গানের জাদুকরের চিরবিদায়: শিপন আলম –


গতকাল সন্ধ্যার পরে হাটাহাটি করে বাসায় ফেরার পথে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুকে ঢুকতেই খবরটি পড়ে মনটা বিষাদে ভরে উঠল। হাজারো জনপ্রিয় গানের উপহারদাতা, বাংলাদেশের সঙ্গীত রাজ্যের রাজা, ঢাকাই চলচ্চিত্র গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী, প্লেব্যাক সম্রাট এন্ডু কিশোর আমাদের মধ্য থেকে চিরদিনের জন্য অসীম শূন্যতার পথে পাড়ি জমিয়েছেন। মনের মধ্যে বেজে উঠল তার গাওয়া শাশ্বত চিরসবুজ সেই জনপ্রিয় গানটি ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে/রইবো না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে…।”


বাসায় ফিরে দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসলাম। আপন মনে খাচ্ছি আর এণ্ড্রুর গাওয়া হাজারো গানের মধ্যে নিজের জানা জনপ্রিয় গানগুলো হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ গৃহকর্ত্রী এসে বললো আমাদের বাসায় আজ সন্ধ্যার পরে একটি পাখি অতিথি হয়ে এসেছে। পাখিটি আশেপাশেই আছে। এটি শোনামাত্র চোখ তুলে জানালার দিকে তাকাতেই দেখি পর্দা ঝুলানো ইস্পাত দণ্ডের উপর একটি দোয়েল পাখি মিটমিট করে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। পাখিটিকে কি করা যায় এটি নিয়ে যখন ভাবছি তখনই অকস্মাৎ সেটি ফ্যানের নিচ দিয়ে উড়তে শুরু করল। গৃহকর্ত্রীকে দ্রুত ফ্যান বন্ধ করতে বললাম। কিন্তু সুইচে হাত দেওয়ার আগেই সেটি ফুল স্পীডে চলা ফ্যানের পাখার সাথে সজোরে ধাক্কা লেগে মুহূর্তের মধ্যে কয়েকটি পালক টেবিলের উপর ছড়িয়ে ধিরিম করে পাশে পড়ে গেল। আকস্মিক এ ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলাম। দ্রুত কাছে গিয়ে হাতে তুলে নিয়ে বুঝতে পারলাম এণ্ড্রুর ন্যায় পাখিটিও কি একটি বার্তা দিয়ে ডানায় উড়ে বেড়ানো জীবনের পথচলা থামিয়ে দেহটিকে আমার হাতের উপর রেখে সীমাহীন পথে পাড়ি জমিয়েছে। কাকতালীয় হলেও এটি সত্য যে গতকালই ডাইনিং টেবিলের উপরে সিলিং ফ্যানটি লাগানো হয়েছে। আর খাওয়ার আগে মনে হয়েছিল পড়ার টেবিলে বসেই খাই কিন্তু কি মনে করে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়লাম তা বলতে পারব না।


দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে অনেক রাত অবধি ব্যালকনিতে রাখা চেয়ারে বসে খোলা আকাশের দিকে পূর্ণ চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে এণ্ড্রু, পাখি আর নিজের জীবনের মধ্যে মিল খোজার চেষ্টা করলাম। দোয়েল পাখিটি আজও হয়তো সারাদিন শিস বাজিয়ে গাছের এডাল থেকে ওডালে উড়ে উড়ে কত গান করেছে। সুরের মূর্ছনা আর স্বভাব সুলভ চঞ্চলতা দিয়ে মুখর করে রেখেছিল করোনাময় প্রকৃতি অথচ সামান্য একটি আঘাত থামিয়ে দিল তার সকল চঞ্চলতা, সকল মুখরতা। দোয়েলের ন্যায় এণ্ড্রুও তার ৬৪-৬৫ বছর বয়সী জীবনটিতে একই কণ্ঠে গেয়েছিলেন হাজারো গান, সুরে-তালে-ছন্দে মুখর করে রেখেছিলেন বাংলার পথ প্রান্তর, জয় করেছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়। কিন্তু সকল জনপ্রিয়তা, সকল সৃষ্টিকে পেছনে ফেলে তিনি চলে গেলেন শূন্য রিক্ত কণ্ঠে নশ্বর পৃথিবী থেকে অবিনশ্বর পৃথিবীর পথে। নিজের জীবনটিকে খুবই নস্যি মনে হলো তখন। রিক্ততা আর শূন্যতায় ভরা ছলনাময় এ জীবনটিকে নিজের কাছে খুবই অর্থহীন মনে হতে লাগলো।

এণ্ড্রুর জন্ম পাকিস্তান আমলে ১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর রাজশাহীর মহিষবাথানে। বেড়ে ওঠা, লেখাপড়া রাজশাহীতেই। পড়াশুনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে। স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করলেও তার ধ্যান জ্ঞান ছিল সঙ্গীতের প্রতি। নিজের গাওয়া ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান/সেদিন থেকে গানই জীবন গানই আমার প্রাণ…’ গানের মাধ্যমে তিনি এ সত্য সম্পর্কেই আমাদের জ্ঞাত করেছেন। হঠাৎ করেই তিনি বসন্তের কোকিলের ন্যায় শিল্পী তকমা পাননি। দীর্ঘ সাধনা আর একাগ্রতার মাধ্যমেই তিনি সমসাময়িক অনেক গুণী শিল্পীদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান শিল্পী হতে পেরেছিলেন।


এণ্ড্রু কিশোরের সঙ্গীত পাঠ শুরু হয় খ্যাতিমান ওস্তাদ আবদুল আজিজ বাচ্চুর সান্নিধ্যে। রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পর নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, আধুনিক, লোকসংগীত, দেশাত্মবোধকসহ প্রায় সব ধারার গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে তার গান গাওয়া শুরু হয় ১৯৭৭ সালে ‘মেইল ট্রেন’ ছবিতে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানটির মাধ্যমে। কিন্তু এন্ড্রু তার সঙ্গীত প্রতিভা-কে সবার কাছে পৌঁছে দেন দুই বছর পর ১৯৭৯ সালে গীতিকার মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা আর সুরকার আলম খানের সুরে ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ কালজয়ী গানের মাধ্যমে।


সেই যে পথচলা শুরু হলো তার তারপর আর থামেনি। একের পর এক উপহার দিয়েছেন অসংখ্য আবেদনময়ী চিরসবুজ গান। পেশাদার শিল্পী হিসেবে গান করেছেন এপার বাংলা ওপার বাংলা দুই বাংলাতেই। বলিউডের খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণ তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলিউডে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমানোর। কিন্তু মাতৃভূমির জল-বাতাসে
বেড়ে ওঠা এণ্ড্রু সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন ‘আমি যাব না।’


বলিউডের নাম্বার ওয়ান শিল্পী হওয়ার চেয়ে নিজ দেশের নাম্বার ওয়ান শিল্পী হওয়াটাকেই তিনি পরম পাওয়া হিসেবে দেখেছেন। শিল্পী মাহমুদুন্নবী আর সৈয়দ আব্দুল হাদী’র সঙ্গীত রাজ্যে তিনিই ভাগ বসিয়েছিলেন বীরদর্পে। ৪০-৪২ বছর ধরে দাপিয়ে বেরিয়েছিলেন ঢাকাই ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে। অর্জন করেছেন আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার। তাকে বিট করার মতো শিল্পী সে সময়ে ছিল না। উপহার দিয়েছেন কালজয়ী সব গানগুলো যার আবেদন এখনো সমভাবে বিরাজমান। তার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘জীবনের গল্প/ আছে বাকি অল্প’, ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যিখানে’, ‘তুমি যেখানে/ আমি সেখানে’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে’, ‘তুমি আমার জীবন/ আমি তোমার জীবন’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো’, ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’, ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’,‘এখানে দুজনে নির্জনে’সহ অসংখ্য গান। চলচ্চিত্রের গান নিয়ে তিনি এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে অডিও বাজারে খুব একটা অ্যালবাম করতে পারেন নি। চলচ্চিত্রের বাইরে এসে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তেও বেশ কয়েকবার গান করেছেন।


যে দয়ালের ডাকে তিনি জীবন শুরু করেছিলেন সেই দয়ালের ডাকেই তিনি অল্প কয়েক মাস ক্যান্সারে ভুগে আমাদের মাঝ থেকে চির বিদায় নিলেন। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা চলাকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি নিজের ইচ্ছায় দেশে ফেরার আকুতি জানান। বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশে গিয়ে মরতে চাই, এখানে নয়।’
অবশেষে দীর্ঘ ১০ মাস ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে মহান স্রষ্টার আহবানে সাড়া দিয়ে কোটি ভক্তকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে ‘জীবনের গল্প’-কে বাকি রেখেই পাড়ি জমালেন অসীম শূন্যতার পথে।


লেখক- শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 112 times, 1 visits today)