা করিয়ে সবটুকু খাবার গিলিয়ে তবে ছাড়ল।
বিভার কোন অনুরোধেই যখান কোন কাজ হল না তখন সে প্রচন্ড রেগে গেল। সে ভীষণ ভাবে চাইছিল ইতির এই আবিস্কারের অহংকারকে চূর্ণ করে দিতে, আনন্দটাকে মাটি করে দিতে। নিরুপায় মানুষের শেষ ভরসার জায়গা মাঁ কালী (বাড়ীতে প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দির) এ সত্যটা সে পরিবার থেকে শিখেছিল। আজ তারই প্রতিফলন ঘটলো। সে দুহাত তুলে মা ঁকালীকে উদ্দেশ্য করে বললো, “ হে মা কালী! বাচ্চা গুলো যেন আজ রাতের মধ্যেই মারা যায়। সকালে ও এসে যেন মরা বাচ্চা দেখে, আমি তোমার আসনে দুধ চিনি দিব।” এ ঘটনার পর দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি থেকে শুরু করে হাতাহাতি, চুলাচুলি পর্যন্ত হয়ে গেল। কেঁদে কেঁটে চোখ ফুলিয়ে বাড়ী ফিরল ইতি। বলাই বাহুল্য যে যেমন একসাথে ওরা গিয়েছিল তেমন করে একসাথে আর ফেরা হল না।
রাতে বিছানাতে শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসছিল না ইতির। শুধু কান্না পাচ্ছিল। তার আশঙ্কা হচ্ছিল-মা কালী যদি সত্যি সত্যিই বিভার কথায় শুনে নেয়! শিউরে উঠলো ইতি। সে মনে মনে বিভার কথা না শুনতে মা ঁকালীকে বহু অনুরোধ করলো। দুধ চিনির সাথে ওদের ফজলি গাছের সবচে বড় আমটিও দিতে চাইল। উশ-খুশ করার জন্য মায়ের ধমক খেয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। ভোর রাতের দিকে স্বপ্ন দেখলো-পাখি গুলো ওকে ডেকে ডেকে বলছে,“ইতি দিদি খেতে দাও, খেতে দাও।” আর তিড়িং বিড়িং করে লাফাচ্ছে। এমন সময় ঁমা কালী এসে বাচ্চা গুলির দিকে গুলি ছুরলেন। সংগে সংগে বাচ্চা গুলি লুটিয়ে পড়ল। গুলি থেকে প্রচন্ড শব্দ আর আলোর ঝলকানি বের হচ্ছিল। শব্দে ইতির ঘুম ভেঙে গেল। জেগে দেখল মূষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে আর সাথে প্রচন্ড বজ্রপাত। বৃষ্টির কারণে ভোরের দিকটায় সবারই ঘুমটা এটে বসেছিল। ঘুম ভাঙতে বেশ খানিকটা দেরী হয়ে গেল ইতির। ঘুম ভাঙতেই তার মনে পড়ল পাখি গুলোর কথা। ছুটলো পোড়া বাড়ির দিকে। আশংকায় বুকটা দুপ্ দুপ্ করছিল। বিভা বাদে অন্য বন্ধুদের বাড়ী উল্টো দিকে। ওদের সাথে নিতে গেলে অনেকট দেরী হয়ে যাবে। অতটা দেরী করার ধৈর্য্য ইতির ছিল না। একাই ছুটলো ও। আজ আর কোন ভয়ই তাকে রুখতে পারলো না। একা একাই সে বিপদ সংকুল পথ পেরিয়ে দোতলার ছাদে উঠে গেল। মা পাখিটা বাসাতেই ছিল। ইতির পায়ের শব্দ পেয়ে উড়ে গেল। দুরু দুরু বুকে কাছে এল ইতি। তাকাতে ভীষণ ভয় হচ্ছিল ওর। যদি বিভার কথাটাই সত্যি হয়ে যায়! পাখি গুলোর দিকে তাকিয়ে প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেল মেয়েটা। যা আশঙ্কা করেছিল তাই ঘটেছে। বাচ্চা গুলো কেমন নেতিয়ে পরে আছে! ও কতবার বাসার কাছে মুখ দিয়ে টিস—-, টিস—– শব্দ করলো, কিন্তু বাচ্চাগুলো কিছুতেই আর সাড়া দিল না। সে মা ঁকালীকে কতবার কত ভাবে দোষারোপ করলো। সিঁড়ি বেয়ে খানিকটা নেমে এসে ভুল হতে পরে ভেবে আবার ফিরে গিয়ে দেখলো কিন্তু কোন ভাবেই ওরা যখন আর সাড়া দিল না, তখন বিভার সাথে কঠিন আড়ি দেওয়ার সংকল্প নিয়ে বাড়ী ফিরলো ইতি।
আড়িটা সত্যিই খুব কঠিনই হয়েছিল। প্রায় মাস দু’য়েক হয়ে গেল ইতি বিভার ছায়া পর্যন্ত মারায়নি। বিভা এত সুন্দর পাখির বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলেছে-এত বড় খারাপ কাজ করেছে-ওর সাথে তো কথা বলা চলেই না। বন্ধুদেরও তাই মত। সবাই ইতির পক্ষ নিল।

ইতির বাবা চাকুরির প্রয়োজনে বাইরে থাকতেন। বাড়ীতে এসে বিষয়টি লক্ষ্য করলেন-বিভাকে কেউ খেলায় নিচ্ছেনা, কথা বলছে না। কারণটা জানতে চাইলে ইতি বললো, “আড়ি। ——-কেন আড়ি দিয়েছো?”
ইতি তখনও পাখিগুলোর শোক ভুলতে পারেনি। বাবার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কেঁদে কেটে বুক ভাসালো। বাবা ইতিকে শান্ত করে বললেন, “কাল তোমার বন্ধুদের ডেকো, সবাইকে চকলেট খাওয়াবো।” বন্ধুদের চকলেট খাওয়ানোর আনন্দে ইতি ভুলে গেল সব কষ্ট।
পরদিন বিকেলে ইতির বন্ধুরা এল। বাবা বিভাকেও ডেকে নিয়ে সবাইকে চকলেট দিলেন। তারপর সবাইকে কাছে বসিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, বিভা পাখিগুলোর মৃত্যু কামনা করেছে-এটা অন্যায় আর নিষ্ঠুরতাও বটে। মনে রাখবে, সকল জীবকে ভালবাসতে হবে। জীবকে ভালবাসলে ঈশ্বরকেই ভালবাসা হয়। তাই কোন জীবের সাথেই কখনও খারাপ কিছু করবে না। কিন্তু আসল সত্যিটা হলো এই যে, তোমাদের পাখির বাচ্চাগুলোর মৃত্যুর জন্য বিভা কিন্তু দায়ী নয়; দায়ী পুরোটাই ইতি।” ইতির বন্ধুরা কেউই এ কথাটি বিশ্বাস করতে পারল না। একবাক্যে বলে উঠল, “না, না।”


বাবা বললেন, “হ্যাঁ, এটাই সত্যি। ইতি সেদিন বিকেলে পাখিগুলোকে যা খাইয়েছিল তা মানুষের প্রিয় খাবার হতে পারে, কিন্তু পাখিদের নয়। তাছাড়া এতটাই বেশি পরিমাণে খাইয়েছিল যে, পাখির বাচ্চা গুলো তা হজম করতে পারেনি-তাই মারা গেছে। এতে ঁমা কালীর কোন হাত ছিল না। বিভা পাখিগুলোর মৃত্যু কামনা করেছে সেটা অবশ্যই দোষের কিন্তু এতে কিন্তু পাখি গুলোর মৃত্যু হতো না। ঁমা কালী কারও অন্যায় আব্দার রক্ষা করেন না। ইতি পাখিগুলোকে ভালবেসেছে-এটা খুব ভাল গুণ। কিন্তু অতিরিক্ত ভালবাসতে গিয়ে যা করেছে তাতেই পাখিগুলোর মৃত্যু ডেকে এনেছে। কাউকে ভালবাসলে তার কীসে ভাল হয় সেটাই করতে হয়, আর সেটা করতে হলে সেটা জেনেও নিতে হয়। যেমন ইতি কিন্তু পাখিগুলোর ভালটাই করতে চেয়েছে কিন্তু কীসে তাদের ভাল হয় আর কীসে তাদের মন্দ হয় সেটাই জানতো না। আসলে এত কিছু জানাও তো সম্ভব নয়, তাই সবচে ভাল কী জান?” সবাই বললো, “কী?”
“সবচে’ ভাল হল এই সুন্দর জীবগুলোকে ওদের মতই থাকতে দেয়া, কোন রকম বিরক্ত না করা” সবাই নির্বাক হয়ে শুনছিল কেউ মুখে কোন কথা বললো না শুধু ঘার কাত করে সম্মতি জানাল। ইতির বাবা আবারও বললেন, “বিভার যখন কোন দোষ নাই তাহলে ওর সাথে তো আর আড়ি রাখা ঠিক না। না কি তোমরা কী বল?” সবাই বললো “তাইতো।”
ইতি নিজের ভুল বুঝতে পেরে কান্নায় ভেঙ্গে পরল। বন্ধুদের অনুরোধে বিভার সাথে আড়ি ভেঙ্গে দিল। কিন্তু দীঘদিন পর্যন্ত ওর সাথে স্বাভাবিব হতে পারেনি। আজও জীবনের পড়ন্ত বেলায় দায়িড়ে সে ভুলের কাঁটা ইতির অন্তরতলে খচ্ খচ্ করে বিধেঁ।

লেখিকা- অমিতা রাণী সাহা, প্রধান শিক্ষক, রাজাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরাট, রাজবাড়ী।

(Visited 203 times, 1 visits today)