“সেই আশ্চর্য সুন্দর চোখ দুটি” –লেখক : ডাঃ সুনীল কুমার বিশ্বাস –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

জীবনে ঘটে যাওয়া কতই না থাকে না বলা কথা না বলা স্মৃতি, তার সাথে থাকে না বলা কত বেদনা আর মধুর গীতি। যে কথা কাউকে কখনো বলা হয়নি লজ্জায় অথবা হয়নি প্রয়োজন, সে কথা বলার জন্য মন কেন হল উতলা; কেন হল আজ উচাটন।
প্রয়োজনেই কি মানুষ মনের কথা বলে,থাকে কিছু কথা- যা বলার জন্য মন হয় আকুল; যা বলতে না পারলে মন হয়ে যায় অস্থির ও ব্যাকুল। স্কুলের গণ্ডি পার হয়ে প্রথম শহরে আসা ভীরু ভীরু আর লাজুক লাজুক মন, মনে ছিল কত আশা আরো কত স্বপ্ন যে রঙিন।
গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধ এখনও লেগে রয়েছে শরীরে, তা হারিয়ে যায়নি শহরের কৃত্রিম গন্ধে পড়েনি ঢাকা আবীরে। ইন্টার ক্লাসে পড়বো বলেই তো শহরে আগমন,
শহরের নামকরা একটি কলেজে ভর্তি হলাম সেদিন। কলেজ ছাত্রাবাসে সিট হলো না, শেষে একটা বড় মেস বাড়িতেই হল থাকার আয়োজন, মেস বাড়িতে থাকার সুযোগ সুবিধা তেমন না থাকলেও সদস্য ছিল ৪০জন। মেসবাড়ি হতে কলেজের দূরত্ব খুব বেশি দূর নয় বড়জোর এক কিলোমিটার, গ্রামের ছেলে আমি হাঁটতে অভ্যস্ত ছিলাম তাই অত টুকু পথ হাঁটতে কোনই সমস্যা হতো না আমার।


প্রতিদিন একই সাথে কলেজে যাই পায়ে হেঁটে বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে, তাদের মধ্যে দুইজন মেয়ে বন্ধু ছিল আমাদের দলে। মেয়ে দুজন কোন দিকে তাকাতো না চলত আপন-মনে, যদি তারা থাকতো সামনে, আমরা ছেলেরা থাকতাম পিছনে। এমনি করেই চলছিল দিন হঠাৎ একজোড়া ডাগর চোখ পড়ে আমার চোখের উপরে,
হঠাৎ লজ্জায় লাল হয়ে যায় মুখটি তাহার,চোখ ফিরায়ে নেয় তাড়াতাড়ি করে। প্রতিদিন একই পথে চলছি মোরা সাথে থাকত সেই দুটি মেয়ে, কারো সাথে কারো কথা নেই অজানা লজ্জা কিংবা ভয়ে। আবার একদিন সেই আগের জনের সাথে হয়ে যায় চোখাচোখি কিভাবে, লজ্জায় চোখ দুটি ঘুরিয়ে নেয় যেন কিছুই হয়নি এমনি ভাবে। নাম না জানা বন্ধু মোরা হয়নি পরিচয়, মুখে কথা না হলেও চোখে চোখে হয়। মেয়ে দুটি থাকতো মেস বাড়ি কাছাকাছি কোন বাড়ীতে হয়ত হবে, সে কথাটি ও জানা হয়নি কারন হয়ত না জানাই রয়ে যাবে। তবুও চলার পথে হঠাৎ করে হয়ে যায় চোখাচোখি, চোখ শুধু নয়কো সেটা ছিল যেন কাজল ভ্রমর চোখ, আমিও চেয়ে দেখি। এমন হলো যে পথে কিংবা ক্লাসে সেই চোখের উপর পড়বেই আমার চোখ, বেশিক্ষণ নয় দেখি শুধু মাত্র এক পলক যদি সে তাকায় ক্ষণিক।
কোনদিন কারো সাথেই কারও হয়নি কথা বলাবলি, মুখে কথা না হলেও চোখে চোখে হয় কত কথা চালাচালি।


কলেজের নিয়ম হয়েছিল এমন যে ছেলেদের সাথে মেয়েদের কথা বলা বারণ, সবার মনে একটাই ভাবনা যদি কেউ কিছু মনে করে বন্ধুরা যদি ক্ষ্যাপায় এটাই কারন। পরীক্ষা এলে যেন সবার বুকের মধ্যে শুরু হয়ে যায় ডিবডিবানি কোন এক অজানা আশঙ্কায়, পরীক্ষা হয়ে গেল এর মধ্যে কারো সাথে কারো হয়নি দেখা,
হয়তো আর কোনদিন দেখাই হবে না মনটা হয়ে গেল ফাঁকা। অবশেষে প্রাকটিক্যাল পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল-শেষ পরীক্ষা ছিল রসায়ন, পরীক্ষা শেষে ল্যাবরেটরী হতে বের হচ্ছি সামনেই অপেক্ষা করছিল সেই দুটি নয়ন, প্রথমে সেই আমাকে জিজ্ঞাসিল পরীক্ষা কেমন হলো? জবাবে আমিও বললাম হয়েছে মোটামুটি ভালো।
ব্যাস দুই বছরে শুধু এতোটুকু কথা অথচ আমরা ছিলাম একই ক্লাসের ছাত্র, দুই বছরে শুধুই হয়েছে চোখাচোখি আর দেখাদেখি মাত্র। যৌবনের পাঁপড়িগুলো তখনো হয়নি প্রস্ফুটিত মোদের, তাই এর বেশি কথা বলা আর হয়ে ওঠেনি আমার কিংবা তার। তারপর পরীক্ষার ফল বের হলে সবার মধ্যে ছোটাছুটি শুরু হয়ে যায়, নতুন পথের সন্ধানে কেউবা মেডিকেলে,কেউবা প্রকৌশলে,কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার হলো মেডিক্যালে তার কোথায় হয়েছিল জানিতে পারি না হায়! তার সাথে আর দেখা হয়নি সারাটি জীবন ভর এমনি করে সে হারিয়ে যায়।


৫১টি বছর পর হঠাৎ তার কথা কেন মনে পড়িল বসন্তের এই মায়াবী সন্ধায়? তার সাথে যদি সত্যিই আবার দেখা হয়, নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসিবে এতদিন ছিলেন কোথায়? নগর বন্দর সাগর-মহাসাগর পাড় হয়ে ভ্রমেছি কত দেশ কত প্রান্তর, তার মত ভ্রমর কাজল আশ্চর্য সুন্দর চোখের দেখা কোথাও পাইনি আর!!!

০৩/০৪/২১
রাজবাড়ী।

(Visited 63 times, 1 visits today)