‘রাজবাড়ীর রাজা’ রাজা সূর্য কুমার – লেখক : শিপন আলম –


রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

বাংলার ইতিহাসে যে কয় জন জমিদার জনসেবা ও প্রজাবাৎসল্যের জন্য আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছেন তাদের মধ্যে রাজা সূর্য কুমার অন্যতম। জানা যায় লক্ষ্মীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী জমিদার দীগিন্দ্র প্রসাদ রায়ের কোন সন্তান ছিল না। তাই তিনি আনুমানিক ১৮৪০ এর দশকের শেষে সূর্য কুমারকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। আরও জানা যায়, তিনি দত্তক গ্রহণের নিমিত্তে সূর্যনগরের নিকটবর্তী একটি গ্রাম চরনারায়ণপুরে পালকি প্রেরণ করেন। সূর্য কুমারেরা ছিল দুই ভাই। পিতার নাম ছিল দৈহিক কান্তি। দত্তক হিসেবে নেওয়ার কথা ছিল তার ভ্রাতাকে। কিন্তু সে পালকিতে না উঠলে অগত্যা সূর্য কুমারকে পালকিতে উঠতে হয়। তখন তিনি শারীরিকভাবে বেশ শীর্ণকায় ছিলেন।


রাজা সূর্য কুমার ১৮৬০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে বরিশালের গাভা নিবাসী উমাচরণ ঘোষ দস্তিদারের কন্যা ক্ষীরোদ রাণীকে বিবাহ করেন। তার ছিল দুই শ্যালক- হীরালাল ও মতিলাল। বিবাহের পর তিনি দুই শ্যালককে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এবং পুত্রস্নেহে তাদের লালন পালন করেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই ১৭/১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে ক্ষীরোদ রাণীর গর্ভে কোন সন্তানাদি জন্মায় নি। তাই মনের দুঃখে রাণী তখন রাজাকে পরামর্শ দেন আরেকটি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে। অবশেষে নিজের বংশ পরম্পরা রক্ষা ও আপন এস্টেটের উত্তরাধিকারীর আশায় অনিচ্ছা সত্ত্বেও লক্ষ্মীকোলের নিকটবর্তী গ্রাম ভবদিয়ায় বসবাসরত কুচবিহারের মোক্তার অভয়চরণ মজুমদারের কন্যা শরৎ সুন্দরীকে বিবাহ করেন। কিন্তু সন্তান নামক সোনার হরিণের দেখা তিনি পান নি। তাই ভগ্ন হৃদয়ে স্ত্রীদের পরামর্শে আনুমানিক ১৮৯১ সালে রাজবাড়ীতেই নরেন্দ্রনাথ নামের একটি ছেলেকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথ মেট্রোপলিটন কলেজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া করতেন এবং শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করতে থাকেন। কিন্তু অকস্মাৎ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।


১৮৮৮ সালে রাজা সূর্য কুমার ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্টাচার্য রাজার বাড়িতে লজিং থেকে সূর্য কুমার ও রাণী মাতাদের স্নেহ মমতায় লেখাপড়া করেন। ১৮৮৯ সালে তিনি এ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৮৯৪ সালে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯০০ সালে আরএসকে ইনস্টিটিউটে প্রথমে সহকারী প্রধান এবং পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবে সুদীর্ঘ ৪২ বছর অতিবাহিত করেন। একই সাথে তিনি রাজার এস্টেটের এক্সিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজাকে তিনি অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন। রাজা সূর্য কুমার, রাজার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উৎরাই, রাজার বাড়ির উৎসব, রাজার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, উত্তরাধিকারী মনোনয়ন প্রভৃতি বিষয় তার ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। তার স্মৃতিকথা থেকেই জানা যায়- রাজার দুই শ্যালক এবং পোষ্যপুত্র নরেন্দ্রনাথের সাথে ত্রৈলোক্যনাথের খুব সখ্য ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই রাজবাড়ীতে একটি মঞ্চ দূর্ঘটনায় রাজার শ্যালক হীরালালের মৃত্যু ঘটে। সন্তান না হওয়া, পোষ্যপুত্র ও শ্যালকের অকাল মৃত্যু রাজাকে শোকাচ্ছন্ন করে তোলে। ভগ্ন হৃদয়ে তিনি দেশান্তরী হয়ে কোলকাতায় গমন করেন। দেশান্তরী হলেও রাজবাড়ীর সাথে তার প্রাণের সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছেদ্য।
পোষ্যপুত্র নরেন্দ্রের মৃত্যুর পর রাজা পুরিধামে বসবাস শুরু করেন এবং পুনরায় সন্তান দত্তক গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করেন। রাজা তার রাণীদ্বয়ের পরামর্শক্রমে অত:পর পুরিধামের নিজ বাড়িতে একটি আড়ম্বরপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে শ্রীমান সৌরিন্দ্র মোহনকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন।
যথাসময়ে সৌরিন্দ্র মোহন সাবালক হলে তিনি লক্ষ্মীকোল এস্টেটের উত্তরাধিকারী হন এবং ‘কুমার বাহাদুর’ উপাধি গ্রহণ করেন।
রাজা ভুবনেশ্বরে একখানি বাড়ি এবং ভূ-সম্পত্তি করেন। রাণীদের নিয়ে রাজা বাকী জীবন এখানেই অতিবাহিত করেন। আনুমানিক ১৯১২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায় রাজার শ্রাদ্ধতে এক হাজার ব্রাহ্মণ নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন। রাজার ইচ্ছে অনুযায়ী যেখানে তাকে দাহ করা হয় সেখানে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। আরও জানা যায়, শিবমন্দির নির্মান করতে যত ব্যয় হয় তা রাজিবাড়ীর জমিদারি থেকেই নেওয়া হয়।


মৃত্যুর পূর্বে রাজা তার সম্পত্তির উইল রেখে যান। উক্ত উইলে রাজার দুই রাণী, শ্যালক মতিলাল ঘোষ এবং শ্রী ত্রৈলোক্যনাথকে এস্টেটের এক্সিকিউটর হিসেবে নিযুক্ত করেন। উইলে আরও একটি শর্ত ছিল রাজার মৃতুর পর মতিলাল ও তার স্ত্রী পুত্রগণ (সাবালক না হওয়া পর্যন্ত) মাসোহারা পাবেন। সৌরিন্দ্র কুমারের তখন সাবালক হতে এক বছর বাকি ছিল। ফলে শ্যালক মতিলাল জমিদারি তদারকি করতেন। তবে তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এস্টেটের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ তখন ফরিদপুরের ডিএস-জেএ উডহেড (আইসিএস) এবং রাজার দ্বিতীয় পক্ষের সম্পর্কীয় শ্যালক উকিল অম্বিকাচরণ মজুমদারের সাথে আলাপ করে সৌরিন্দ্র মোহনের হাতে এস্টেটের দায়িত্ব অর্পনের প্রস্তাব করেন। অতঃপর ডিএস- এর সম্মতিক্রমে সৌরিন্দ্র মোহনকে এস্টেটের দায়িত্ব চূড়ান্তভাবে ন্যস্ত করা হয়। অপ্রকৃতস্থ মতিলালকে একপ্রকার জোর করেই বরিশালে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি খুব কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে থাকেন। মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও তিনি সেখান থেকে রাজিবাড়ীতে আসার পর বাঁধান আরেক ঝামেলা। তিনি রাজবাড়ীতে এসে উকিলের সাহায্যে উইলের শর্ত ধরে সৌরিন্দ্রের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাকে ১০,০০০ টাকা প্রদানের মাধ্যমে মামলা তুলে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সৌরিন্দ্র মোহন এস্টেটের মালিক হয়ে জমিদারি পরিচালনা করেন। সৌরিন্দ মোহনের উত্তরাধিকার সৌমিরেন্দ্র মোহন (বেবী) ও সৌমেন্দ্রনাথ (তদ্বীয় পুত্র)।
প্রজাদরদী জমিদার হিসেবে পরিচিত রাজা সূর্য কুমার ছিলেন বিরল গুণের অধিকারি। প্রজার ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করে গেছেন অবিরাম। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তার অবদান চির স্মরণীয়। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাঠাগার। দরিদ্র মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিলেন হাসপাতাল। এছাড়াও যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাট, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ডাকঘর এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মন্দির তৈরি তার প্রজাদরদী মানসিকতারই পরিচয় বহন করে। নিজে বিদ্বান না হলেও বিদ্যার প্রতি ছিল তার অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। গোয়ালন্দ মহকুমার গভর্নমেন্ট সাহায্যকৃত উচ্চ বিদ্যালয়টি পদ্মার ভাঙনে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেলে রাজিবাড়ী উঠে আসে। ফলে তৎকালিন ডিপিআইসিএ মার্টিন সাহেব রাজাকে অনুরোধ করেন বিদ্যালয়টি পরিচালনার। রাজার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানে বিদ্যালয়টি স্থানান্তর করা হয়। কোন একটি কারণে বিদ্যালয়টি পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় রাজা পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগেই রাজা সূর্য কুমার ইনস্টিটিউট (আরএসকে) প্রতিষ্ঠা করেন।
জনসাধারণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজা সূর্য কুমার বর্তমানে যেখানে এসপি ও সিভিল সার্জনের বাসা সেখানে একটি হাসপাতাল স্থাপন করেছিলেন।
সেকালে নিরীহ প্রজাদের ওপর জুলুমবাজ জমিদারদের অত্যাচার, নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার বহু কাহিনী ইতিহাসে লেখা আছে। সুসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন – এর ‘জমিদার দর্পণ’ জমিদারদের সেই নিষ্ঠুরতাকে অবলম্বন করেই নির্মিত হয়েছে। অথচ সেকালের প্রতাপশালী রাজা সূর্য কুমারের বিরুদ্ধে এমন কোন অভিযোগ রাজবাড়ীর কোন মানুষের মুখ থেকে শোনা যায় নি। বিপরীতে তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা, তেজস্বী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোমল হৃদয়ের মানুষ।


প্রতাপশালী ব্রিটিশ লাটের নিকট তিনি মাথা নত করার লোক ছিলেন না। জনশ্রুতি আছে, একবার বড়লাট তার অধীন সকল জমিদারকে তার দরবারে ডেকে পাঠান। সবাই জুতা খুলে দরবার হলে প্রবেশ করলেও রাজা সূর্য কুমার জুতা পরেই ভেতরে প্রবেশ করেন। এতে বড়লাট বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন ‘রাজা’ বটে? প্রকৃতই তিনি ছিলেন একজন রাজা, আমাদের রাজবাড়ীর রাজা।
রাজা সূর্য কুমারের অমর কীর্তির মধ্যে লক্ষ্মীকোলে নির্মিত সুরম্য অট্টালিকা ও পোস্ট অফিস, নিজ জমিদারি সূর্যনগরে প্রতিষ্ঠিত রেলস্টেশন অন্যতম। রাজার বাড়িটি ছিল রাজবাড়ীর ঐতিহ্যের ধারক। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এ বাড়িটি দর্শন করে মুগ্ধ হত। স্বাধীনতার পর এ বাড়িটিতে সংরক্ষিত নানা ঐতিহ্যকে নিয়ে ‘রাজবাড়ী’ শিরোনামে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় এবং টেলিভিশনে কয়েকবার দেখানোও হয়। কিন্তু আমরা এ বাড়িটি সংরক্ষণ করতে পারিনি। বর্তমানে এ বাড়ির অস্তিত্ব নেই। কালের সাক্ষী হয়ে শুধু সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি শতবর্ষী বটবৃক্ষ আর শান বাঁধানো ভরাট পুকুরের স্মৃতিচিহ্ন। প্রতি বছর এখানে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে বৈশাখী মেলা বসে।
রাজা সূর্য কুমার ব্যক্তি হিসেবে ছিলেন আমুদে এবং রসবোধসম্পন্ন। তার আমলেই লক্ষ্মীকোল বৈশাখী মেলা জেলার ঐতিহ্যবাহী মেলায় পরিণত হয়। তার রাজবাড়ীকে কেন্দ্র করেই বসত সঙ্গীত, যাত্রা ও পালাগানের আসর।
নিজে নিঃসন্তান ছিলেন বলে পালিত পুত্র ও শ্যালকদের আপন সন্তানের মতই লালন পালন করতেন। শুধু তাই নয় নগেন্দ্রনাথকে যখন পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন তখন পুত্রের মঙ্গলার্থে তিনি মদ ত্যাগ করেন এবং প্রাসাদ থেকে সকল বাদ্যযন্ত্র, পাখোয়াজ, তবলা, বেহালা প্রভৃতি বন্ধু বান্ধবদের উপহার হিসেবে দিয়ে দেন। এ থেকেই অনুমান করা যায় তিনি পোষ্যপুত্রদের কিরূপ ভালবাসতেন।


এছাড়া জ্ঞান অন্বেষণের নিমিত্তে তিনি নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন সে সময়ের এক সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। বিভিন্ন ধরণের বইয়ের সমাবেশ ছিল সেখানে।
প্রজাবৎসল, জনহিতৈষী, সমাজসেবী ও কল্যাণমূলক কাজের জন্য জমিদার সূর্য কুমার প্রজাদের নিকট হতে ‘রাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। মতভেদ থাকলেও রাজা সূর্য কুমারের নামানুসারে রাজবাড়ীর নামকরণ করা হয় বলে অধিকাংশ জনের মত।
রাজা সূর্য কুমারের বিশাল রাজত্ব ছিল না, বিশাল লস্কর বাহিনীও ছিল না, ছিল না অতিরঞ্জিত শান- শওকতও। ছিলেন ক্ষুদ্র একটি এস্টেটের জমিদার মাত্র। তারপরও অকৃত্রিম জনসেবা ও নিখাঁদ প্রজাবাৎসল্যের কারণে প্রজাগণই তাকে ‘রাজা’ নামে সম্বোধন করতেন। প্রজাকুলের প্রতি অপরিসীম মমত্ববোধ আর প্রজাসাধারণের ভাগ্যোন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ রাজা সূর্য কুমার তাই সময়কে অতিক্রম করে এখনো রাজবাড়ীবাসীর নিকট রাজা নামেই পরিচিত।

লেখক – শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 496 times, 1 visits today)