“যেভাবে দেখেছি আয়শা খানমকে” – লাইলী নাহার –

রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

২০২১ সাল নতুন বছর। ভেবেছিলাম নতুন উদ্দিপনা নিয়ে শুরু করবো পথ চলা। ৯ দিন বাড়ির বাইরে ছিলাম। ১লা জানুয়ারী দীর্ঘ ১৮ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে রাত ৩টায় বাড়ী ফিরলাম। সকাল ৮টায় ফোন পেয়ে ঘুম ভাঙ্গলো। ভ্যকুলো। কোন সুখবর নয় বরং কঠিন অকল্পনীয় এক দুঃসংবাদ। “আমাদের সকলের প্রাণ প্রিয় আয়শা আপা আর নেই।” স্তব্ধ হলাম। মুহুর্তেই বিদ্রুপ করলো আমাকে ৯ দিনের ওই “আনন্দ ভ্রমন’। সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা পাশাপাশি থাকে জানি। কিন্তু আমার জন্য এই আনন্দ এই বেদনা মিশে গেলো একাকার হয়ে। স্মৃতিতে ভেসে উঠলো পরিপাঠি বেশবাসে অনন্য অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব “আয়শা খানম”।

১৯৬৯ সালে আমি ঢাকা ভার্সিটিতে মাষ্টার্স এ ভর্তি হয়েছি মাত্র। কয়েকদিন পরে রোকেয়া হলে অবস্থান নিয়েছি। কিন্তু এক বছরের মাথায় বাংলাদেশের যুক্তি যুদ্ধের করেনে আমাকে হল ছেড়ে বাড়ী ফিরতে হলো। যোগাযোগ বিছিন্ন হলো। কিন্তু ঐ অল্প দিনেই আয়শা আপার মৃদু মধুর বাক্য, সিগ্ধ সুন্দর অবয়ব, নির্লোভ, নিরঃস্কর মার্জিত ভদ্র রুচিশীল ব্যক্তিত্ব, কবিতা পড়া সেই বনলতা সেনের মত জীবন আনন্দ হয়ে সংসারে সমাজে সবখানে আজও তিনি প্রকশিত হন।” তিনি বলতেন নারীবাদ হচ্ছে একটা নকশী কাঁথা, সবাইকে এখনে বুনে যেতে হবে কিছু না কিছু দাগ রাখতে হবে সবাইকে। “আমি একা পারবো না,তুমিত একা পারবে না”। তিনি আরো বলতেন এই আন্দোলন হচ্ছে মশাল হাতে রিলে রেসের মত। একজনের হাত থেকে, অন্য জনের হাতে।


নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে তিনি এক জন পরিক্ষিত সফল সংগঠক। তিনি বুঝেছিলেন নারীর অগ্রগতিই সমাজের অগ্রগতি। সারা বিশ্বে, পূর্ব কি পশ্চিমে সমাজ বিকাশের ধারায় মানবাধিকার ও ক্ষমতায়ানের সংগ্রাম একই শ্রোতে বহমান। সেই একই ধারায় নারী পরুষের সমান অংশগ্রহন ও সমান সুযোগ অর্জনের জান্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে আয়শা সক্রিয়, অভিজ্ঞ ও বলিষ্ঠ এক শীর্ষ স্থানীয় নেত্রী। চিন্ত চেতনা বিশ্লেষনের অগ্রণী সংগঠক হিসেবে তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি হিসাবে দীর্ঘকাল আঞ্চলিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সকল পর্যায়ে নানান কর্মসূচীতে সফল ভ’মিকা রেখেছেন যায় চির অনুস্বরনীয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েও তিনি বসে থাকেন নি। সংগঠনের এবং নারী আন্দোলনের স্বার্থে নিজেকে শেষ দিন পর্যন্ত নিবেদিক করেছেন। তার চলে যাওয়া, নারী সমাজ এবং সংগঠনের জন্য অপূরনীয় ক্ষতি। তার বিকল্প কাউকে মনে করতে পারি না। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।


মুক্তিযুদ্ধের তিন দশক পরে আবার দেখা পেলাম আমার সেই পছন্দের প্রিয় আয়শা আপকে। রাজবাড়ীতে এসেছিলেন জেলা শাখার সম্মেলনে। আমি তখনও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুক্ত হই নাই। এ্যাডঃ দেবাহুতি চক্রবর্তীর আমন্ত্রণে আমি ঐ সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলাম প্রখন তীব্র স্বরণ শক্তি তার, আমাকে দেখেই চিনেছেন, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ রাজবাড়ী জেলা শাখার সভাপতি এ্যাডঃ দেবাহুতি চক্রবর্তীর আন্তরিক ইচ্ছায় তার হাত ধরেই এই সংগঠনে আমি যুক্ত হয়েছি। দেবাহুতির কাছে কৃতজ্ঞ।
সেই থেকেই সাংগঠনের বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়েই আয়শা আপাকে নিবীড় করে পেয়েছি। উপলব্ধি করেছি, তার জীবন আমাদের কাছে অমূল্য এক ইতিহাস। তার মরন এক বিরল এক কাহিনীর মত।

“হে বিজয়ী বীর জয়ো তব ব্রত”
“ওগো ঘুম ভাঙ্গানিয়া,
তোমায় নমস্কার।
তোমার আত্নার শান্তি কামনায়
নশ্বর এই ধারাধামে দিলাম
শ্রদ্ধার্র্ঘ সহ শেষ বিদায়।

লেখক- লাইলী নাহার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রাজবাড়ী জেলা শাখা।

(Visited 45 times, 1 visits today)