করোনাভাইরাস: অর্থনীতি ও বাংলাদেশ: আরিফুর রহমান –

অর্থনীতিতে এমনটা এর আগে কখনো হয়নি। এর আগে কখনও উৎপাদনকারীকে কম উৎপাদন করতে এবং ভোক্তাকে কম ভোগ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়নি।
জানুয়ারিতে আইএমএফ সারা বিশ্বে প্রবৃদ্ধি ধরেছিল +৩% যেটা এপ্রিলে এসে -৩% হয়ে গেছে। আবার জানুযারীতে আইএমএফ সারা বিশ্বের ১৬০ দেশের মাথাপিছু আয়ের পজিটিভ প্রবুদ্ধি আশা করেছিল, এখন ইতোমধ্যে ১৭০ দেশের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি নেগেটিভ হয়ে গেছে।
অর্র্থনীতিতে সব সময় অনিশ্চিয়তা থাকে। এবছরের অনিশ্চিয়তা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। অর্র্থনীতিবিদরা সবসময় ব্যাস্টিক বা সামস্টিক অর্থনৈতিক মডেল দিয়ে এ অনিশ্চিয়তা দূর করার চেষ্টা করে থাকে, কিন্তু এ বছর করোনা ভাইরাসের ভূত ভবিষ্যতের সাথে অর্থচিন্তার সংশ্লেষ ঘটিয়ে অনিশ্চিয়তা দুর করার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে এবার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান খুজতে হবে।


এখন শুরুতেই যে কাজটি করা হয়েছে তা হল আমেরিকা সহ পৃথিবীর উন্নত অর্র্থনীতি সমুহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করেছে। এখানে দু ধরণের প্রণোদনা ঘোষনা করা হয়েছে। একটি হল ফিসকাল স্টিমুলাস(রাজস্ব প্রণোদনা), অন্যটি মনিটারী স্টিমুলাস(টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে প্রণোদনা)। প্রশ্ন আসতে পারে এ প্রণোদনার প্রয়োজন কতটুকু ছিল? এটি কি ভাল হল নাকি খারাপ হল। সে প্রসঙ্গে বলা যায়, অর্র্থনীতি এখন স্থবীর হয়ে আছে। এ মুহুর্তে ফিসকাল বা মনিটারী পণোদনা না পেলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানই দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং বহু লোক বেকার হয়ে যাবে। এটা ইকোনোমিতে একটা ভীতির সঞ্চার করবে যা করোনা পরবর্তী পূণরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সময়ক্ষেপনের মাধ্যমে বাধাগ্রস্থ করবে।

এখানে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল কেন্দ্রীয় ব্যাংক কত দ্রুত এবং কত কার্যকরী ভাবে এরকম কঠিন সময়ে এ ফিসকাল বা মনিটারী স্টিমুলাস/পণোদনা ইকোনোমিতে ইনজেক্ট করতে পারে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, এ প্রণোদনা ইকোনোমির উপর কি প্রভাব ফেলবে?? সে প্রসঙ্গে বলা যায়, যেখানে ফিসকাল স্টিমুলাস প্যাকেজ দেয়া হয়েছে, তা রিপেমেন্ট করার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে করদাতাদের স্বার্থ ও সংরক্ষন করা হয়েছে। এখানে টাকার রিএলোকেশন হয়েছে। মুক্ত বা বদ্ধ অর্থনীতি, কোনটাতেই এ প্রণোদনায় কোন সমস্যা নাই। আর যেখানে মনিটারী স্টিমুলাস প্যাকেজ দেয়া হয়েছে বা হবে সেখানে মুদ্রাস্ফীতির প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তবে এ সম্ভাবনা অর্থনীতি ভেদে বিভিন্ন রকম হবে।

উন্নত অর্থনীতিতে টাকা ছাপিয়ে প্রণোদনা দিলে উন্নত ইকোনোমির দেশ সমূহে এটার প্রভাব সহজে পড়ে না। কারণ, তাদের ইকোনোমিক ফান্ডামেন্টাল স্ট্রাকচার যথাযথ থাকে, তাদের কারেন্সি সাধারণত হার্ড কারেন্সি( যে কারেন্সির মুল্য সহজে কমে যায় না), তাদের বৈদেশিক মুদ্রার অনেক সহজ একসেস থাকে। সর্বোপরি তাদের ডিমান্ড ও সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট অনেক স্ট্রাকচারাল থাকে, ফলে হঠাৎ করে বিশাল চাহিদা ও তৈরি হয় না, এবং দাম ও সেভাবে বৃদ্ধি পায় না। ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে থাকে।

অন্যদিকে উন্নয়নশীল অর্র্থনীতির প্রথম সমস্যা হচ্ছে তাদের কারেন্সি হার্ড কারেন্সি নয়। বৈদেশিক মুদ্রায় তাদের সহজ একসেস কম থাকে। ইকোনোমির ফান্ডামেন্টাল স্ট্রাকচার ঠিক থাকে না, এমনকি ডিমান্ড ও সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট ও দূর্বল থাকে। অর্থাৎ, এখানে মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাবনা অনেক বেশি।

তাছাড়া একটা জিনিস খুবই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হল, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক বৈদেশিক মুদ্রার পাওনা পরিশোধের ব্যাপার থাকে। এখন, উন্নয়নশীল দেশ যদি মনিটারী প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়, আর তাতে যদি মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায় তাহলে তাহলে লোকাল কারেন্সি ডেপরিসিয়েট করবে এবং বিদেশী মুদ্রার দাম বেড়ে যাবে। এতে করে বৈদেশিক পাওনা পরিশোধ অনেক কঠিন হবে। তাছাড়াও মুদ্রাস্ফীতির আরও অনেক নেতিবাচক প্রভাব আছে। সেক্ষেত্রে ফিসকাল স্টিমুলাস প্যাকেজের মাধ্যমে সমাধান করতে পারলে সবচেয়ে ভাল। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত সে চেষ্টাই করছে।

এখন আসি করোনা কিভাবে বিভিন্ন ধরণের ইকোনোমিকে নাড়া দিবে। প্রথমে বলে রাখি, যেসব অর্থনীতির ফান্ডামেন্টাল স্ট্রাকচার ভাল সেসব ইকোনোমিতে করোনার প্রভাব এতটা পড়বে না। ভাল ইকোনোমির একটা লক্ষন হল তাদের বিভিন্ন ধরণের ফাইনানসিয়াল এসেটের অনেক বাফার স্টক থাকে।

তবে উন্নয়নশীল অর্থনীতি নানা দিক থেকে জামেলায় পড়বে। প্রথমত তাদের স্বাস্থ্যখাত দূর্বল থাকায় শুরুতেই জামেলায় পড়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, অনেকে কমোডিটি রপ্তানি করে, যেমন গার্মেন্টস(বাংলাদেশ), তেল(সৈাদি, ইরান) ইত্যাদি, এগুলোর দাম পড়ে যাবে। তৃতীয়ত, যারা রেমিট্যান্স এর উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল(বাংলাদেশ) তারাও বিপদে পড়বে কারণ রেমিট্যান্স কমে যেতে পারে( আইএমএফ এর মতে তা ২০-৩০%)। আবার কিছু কিছু দেশ আছে অতিমাত্রায় ট্যুারিজমের উপর নির্ভশীল, তারা মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।যেমন মালদ্বীপ। সবশেষে, উল্লেখিত কারণে অনেক উন্নয়নশীল দেশই বৈদেশিক দেনা পরিশোধ করা নিয়ে বিপদে পড়বে।

তাছাড়া, অন্য একটি দিক থেকে করোনা অনেক উন্নয়নশীল দেশকে বিরাট ডিলেমায় ফেলে দিয়েছে। তাদের সমস্যা হচ্ছে মানুষ কি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবে নাকি না খেয়ে মরবে। এর কারণ হচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির বিশাল একটা অংশ হচ্ছে ইনফরমাল সেক্টর; অর্থাৎ, বেশিরভাগ মানুষ দিনে আনে দিনে খায় টাইপের আর এই ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সরাসরি করের আওতাভুক্ত নয় এবং কোন মনিটরিং অথরিটি নাই। ফলে ডাটা গ্যাপ অনেক বেশি থাকে এবং যথাযথ পলিসি নেয়া যায় না। ফলে উন্নত দেশের মত মানুষকে সরকারিভাবে বেশিদিন খাওয়ানোর ক্ষমতা সরকারের থাকে না। যেমনটা কানাডা পারলেও বাংলাদেশ পারবে না।
সমস্যা তো জানা হল, এখন উপায়???


প্রথমত, করোনা মুক্ত পৃথিবীই সর্বোত্তম উপায়। করোনার কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধান করোনার তিরোধানেই সম্ভব, আপাতত বিকল্প কোন ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক দেনার ক্ষেত্রে পাওনাদার দেশগুলো এগিয়ে আসতে পারে। তারা তাদের পাওনা পরিশোধ এর সময় বাড়িয়ে দিতে পারে যা উবনঃ গড়ৎধঃড়ৎরঁস নামে পরিচিত। এ২০ ভুক্ত দেশগুলোই পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় পাওনাদার।

এরা সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে পারে। তাছাড়া আন্তজার্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান সমূহ বিভিন্ন ধরণের প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে আসতে পারে যা স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে গরীব দেশগুলোকে দেয়া হবে(আইএম এফ এর সুত্র মতে তারা এ উদ্দেশ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠন করেছে)। এখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে দক্ষ ডিপ্লোমেসি তাদের ইকোনোমি পূণরুদ্ধারের ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখবে।

সবশেষে, যে দেশগুলোর ফানডামেন্টাল ইকোনোমি অনেক ভাল, তারা করোনার এ ঝাপটা ভালভাবে সামলাবে তারাই ইকোনোমির নতুন অর্ডার সৃষ্টি করবে নতুন নতুন ইনোভেশন দিয়ে । তাছাড়া, ই-কমার্স, ই-পেমেন্ট, ই-বিজনেস এসব ব্যবসায়িক ধারণাগুলো আরও শক্তভাবে জায়গা করে নিবে। এক কথায় একটা হিউজ ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন হবে। উৎপাদক আর ভোক্তার মধ্যে একটা ডিজিটাল মেল বন্ধন তৈরি হবে। ডিজিটাইজেশনে যারা কাজ করে তারা হিউজ উইনার হবে।

লেখক ঃ আরিফুর রহমান, সহকারী কমিশনার(ভূমি), রাজবাড়ী সদর, রাজবাড়ী। এমএসএস(অর্থনীতি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

(Visited 31 times, 1 visits today)