রাজবাড়ীতে বিশ্ববিদ্যালয়: প্রতিষ্ঠা-প্রাসঙ্গিকতা ও যৌক্তিকতা: শিপন আলম –

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীয়করণের অংশ হিসেবে এবং অবহেলিত জনপদের উন্নয়নের নিমিত্তে তৎকালীন সরকার ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ রাজবাড়ীকে স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় জেলা প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৩৬ বছর অতিবাহিত হলেও রাজিবাড়ীতে উল্লেখ করার মতো তেমন কোন অবকাঠামো, শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। নেই উল্লেখ করার মত কোন গৌরবময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে অবহেলিত এ জনপদ। বিখ্যাত মনীষী জন হে উড বলেছেন-“অশিক্ষিত সন্তানের চেয়ে সন্তান না থাকা ভালো।” রাজবাড়ী জেলাটিও অনেকটা ঐ অশিক্ষিত সন্তানের মত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় রাজবাড়ী স্বতন্ত্র জেলা না হয়ে ফরিদপুরের সাথে একীভূত থাকাই ভাল ছিল তাতে অন্তত গর্ব করার মত অনেক কিছুই পাওয়া যেত। অন্য জেলাগুলোর তুলনায় প্রায় সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকাই এমন সংকীর্ণ মনোভাব তৈরির কারণ।

ফলে যে উদ্দেশ্যে তৎকালীন সরকার রাজবাড়ী’কে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন সে উদ্দেশ্য কতখানি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং জেলা প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ীবাসীর প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে তা বিশ্লেষণ করার সময় এসেছে। সত্য কথা হচ্ছে, রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১১৭ কি.মি. দূরে থেকেও রাজবাড়ী এখনও পশ্চাদপদই রয়ে গেছে। ঐতিহাসিক দায়, পদ্মার ভাঙন, মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতু না হওয়া, কারিশম্যাটিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব, রাজবাড়ীবাসীর একতা ও আন্তরিকতার অভাব, উল্লেখযোগ্য কল-কারখানা গড়ে না ওঠা, শিক্ষাক্ষেত্রে পশ্চাদপদতা প্রভৃতি কারণে উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজবাড়ী জেলার প্রত্যাশিত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন তো দূরের কথা বরং দশকের পর দশক ধরে রাজবাড়ীর ললাটে কলঙ্ক তিলক হয়ে ঝুলে আছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পতিতালয়।

রাজবাড়ীবাসীর স্বপ্ন ছিল দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে পদ্মার ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণ হবে। এটিকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ীতে দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে রাজবাড়ী বাসী মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় পদ্মা সেতু ঠিকই হচ্ছে কিন্তু রাজবাড়ীতে নয়, মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা আসলেও সেটি কবে হবে তা নিশ্চিত নয়। দ্বিতীয় স্বপ্নটি ছিল জেলার পাংশা থানায় প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজকে নিয়ে। গুরুত্ব বিবেচনায় এটি ছিল পদ্মা সেতুর মতই। কিন্তু সেটিও নানা কারণে স্থগিত হয়ে গেছে। কবে হবে, রাজবাড়ীতেই হবে নাকি অন্য কোথাও হবে তাও নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ উন্নয়নের নিয়ামকগুলো রাজবাড়ীবাসীর ভাগ্যে ধরা দিয়েও দিচ্ছে না। ফলে রাজবাড়ীতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।
তাই পদ্মা সেতু ও পদ্মা ব্যারেজের বিকল্প হিসেবে যে নিয়ামকটি রাজবাড়ী’র উন্নয়নের জন্য বড় ধরণের ভূমিকা পারে তা হলো রাজবাড়ী’তে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।

আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি টমাস জেফারসন বলেছেন- “প্রতিটি জাতির ভিত্তি মজবুত হবে যদি সে জাতি শিক্ষিত হয়।” আর শিক্ষিত জাতি নির্মানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিকল্প কিছু হতে পারে না। আর এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে গুটিকয়েক জনপদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সকল জনপদে ছড়িয়ে দিতে হবে। রাজবাড়ী’তে কোন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় রাজবাড়ী’র জনগণ জাতীয় এ লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।

অবহেলিত জনপদগুলোকে এগিয়ে নিতেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন- “প্রত্যেক জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।” মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যুগোপযোগী এ ঘোষণার পরে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান রয়েছে। পরবর্তীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এ ঘোষণার পুনরাবৃত্তি করেন। অতি সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলায় চার (০৪) টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও এক (০১) টি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ যে পাঁচ (০৫) টি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এসেছে সেটিও বোধ করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং শিক্ষা উপমন্ত্রী’র ঘোষণারই ফসল। আফসোসের বিষয় নাটোর ও মেহেরপুরে একই সাথে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব আসলেও জেলা হিসেবে স্বীকৃতির দীর্ঘকাল পরেও রাজবাড়ী’তে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও আমরা পাশ করাতে পারি নি। এ ব্যর্থতা শুধু আমাদের পূর্বসুরীদের নয়, বর্তমান প্রজন্মেরও। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে সরকারি আমলা, সুশীল সমাজ এমনকি সাধারণ জনগণও এ দায় এড়াতে পারে না।

অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারে রাজবাড়ীর পাশেই কুষ্টিয়ায় এবং গোপালগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তাহলে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা কি। অজ্ঞতাবশত এমন প্রশ্নের উত্থাপন মোটেই অভাবনীয় নয়। তাদের উত্থাপিত এ প্রশ্নের উত্তরটি হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রত্যেক জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা। বিষয়টিকে যদি একটু ব্যাখ্যা করি তাহলে আমাদের চিন্তার দীনতা দূর হবে। সিলেট বিভাগে চার (০৪) টি জেলার মধ্যে তিন (০৩) টি জেলাতেই বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং প্রত্যেক জেলাগুলোই একসাথে সংযুক্ত। শুধু তাই নয় সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরেও তার সাথে লাগোয়া সুনামগঞ্জ জেলায় আরেকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার সিলেটে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও পাশের জেলা হবিগঞ্জে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের চার (০৪) টি জেলা নিয়ে গঠিত এ বিভাগে বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলা ব্যতীত বাকি তিনটি জেলায়ই বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
আবার কুমিল্লা বিভাগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পরও সেখানে লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাব করা হয়েছে। অপরদিকে রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, রংপুর,কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলাগুলো পাশাপাশি অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এসকল জেলাগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে অথবা প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভাগগুলোর সীমারেখা তুলে দিয়ে শুধু জেলা সীমারেখার দিকে দৃষ্টিপাত করলে বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যার এ ঘনত্ব আরও বেশি হবে।

অতি সম্প্রতি প্রস্তাবিত পাঁচ (০৫) টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিবেচনায় না নিয়ে শুধু আগের পঞ্চাশ (৫০) টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিবেচনায় নিয়ে যদি বিভাগ অনুযায়ী ভাগ করি তাহলে দেখতে পাই-
রংপুর বিভাগে আট (০৮)টি জেলার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় আছে এমন জেলার সংখ্যা চারটি (০৪) টি অর্থাৎ জেলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার ৫০ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগেও আটটি (০৮) টি জেলার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় আছে চার (০৪) টি জেলায় অর্থাৎ জেলা ভিত্তিতে এখানেও বিশ্ববিদ্যালয়ের হার ৫০ শতাংশ। নবগঠিত ময়মনসিংহ বিভাগে জেলার সংখ্যা পাঁচ (০৫) টি, বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা পাঁচ (০৫) টি অর্থাৎ জেলা ভিত্তিতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার ১০০ শতাংশ। সিলেট বিভাগে জেলার সংখ্যা চার (০৪) টি, বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা পাঁচ (০৫) টি অর্থাৎ জেলা ভিত্তিতে এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার ১২৫ শতাংশ। কুমিল্লা বিভাগে জেলার সংখ্যা ছয় (০৬) টি, বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা চার (০৪) টি অর্থাৎ জেলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার ৬৭ শতাংশ।
অপরদিকে সদ্য ঘোষিত ফরিদপুর বিভাগে জেলার সংখ্যা পাঁচ (০৫) টি কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র এক (০১) টি অর্থাৎ জেলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার মাত্র ২০ শতাংশ।

এবার যদি বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব
রাজশাহী বিভাগ ও রংপুর বিভাগ নিয়ে গঠিত বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ অংশে মোট জেলার সংখ্যা ষোল (১৬) টি এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা আট (০৮) টি অর্থাৎ এক্ষেত্রেও জেলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার ৫০ শতাংশ।
অপরদিকে দক্ষিণ বঙ্গের দিকে তাকালে দেখতে পাব বরিশাল বিভাগের ছয় (০৬) টি, খুলনা বিভাগের দশ (১০) টি ও ফরিদপুর বিভাগের পাঁচ (০৫) টিসহ মোট জেলার সংখ্যা একুশ (২১) টি কিন্তু এ অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র নয় (০৯) টি যদিও এগুলোর মধ্যে তিন (০৩) টি বিশ্ববিদ্যালয়ই খুলনা বিভাগে অবস্থিত অর্থাৎ এক্ষেত্রে জেলা ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হার দাঁড়ায় ৪৩ শতাংশ।
সুতরাং মঙ্গা অঞ্চল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল অধিক দারিদ্র্েযর হার ও কম শিক্ষার হার নিয়েও বাংলাদেশের শস্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গ কম দারিদ্র্য হার ও উচ্চ শিক্ষার হার নিয়েও বিশ্ববিদ্যালয় হারের দিক থেকে উত্তরবঙ্গের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে।


আমার এত সব তথ্য উপাত্ত তুলে ধরার উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশমুখ হিসেবে পরিচিত রাজবাড়ী জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিক কারণগুলো সবাইকে অবহিত করা।
এবার যেসকল জেলায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বা স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে সেসকল জেলার মধ্যে সাত (০৭) টি জেলার শিক্ষার হারের দিকে তাকালে দেখতে পাই- হবিগঞ্জ জেলায় শিক্ষার হার ৪০.৫০ শতাংশ, সুনামগঞ্জ জেলায় ৩৫ শতাংশ, লালমনিরহাট জেলায় ৪৬.০৯ শতাংশ, জামালপুর জেলায় ৩৮.৫ শতাংশ, নেত্রকোনা জেলায় ৩৪.৯ শতাংশ, সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রস্তাবিত দারিদ্র্য কবলিত মেহেরপুর জেলায় শিক্ষার হার ৪৬.৩ শতাংশ।
অন্যদিকে রাজবাড়ী জেলায় শিক্ষার হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। শিক্ষার হারের ভিত্তিতে এসকল জেলার তুলনায় অধিক শিক্ষার হার নিয়েও রাজবাড়ী জেলায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়াটা সত্যিই দুঃখজনক।

অপরদিকে, পদ্মা বিধৌত রাজবাড়ীর ধুলোবালি গায়ে মেখে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বহু প্রথিতযশা মনীষী যারা শুধু দেশে নয় আন্তর্জাতিকভাবেও সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। বিষাদ-সিন্ধু খ্যাত সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, কথাসাহিত্যিক মুহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী, পাকিস্তানের প্রথম স্পীকার ও আয়ুব সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তমিজউদদীন খাঁন, মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথিকৃৎ সাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওদুদ, জাতীয় অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল (অব) আবু ওসমান চৌধুরী,’মাসুদ রানা’ সিরিজ লেখক- কাজী আনোয়ার হোসেন,স্বনামধন্য সাবেক আমলা ও সাবেক সফল প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হেনা, অঙ্কন শিল্পী রাশিদ চৌধুরী ও মনসুর-উল-করিম, প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী ও রবীন্দ্র গবেষক ড. সানজিদা খাতুন, ছড়াকার রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, স্বনামধন্য চলচ্চিত্র অভিনেত্রী রোজিনা ও দশবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নায়িকা শাবনূর, বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম অস্কার বিজয়ী তরুণ বিজ্ঞানী নাফিজ বিন জাফরসহ অসংখ্য খ্যাতিমান সন্তানের জন্ম দিয়েছে রাজবাড়ীর উর্বর মৃত্তিকা। কাজেই এতজন বিশিষ্ট মহামানবের জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় নেই ব্যাপারটি শুধু বেমানান নয় লজ্জাজনকও বটে।

অনেকেই আবার প্রশ্ন তুলতে পারে, এতো বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে কি হবে? যেগুলো আছে এগুলোই যথেষ্ট। তাদের জন্য সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে এশিয়ার জাপান। দেশটির মোট জনসংখ্যা প্রায় তের (১৩) কোটি অথচ সরকারি বেসরকারি মিলে মোট বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় আটাত্তর হাজার (৭৮,০০০) টি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যা প্রায় ষোল হাজারটি (১৬,০০০) টি। দক্ষিণ কোরিয়াতেও পাঁচ (০৫) কোটি জনসংখ্যার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে প্রায় চারশত (৪০০) টি। অথচ আঠারো-বিশ (১৮-২০) কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ১৫০ টি হলেও দু একটি সংখ্যা বৃদ্ধিতে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং পাকিস্তান সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী বিচারপতি এম ইব্রাহিম বলেছেন -“এ যুগে সেই সব দেশকেই আমরা প্রগতিশীল বলে মানি যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধনহীন বিস্তার আছে। খাদ্য এবং পানীয় সরবরাহ যেমন জাতির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ও ঠিক তেমনি অপরিহার্য।” আশ্চর্যজনক হলেও এটি সত্য যে, আজ থেকে প্রায় সত্তর (৭০) বছর আগে যে সত্যটি তিনি উপলব্ধি করেছিলেন আমাদের অনেকেই সত্তর (৭০) বছর পরে এসেও সে সত্যটি অনুধাবন করতে পারছেন না। মূল্যবান এ বোধশক্তিটি না থাকার দিক দিয়ে রাজবাড়ী জেলার জনসাধারণ এগিয়ে রয়েছে। তাই বিভিন্ন জেলা এ সত্যটি উপলব্ধির মাধ্যমে তাদের একতা ও নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে তাদের জেলায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও আমরা এখনো দর্শকের কাতারে।

পরিশেষে বলতে চাই, দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত রাজবাড়ী জেলা ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা, তুলনামূলক কম প্রাকৃতিক দূর্যোগপ্রবণ, সবুজে ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, বাংলাদেশের প্রায় কেন্দ্রে অবস্থিত, রাজধানীর কাছাকাছি, তুলনামূলক অধিক শিক্ষার হার প্রভৃতি দিক থেকে রাজবাড়ী জেলা অন্য অনেক জেলার তুলনায় এগিয়ে থাকলেও জেলা হিসেবে স্বীকৃতির পর থেকে কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হওয়াটা একই সাথে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। তাই রাজবাড়ীবাসীর প্রাণের চাওয়া আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিষয়টিকে অতীব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে রাজবাড়ী’তে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

লেখক : শিপন আলম, প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 198 times, 1 visits today)