‘ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন – একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ’: শিপন আলম –


যুগে যুগে যে সকল মহাপুরুষ একটি দেশের শিক্ষা, জ্ঞান সাধনা, বিজ্ঞান সাধনা, গবেষণা সাধনা, ভাষা গঠন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, মুক্তবুদ্ধি চর্চা, ক্রীড়া চর্চা প্রভৃতির মাধ্যমে জাতি ও রাষ্ট্র বিনির্মানে অসামান্য অবদান ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার একজন। আজীবন জ্ঞান সাধনায় ব্রতী এ মানুষটি উদার, ধর্মপরায়ণ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে এখনো সর্বমহলে সমান শ্রদ্ধার পাত্র।

জন্ম ও পৈত্রিক অবস্থাঃ ১৮৯৭ সালের ৩০ শে জুলাই তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার অন্তর্গত কুমারখালি থানার বাগমারা গ্রামে (বর্তমানে রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের কাজীপাড়া গ্রামে) মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম কাজী গওহর উদ্দীন এবং মায়ের নাম তসিরুন্নেসা। কাজী পদবী তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকারসূত্রে। তাদের বংশপরিচয়সূত্রে বলা হয়েছে, প্রায় তিন শতাব্দী মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে তাদের একজন পূর্বপুরুষ ধর্মীয় উপদেষ্টা এবং বিচারক (কাজী) পদে নিযুক্ত ছিলেন, সেই সূত্রে তাদের বংশগত পদবী হয়ে গিয়েছিল ‘কাজী’। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তার পিতা প্রথমে সেটেলমেন্ট (ংবঃঃষবসবহঃ) আমিন, পরে হেড আমিন এবং শেষে আমিনদের ইন্সপেক্টর হয়েছিলেন। কাজের ছুটিতে তিনি বাড়ির পাঠশালায় শিক্ষকতা ও গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সৎ ও কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান। ফলে দারিদ্য কখনো তার পিছু ছাড়েনি। জমি জরিপের কাজ করে যে সামান্য অর্থ উপার্জন করতেন তাই দিয়ে নিজেদের এবং আট ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও ভরণপোষণ চালাতেন। তবে অর্থের দারিদ্র্য থাকলেও পরিবারটির বিদ্যার দারিদ্য ছিল না।

শিক্ষা জীবনঃ কাজী মোতাহার হোসেন ছোট বেলা থেকেই প্রখর স্মৃতিশক্তি আর তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী ছিলেন। বাগমারা নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে তিনি নিজ গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে ১৯০৭ সালে সেনগ্রাম এম ই (গরফফষব ঊহমষরংয) স্কুলে ভর্তি হন। তিনি ১৯১১ সালে কুষ্টিয়া হাই ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৬ সালে অনুষ্ঠিত প্রবেশিকা পরীক্ষায় (বর্তমানে এসএসসি) পূর্ববাংলা আর আসামের মিলিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে ১৫ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হন। এখানে বলে রাখি, ছাত্র জীবনে তিনি সকল বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি প্রাপ্ত হন। মাধ্যমিক জীবন শেষে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি হন। কিন্তু কলেজের পরিবেশ পছন্দ না হওয়ায় তিনি দ্বিতীয় বর্ষ থাকা অবস্থায় রাজশাহী কলেজে চলে আসেন। ১৯১৭ সালে সেখান থেকে বিজ্ঞান শিক্ষা শাখায় প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে মাসিক কুড়ি টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হন। ১৯১৭ সালে উচ্চতর শিক্ষার জন্য সেসময়ের নামকরা কলেজ ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৯ সালে বিএ অনার্স পরীক্ষায় পূর্ববঙ্গ ও আসাম অঞ্চলে আবারও প্রথম হয়ে ৩০ টাকা বৃত্তি লাভ করেন যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় এক লক্ষাধিক টাকা কারণ তখনকার দিনে এক ভরি স্বর্ণের দাম ছিল মাত্র ১৫ টাকা। সেই হিসেবে ৩০ টাকায় দুই ভরি স্বর্ণ পাওয়া যেত।
তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্স আর সহযোগী বিষয়ে বিজ্ঞান পড়লেও আবশ্যিক বিষয়ে বাংলা ও ইংরেজি এবং বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়েছিলেন বলে ডিগ্রিটা বিএসসি না হয়ে বিএ হয়েছিল। তখন ব্যবস্থাটা এমনই ছিল। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে এম এ পাশ করেন। তিনি বৃত্তির টাকা নিজে খরচ না করে বাবার চিকিৎসার কাজে ব্যয় করেন।

সংসার জীবনঃ ছাত্রজীবনের প্রান্তে এসে ১৯২০ সালে হুগলির মেয়ে কলকাতা নিবাসী সাজেদার সঙ্গে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সাজেদা বেগম সুশিক্ষিতা, মার্জিত ও রুচিশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তার বাসায় বাংলার চেয়ে উর্দুর চল বেশি ছিল। তিনি খুলনার মেয়ে মোসলেমার প্রভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারানী’ ও ‘যুগলাঙ্গুরীয়’ উপন্যাস দুটি উর্দুতে অনুবাদ করেন।
কাজী দম্পতির ছিল সাত ছেলে, চার মেয়ে। এদের মধ্যে দুই ছেলে স্কুল জীবনেই মৃত্যবরণ করেন। জীবিত ছেলে-মেয়েরা সবাই সুশিক্ষিত এবং নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। মেয়েদের মধ্যে জোবায়দা কর্মজীবনে ইংরেজির অধ্যাপিকা ছিলেন। মেঝ কন্যা ওবায়েদা সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। অন্য মেয়েদের মধ্যে ড. সনজিদা খাতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার প্রফেসর। তিনি একই সাথে রবীন্দ্র শিল্পী ও রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ। তিনি ছায়ানটের সভাপতি। আর এক মেয়ে ফাহমিদা খাতুন ময়মনসিংহ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা এবং রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী। ছোট মেয়ে মাহমুদা চিত্রশিল্পী ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী। ছেলে কাজী আনোয়ার হোসেন জনপ্রিয় থ্রিলিং মাসুদ রানা সিরিজের লেখক ও রহস্য পত্রিকার সম্পাদক এবং সেবা প্রকাশনীর স্বত্তাধিকার। ছোট ভাই কাজী মাহবুব হোসেনও ইংরেজি এডভেঞ্চারের অনুবাদক হিসেবে পরিচিত।

কর্মজীবনঃ ১৯১৯ সালে দৌলতপুর মোহসিন স্কুলে মাসিক ২০ টাকা বেতনে শিক্ষকতার চাকরি নেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার ফলাফল বের না হওয়ায় তিনি সেখানে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রদর্শক হিসেবে যোগ দেন। পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে তিনি প্রভাষক পদ লাভ করেন। ১৯২৩ সালে সহকারী প্রভাষক পদে উন্নীত হন। ১৯৩৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে এমএ পাশ করেন। পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত ও পরিসংখ্যান এই তিন বিভাগেই তিনি শিক্ষকতা করেন। পদার্থ বিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে তিনি কোয়ান্টাম তত্ত্বের বোসন পার্টিকেল বা বোস তত্ত্বের আবিষ্কারক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগ পুনর্বিন্যস্ত হয়ে গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগ গঠিত হলে তিনি এর রিডার ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৫০ সালে ডিজাইন ডিজাইন অব এক্সপেরিমেন্টাল বিষয়ে গবেষণার জন্য পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এই গবেষণা কর্মের অন্যতম পরীক্ষক স্যার রোনাল্ড ফিসার তাঁর গবেষণা কর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেন। এ গবেষণা কর্মের মাধ্যমেই তিনি পরিসংখ্যানে ‘হুসেইন চেইন রুল’ নামে এক নতুন পদ্ধতির নির্দেশিনা নিয়ে আসেন। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেন। পূর্ব বাংলায় তথ্য গণিত তথা সংখ্যা তত্ত্বের জ্ঞান সাধনা শুরু হয়। তথ্য গণিত নামটি তার নিজেরই দেওয়া। এদেশের তথ্য গণিতের জনক তিনি। ১৯৫৬ সালে তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ১৯৬১ সালে তিনি নিয়মিত অধ্যাপনার কর্ম থেকে অবসর গ্রহণ করলেও পরিসংখ্যান বিভাগে সুপার নিউমারি অধ্যাপক হিসেবে রয়ে যান। ১৯৬৪-১৯৬৬ মেয়াদে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ এন্ড ট্রেইনিং এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ইমেরিটাস প্রফেসর পদের সম্মান লাভ করেন। প্রবন্ধ সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ১৯৬৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ডক্টর অব সায়েন্স (ডিএসসি) ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা লাভ করেন।


ব্যক্তি পর্যালোচনাঃ ড. কাজী মোতাহার হোসেন ব্যক্তিজীবনে একজন আত্মভোলা, বিদ্যানুরাগী, সংস্কারমনা মানুষ হিসেবে দেশে ও বিদেশে পরিচিত ছিলেন। তাঁর আত্মভোলা নিয়ে অনেক গল্প আছে। বড় বড় বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে তিনি ছোট খাটো বিষয় বেমালুম ভুলে যেতেন। তাঁর আত্মভোলার অবস্থা এমন ছিল যে তিনি মাঝে মাঝে নিজের পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারতেন না, নিজের বাড়ির সামনে গিয়ে নিজের বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করতেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তাঁকে নিরহঙ্কার, আপনভোলা, বিদ্বান ও গুণী মানুষ হিসেবে সম্বোধন করেছেন। তিনি এও বলেছেন যে, মোতাহার হোসেনের জীবন থেকে খুব প্রাসঙ্গিক ও খুব জরুরি একটা শিক্ষা পাই যে, প্রকৃত ধর্মচর্চার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের কোন সম্পর্ক নেই।
অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর সম্পর্কে বলেছেন যে, বরাবরই তিনি একজন উদারমনা মুসলমান ও সেই সঙ্গে দেশপ্রাণ বাঙালি এবং সকলের উপর একজন সৎ মানুষ।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আত্মভোলা ও নিরহঙ্কারী এ বন্ধুকে আদুরের সুরে ‘আমার মতিহার’ নামে সম্বোধন করতেন।


সাহিত্য সাধনাঃ শিক্ষক, গণিতজ্ঞ, বিজ্ঞানী, গবেষক, দাবাড়ু এসব ছাপিয়ে তার বড় পরিচয় তিনি একজন সাহিত্যিক ও ক্ষুণে ধরা সমাজের অগ্রগামী পথপ্রদর্শক। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি ছিল তার দূর্বার আকর্ষণ। আর এ আকর্ষণ সৃষ্টির পশ্চাতের মানুষটি হলেন মুক্তবুদ্ধি চর্চার ধারক ও বাহক কাজী আব্দুল ওদুদ। একই গ্রামে বাড়ি হওয়ায় বাল্যকাল থেকেই তারা দু’জন ছিলেন একে অপরের ঘনিষ্ঠ সহচর। ‘কাজী আব্দুল ওদুদ ও তার অবদান’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেছেন-” কলকাতায় থাকতে তিনি (কাজী ওদুদ) আমাকে সাহিত্যিক সভায় নিয়ে যেতেন। সেখানে একটা রীতি ছিল যে, উপস্থিত সবাইকে কিছু না কিছু বক্তৃতা করিতেই হবে।…রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও সত্যেন দত্ত তাঁর প্রিয় লেখক ছিল। সবুজপত্র, প্রবাসী ও পরিচয় পত্রিকাও তার বিশেষ প্রিয় ছিল। এগুলো আমাকে পড়তে দিতেন, আমাকে সাহিত্যে তালিম দেবার জন্য। এতে অবশ্যই আমি উপকার পেয়েছি।” তাছাড়া মুক্তবুদ্ধি চর্চার মস্তিষ্ক খ্যাত আবুল হোসেনের সাহিত্য রশ্মিও পড়েছিল তার ওপর। ‘কর্মপ্রাণ আবুল হোসেন’ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন-” দেখতে দেখতে তার চারদিকে শিষ্য, সমভাবুক ও সমকর্মীরা জুটে গেল। আমার অলস প্রানেও তিনি একটি স্ফুলিঙ্গ নিক্ষেপ করলেন; মাঝে মাঝে যে একটু আধটু সাহিত্য চর্চা করে থাকি, আবুল হুসেনের প্রেরণাতেই তার সূচনা।


কুষ্টিয়া হাই স্কুলে পড়াবস্থায়ই তিনি ‘দামোদরের কন্যা’ শিরোনামে একটি রচনা লেখেন। দৈনিক সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত ‘গ্যালিলিও’ তার প্রথম প্রকাশিত রচনা। বিএ ক্লাসের ছাত্রাবস্থায় ঢাকা কলেজের কলেজ ম্যাগাজিনে ‘সুন্দর’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। এরপর তিনি লেখালেখিতে ধারাবাহিক হন। সাহিত্যিক জীবনের প্রথম দিকে গল্প ও কবিতার দিকে ঝোঁক থাকলেও পরবর্তীতে সামাজিক প্রবন্ধ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৩৭ সালে ঢাকার বাংলাবাজারে অবস্থিত সন্তোষ লাইব্রেরি কর্তক তার প্রবন্ধ সংকলন ‘সঞ্চরণ’ প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর ভূয়িষ্ঠ প্রশংসা পায়। শরৎচন্দ্র, মোহিতলাল মজুমদার, চারুচন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, কাজী আব্দুল ওদুদ- এর ন্যায় প্রমুখ প্রাবন্ধিকও তার লেখার অনুরাগী ছিলেন।


‘নজরুল কাব্য পরিচিতি’ তার প্রকাশিত দ্বিতীয় গ্রন্থ। এটি ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়। মূলত এটি নজরুল ইসলামের বিভিন্ন শ্রেণির গান ও কবিতার সংকলন। পাঠক যাতে সহজভাবে উপভোগ করতে পারে এজন্য ছোট ছোট মন্তব্য দিয়ে ঐসব গান ও কবিতার অংশ-বিশেষ সংযোজিত হয়েছে। তার তৃতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ সেই পথ লক্ষ্য করে’। এটি মূলত শিশু পাঠ্যগ্রন্থ।


উচ্চ বিজ্ঞানের কথাও যে বাংলা ভাষায় সহজে লেখা যায় তা তার ‘সঞ্চরণ’- এর অন্তর্ভুক্ত ‘শব্দ ও তাহার ব্যবহার’ প্রবন্ধটি পড়লে সহজেই অনুধাবন করা যায়। এছাড়া ‘তথ্যগণিত’, ‘আলোক-বিজ্ঞান’ এবং অন্যান্য বিজ্ঞান বিষয়ক রচনায় তিনি বাংলা ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং এভাবে এই ভাষার প্রকাশ ক্ষমতাকে সম্প্রসারিত করেছেন।


প্রকাশিত গ্রন্থ ছাড়াও তিনি আজীবন অসংখ্য প্রবন্ধ ও পুস্তক সমালোচনা লিখেছেন যেগুলো সমসাময়িক বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
শেষ জীবনে তিনি আত্মজীবনী লিখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন কিন্তু শেষ করে যেতে পারেন নি। ‘কুষ্টিয়ার স্মৃতিকথা’ তার আত্মজীবনী লেখারই প্রাথমিক প্রয়াস।
ভাষা আন্দোলন তথা সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অবদানঃ অসাম্প্রদায়িক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী কাজী মোতাহার হোসেন সেই আলোকে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য তিনি লেখনী পরিচালনা করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর দাবীতে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তিনি ছিলেন তার একজন দৃঢ় পৃষ্ঠপোষক। বক্তৃতা, বিবৃতি ও প্রবন্ধাদি প্রকাশ করে এ-সব আন্দোলনে গতিদান করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপিত ৬-দফাকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের যে আন্দোলন সংঘটিত হয় তিনি ছিলেন তারও একজন বলিষ্ঠ সমর্থক।


এমনকি ১৯৬১ সালে সে সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীদের বিরোধিতার মুখে ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশত বার্ষিকী পালনে তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করেন। শুধু তাই নয় ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালি-সংস্কৃতি খর্ব করার জন্য রেডিও-টেলিভিশন থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধের যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জ্ঞাপন করেন।

দাবাঃ ড. কাজী মোতাহার হোসেন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবাড়ু হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। বাংলাদেশে দাবা খেলার পথিকৃৎ হিসেবে তাকে সম্মানিত করা হয়। উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাবাড়ু হিসেবে ১৯২৯ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানে একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। দাবা খেলায় তাঁর অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে কাজী মোতাহার হোসেন স্মৃতি আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মাননাঃ আজীবন বিজ্ঞান সাধনা, সাহিত্য সাধনা, গবেষণা সাধনা, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে প্রভূত অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁকে সিতারা ই ইমতিয়াজ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৬৬ সালে প্রবন্ধসাহিত্যের জন্য বাংলা একাডেমি পুরষ্কার এবং বিজ্ঞান চর্চায় অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার হিসাবে পরিচিত স্বাধীনতা পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে বিজ্ঞান ও কলা বিষয়ে অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ডি.এস.সি ডিগ্রি দ্বারা সম্মানিত করে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

মৃত্যুঃ ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

ড. কাজী মোতাহার হোসেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে আমাদের দেখিয়ে গেছেন চেষ্টা ও সাধনা থাকলে একজন মানুষ জীবনে অনেক কিছুই করতে পারেন। তিনি ছিলেন একাধারে অধ্যাপক, গণিতজ্ঞ, লেখক, বিজ্ঞানী, দাবাড়ু, গবেষক, মুক্তবুদ্ধি চর্চাকার, সাংস্কৃতিক আন্দোলনকর্মী, সমাজ সংস্কারক, সংসারী, ধর্মপরায়ণ ও ন্যায়পরায়ণ প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত একজ পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে আমাদের যে পথের নির্দেশনা দান করেছেন সে পথে চলতে পারার মাঝেই আমাদের জীবনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য লুকায়িত আছে। তাঁর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক বর্তমান ঘুনে ধরা সমাজ এমনটিই কামনা।

লেখকঃ শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 51 times, 1 visits today)