“নারীদের সফল হওয়ার মুলমন্ত্র” : লেখিকা- আয়েশা সিদ্দিকা শেলী –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

সফল হওয়া সহজ কাজ নয়। নারী বা পুরুষ যেকোন মানুষের জন্যই কঠিন কাজ সেটি। একজন নারীর জন্য সেটা আরো কঠিন। আর যখন নারীটি পরিবার কিম্বা বন্ধু কিম্বা স্বজন কারো সহায়তা পান না তখন তার সাফল্যের যাত্রাটি কঠিনতর হয়ে যায় । কিন্তু তারপরও থেমে যাওয়া যাবেনা এবং নৈতিকতার আদর্শকে ত্যাগ করা যাবেনা । নৈতিকতা বজায় রেখে যে সাফল্য তার কোন তুলনা নাই। নীতি আদর্শ বিসর্জন দিয়ে যারা সমাজে সফলতা অর্জন করে তাদের সামাজিক ভাবে বয়কট করা উচিত এবং প্রকৃত সফল নারীদের স্বীকৃতি দিতে হবে যাতে তরুন প্রজন্মের নারীরা ন্যায় , নীতি আর আদর্শকে গ্রহন করে সমাজে সফল হবার স্বপ্ন দেখে । সফলতার কয়েকটি মূলমন্ত্র অনুসরণ করতে পারলে তা যে কাউকে সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করবে।

১. সবার আগে নিজেকে গুরুত্ব দিতে হবে –
জীবনের যে ক্ষেত্রেই আপনি সফল হতে চান, আপনাকে নিজের যত্ননিতে শিখতে হবে। যদি আপনি নিজেকে সবচাইতে বেশি গুরুত্ব দিতে না পারেন, তাহলে আপনি জীবনের ভারসাম্য খুঁজে পাবেন না। এক্ষেত্রে নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। পরিবারের দিকে নজর দিতে হবে। পরিবারের সকলের সংগে ভাল সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে ।
এরপর আসবে আপনার সবচাইতে কাছের মানুষেরা, মানে পরিবার ও ঘনিষ্ঠ মানুষেরা। তাদের জীবনের দৈনন্দিন খবরাখবর রাখুন। “যদিও হয়ত রোজ এ কাজটি করা কঠিন, তবু চেষ্টা করুন।”এর পর শুরু করুন নিজের কাজ।

২. সামনে এগিয়ে যাওয়া থামাবেন না –
নিজের জীবনের যে স্বপ্ন কিম্বা সফল হবার যে যুদ্ধ তা থেকে কখনো সরে আসা যাবেনা কিম্বা থেমে যাওয়া যাবেনা। একজন পর্বতারোহী যখন ওপরে উঠতে থাকেন, তিনি পিছলে পড়েন, দুই তিন ধাপ নিচে নেমে যান। কিন্তু ওপরে ওঠা থামান না তিনি।
যখন সে পিছলে পড়ে তখন কিন্তু সে ওপরে ওঠা থামিয়ে দেয়না । তেমনি ভাবতে হবে আমি, কোনদিন থামব না এবং আমি আমার লক্ষ্যে পৌঁছে যাব একদিন । জীবনে অনেক বাঁধা বিপত্তি হতাশা অনেক কিছু আসতে পারে। প্রিয়জন হারিয়ে যেতে পারে কেউ সাহায্য না করতে পারে এমনকি শুধু বিরোধিতা করতে পারে তারপরও থেমে থাকা যাবেনা । মানুষ আপনাকে মারতে পারবে, অত্যাচার চালাতে পারবে। কিন্তু আপনার বিশুদ্ধ আত্মাকে আর এগিয়ে যাবার চেতনাকে কেউ শেষ করে দিতে পারবে না কিম্বা ধ্বংস করতে পারবেনা।

৩. অন্যরা কী ভাবছে তা ভাবার দরকার নেই –
অন্যরা আপনার সম্পর্কে ভাবছে কিম্বা কি মন্তব্য করছে সেটি পাত্তা দেবার কোন দরকার নেই।কারণ নিজের সম্পর্কে আপনার যে ধারণা তা অন্যের অনুমোদনের ছাড়াই আপনি বিশ্বাস করতে পারেন। যেমন আমি ভাবি না অন্যেরা আমার সম্পর্কে কী ভাবছে। আমি আমার নিজের চেহারা পছন্দ করি, কিন্তু আরো বহু মানুষ আমার চেহারা কিম্বা মতামত পছন্দ নাও করতে পারে । তাতে আমার কিছু যায় আসেনা । কারন আমি আমার সৎ উপার্জনে পথ চলি এবং নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি । আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি, আমাকে কেমন দেখায় সেটা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং আমার কাজ এবং আমার বিশ্বাস যা আমাকে পথ দেখায় সেটি বেশী গুরুত্বপুর্ন । আমার কাজ এবং আমার পরামর্শ যদি কারো জীবনে এতটুকু ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে তবে আমি কৃতজ্ঞ হই । আমার বন্ধু বা যারা আমাকে ভালোবাসে তাদের কাছেও সেটা ততটা বড় ব্যপার না। কর্মই আসল এবং সৎ কর্মই মানুষকে পুরস্কৃত করে এটা মনে রাখা জরুরী বলে আমি মনে করি। অন্যের মতামত পাবার জন্য কোন কাজ করলে সেটি কোন ভাল ফল বয়ে আনবেনা।

৪. দৃষ্টিভঙ্গি বদলান –
অনেক সময়ই কোন খারাপ মুহূর্তে আমরা ভাবি আমরা শেষ হয়ে গেছি বা আমরা ডুবে গেছি । আমরা মনে হয় উঠে দাঁড়াতে পারবনা । আমরা মনে করি অন্তহীন এ দুর্গমতা। কিন্তু সেটা অন্যভাবে ভাবা যায়, যেমন আমরা ভাবতে পারি নতুন কোন কিছুর বীজ বোনা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রতিটি প্রতিকুলতার মাঝেই আসলে সফলতার বীজ নিহিত থাকে । প্রতিটি নারীর স্থির বিশ্বাস থাকতে হবে । তাকে আসলে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে নিজের জীবন বা ভবিষ্যত সম্পর্কে কেমন মনোভাব পোষণ করেন। সবকিছু ইতিবাচকভাবে দেখার অভ্যাস করা দরকার আমাদের।ইতিবাচক মনোভাবই জীবন বদলে দিতে পারে ।
দৃষ্টিভঙ্গি বদলিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেখুন ব্যর্থতা দরজা দিয়ে পালিয়ে যাবে । “ ডুবে যাওয়া বা বীজ বোনা— “একটি পানির নিচে হচ্ছে আর অপরটি মাটির নীচে হচ্ছে । ”ডুবে যাওয়া বা বীজ বোনা— “একটি পানির নিচে হচ্ছে আর অপরটি মাটির নীচে হচ্ছে । কিন্তু দুই ক্ষেত্রে দুই রকম মানে হয়, একটায় অত্যন্ত নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায়। অন্যটায় ইতিবাচক একটা মনোভাব বোঝা যায়, যা আমাদের চিন্তা প্রক্রিয়ায় ছাপ ফেলে।”আমার জীবনে এমন অনেক মুহূর্তআছে যখন আমার মনে হয়েছে আমি হেরে যাচ্ছি কিম্বা আমার জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে , কিন্তু সেসব মুহূর্তেই আবার আমি নতুন করে সব শুরু করেছি।নিজের স্বাস্হ্য নিয়েই যখন ভাবি তখন মনে হয় আমার মত অনেক নারী হতাশার গহ্বরে ডুবে আছে কিন্তু আমি স্তন ক্যান্সারকে রুখে দিতে এবং স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত নারীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়েছি ।

৫. ইতিবাচক মানুষের চারপাশে থাকুন –
কারো চারপাশে যদি ইতিবাচক মানুষ সব সময় থাকে, তাহলে নিজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা ব্যর্থতা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকার কথা নয় তার। আমাদের চারপাশে এমন মানুষদের রাখতে হবে যারা আলো ছড়ান চারপাশে, যারা অন্যকে হীনমন্যতায় ডুবিয়ে দেন তাদের নয়।যারা মানুষের আশা জাগানোর বাতিটি সবসময় জ্বেলে রাখেন । যারা সব সময় সব পরিস্থিতিতে ইতিবাচক থাকেন, সব কাজ ‘পারব’ বলে রাজি হয়ে যান ও সেটা পাবার জন্য নিজের সেরাটা দেন এমন মানুষ সমাজ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারেন । যারা নিজেরা পজিটিভ এনার্জিতে ভরপুর থাকেন, তারা অন্যকেও উৎসাহ দিতে পারেন। যদি নারীরা উন্নতি করতে চান, তাহলে যারা মনমরা থাকেন বা অহমপূর্ণ আচরণ করেন তাদের থেকে দূরে থাকুন। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ গুলো আপনার মাঝে ইতিবাচকতার বীজ বপন করে দেবে । ইতিবাচক মানুষের পাশে থাকুন এবং তাদের কাছে রাখার চেস্টা করুন ।

৬. মাথা খাটান –
যে কোন পরিস্থিতিতে নিজের বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করতে হবে । আমরা কোথায় যাব জানি না, আমাদের জীবনে কী ঘটবে তা আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের মাথার ভেতরে কী আছে সেটা যেমন আমরা জানি কিন্তু অন্যরা জানে না, তেমনি সেটা কেউ ছিনিয়ে নিতেও পারবে না।তাই নিজের মস্তিস্ককে বিশ্বাস করতে হবে এবং সেটির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে । আমরা ভাই বোনেরা ঢাকায় এসেছি শূন্য হাতে, বড় ভাইবোনরা প্রতিষ্ঠিত ছিল কিন্তু তাদের কাছে তেমন সহযোগিতা পাইনি । বাবা মারা গিয়েছিলেন ইন্টারমিডিয়েড পড়ার সময় । অনেক পড়ালেখা করতাম । বেশী পড়ার জন্য মা বাবা ভাই বোনের কটাক্ষ আর কটুক্তি শুনেছি । সংসারের কাজে হাত লাগাইনা কেন । কিন্তু আমি কারো কথায় পড়ালেখা থেকে সরে আসিনি । পড়ালেখা করার জন্য অনেক কস্ট সহ্য করেছি । কিন্তু দেখুন আমি এই দেশের সবচেয়ে নামী বিশ্ববিদ্যালয় – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স নিয়ে স্নাতক পাস করেছি। পারিবারিক অত্যাচার উপেক্ষা করে একটি শিশু সন্তানকে বুকে নিয়ে বিসি এস পরীক্ষা দিয়ে কৃতকার্য হয়েছি । তাই আমি সব নারীদের বলি মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মাথা খাটানোর ক্ষমতা। নিজের মস্তিস্ককে অযথা ফেলে রাখবেন না । নিজের মাঝে যে প্রজ্ঞা বা জ্ঞান বিরাজমান সেটির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলেই সফল হওয়া যায় ।মস্তিস্ককে সবার আগে গুরুত্ব দিন।

৭. নিজেকে মাঝে-মধ্যে ছুটি দিন –
মানুষ সব সময় একই রকমভাবে সফল হবে না, সেটা সম্ভব নয়। আর সবসময় সফল না হতে পারলে মুষড়ে পড়ার কিছু নেই। আমাদের বাচ্চাদের সব সময় শেখানো হয় আমাদের সবকিছু পারতে হবে। আমাদের সব সময় সৃষ্টিশীল হতে হবে। কিন্তু আমাদের তো বিশ্রাম আর নতুন করে ভাবার জন্যেও সময় চাই।নিজের ভেতরকার শূণ্যতা পূরণের জন্য সময় দরকার একজন মানুষের, সেই সাথে নিজের কাজকর্ম মূল্যায়নের জন্যেও তো অবসর লাগে।সেটা দিনের শেষে পাঁচ মিনিট সময় হতে পারে, আলাদা করে ভাবুন সারাদিনে কী কী কাজ করলেন, কেমন ভাবে করলেন, আরো ভালোভাবে কিভাবে করা যেত। এই সময়ে ফোন ঘাটা বাদ দিয়ে, টিভি না দেখে কেবলই নিজেকে কিছুটা সময় দিন। নিজেকে সময়দিন , নিজেকে ভালবাসুন।

৮. ব্যর্থতা জীবনের শেষ কথা নয়-
কোন কাজে ব্যর্থ হলে ভাববেন না আপনার জীবন শেষ। বরং ভাবুন এটা আপনার জীবনের একটা ‘কমা’ মানে স্বল্প বিরতি, ‘ফুলস্টপ’ – এটি কখনও শেষ নয়। সব সময় নিজেকে বলতে হবে কোনকিছু ‘নেতিবাচক’ হওয়া মানে সেটা ‘না’ হওয়া নয় বরং সেটা হচ্ছে ‘এখন নয়’ কিন্তু পরে হবে। এখন বা এই মুহূর্তে হয়নি বা হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন কিছু কাল হবে না, তার কোন মানে নেই।
জীবনে ভালমন্দ , ব্যর্থতা সফলতা , সুস্হতা অসুস্হতা সবই থাকবে । কিন্তু জীবন থেমে থাকেনা । পৃথিবীর আহ্নিক গতি আর বার্ষিক গতি চলতেই থাকে । তাই কোন কারনেই জীবনের গতি থামিয়ে দেয়া যাবেনা । সৃস্টি কর্তাকে কখনো ভুলে যাওয়া যাবেনা যিনি আমাদের অন্তরে বিবেক রুপে সবসময় বিরাজ করেন ।

তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
এ সমুদ্রে আর কভু হব নাকো পথহারা।
যেথা আমি যাই নাকো তুমি প্রকাশিত থাকো,
আকুল নয়নজলে ঢালো গো কিরণধারা ॥
তব মুখ সদা মনে জাগিতেছে সংগোপনে,
তিলেক অন্তর হলে না হেরি কূল-কিনারা।
কখনো বিপথে যদি ভ্রমিতে চাহে এ হৃদি
অমনি ও মুখ হেরি শরমে সে হয় সারা।

লেখিকা – আয়েশা সিদ্দিকা শেলী, অতিরিক্ত কর কমিশনার, ঢাকা এবং প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান উপদেস্টা, দি বলু স্কাই চ্যারিট্যাবল ফাউন্ডেশন ।

(Visited 137 times, 1 visits today)