ঈদ কখনো কান্না হয়ে, কষ্ট হয়ে, বিষন্নবদনেও আসে: সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান –

মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ইদ। ইদ আসে মহানন্দে। ইদ আসে কাস্তে সদৃশ বাঁকা চাদ হয়ে, শিশুর রংগীন পোষাক হয়ে। কর্মব্যস্ত মানুষ আনন্দে ছুটে আসে গ্রামে। স্বজনরা প্রতিক্ষায় থাকে কখন ছুটে আসবে নিকটজন। গ্রামের হাট বাজার চায়ের আড্ডা সব যায়গায় ইদের উৎসব।


কিন্তু সবসময় ইদ কি আনন্দ হয়ে আসে। ইদ কখনো কান্না হয়ে, কষ্ট হয়ে, বিষন্নবদনেও আসে। যে পরিবারে কেউ অসূস্থ হয়ে থাকে সে পরিবারে ইদের আনন্দ থাকেনা। এইযে আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারে কি সেই আনন্দ নিয়ে ইদ আসবে? যেসব পরিবারে কেউ মারা গেছে সে সব পরিবারে ইদ যে কি কষ্টকর অভিজ্ঞতা একমাত্র ভুক্তভূগিরা তা উপলব্ধি করবে।আবার জাতীয় জীবনেও অনেক সময় এমন বিপর্যয় নেমে আসে যে ইদের আনন্দ সেখানে ম্লান হয়ে যায়। ১৯৭১ সালে আমাদের জাতীয় জীবনে এমন ঘটনা ঘটেছিল। জাতি তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে মরণপন লড়াইয়ে লিপ্ত। তখন ইদের চেয়েও বড় হয়ে হয়ে দেখা দিয়ে দিয়েছিল মুক্তির নেশা।


এবার ইদ এসেছে এক অভাবনীয় বিভিষিকা নিয়ে।এর কারণ মরণঘাতী করোনা ভাইরাস। এ ভয়ংকর করোনা এখন একমূর্তিমান আতংক।এমন প্রেক্ষাপটে এবারের ইদ এসেছে। এমন ইদ আমাদের জীবনে কখনো আসেনি।করোনা দেশিয় কোন সমস্যা নয়। সারা বিশ্ব করোনার বিরুদ্ধে লড়ছে এবং রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে। চিনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এর প্রাদুর্ভাব। তারপর ইউরোপ আমেরিকা এশিয়া আফ্রিকা প্রভৃতি অঞ্চলের দুশতাধিক দেশ আজ করোনাক্রান্ত। এ প্রেক্ষাপটে এসেছে ইদ। ইতোমধ্যে আমাদের দেশে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার। মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। তারপরও চাঁদ উঠেছে; ইদ এসেছে।


কি এ এক ভিন্ন ইদ। নেই আনন্দ নেই উচ্ছাস। মানুষ শহর থেকে গ্রামে এসেছে। কিন্তু কি এক যুদ্ধ তাকে করতে হয়েছে। বাস নেই ট্রেন নেই গাড়ি নেই তবুও মানুষ ছুটেছে।তাতেও কি স্বস্থি ছিল- শান্তি ছিল। বাড়িতে সন্দেহ! যে প্রতিবেশী একসময় তাঁকে দেখলে জড়িয়ে ধরতো সে আজ কাছে আসছে না। হাটে বাজারে মানুষের মধ্যে নেই কোন উদ্দীপনা। ইদের জামাত ইদগাহে না হয়ে হয়েছে মসজিদে এমনকি বাড়ির ছাদেও। আমরাও নিজেদের ছাদে নামাজ পড়েছি। ইদ উৎসব বলতে যা বোঝায় তার কিছুই ছিল না। একটিই কারণ করোনা। মানুষ যাতে ভাল থাকতে পারে একারণেই এ ব্যবস্থা। লক ডাউন, সাধারণ ছুটি প্রভৃতি ব্যবস্থা।


আমাদের দেশ অর্থনৈতিক ভাবে এখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। তার মধ্যে করোনা ধাক্কা। সাথে আম্ফান। চিকিৎসক পুলিশ সেনাবাহিনী সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী সবাই আজ যোদ্ধা। এদের কারও ইদ করা হয়নি। ইদের দিনেও এদের কাজ করতে হয়েছে। পরিবার পরিজন একদিকে অন্যদিকে করোনার সাথে যুদ্ধ। এরা চিকিৎসা দিচ্ছে, মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌছে দিচ্ছে।এমনকি যাদের বাজার করার লোক নেই তাদের বাড়িতে বাজার পৌছে দিচ্ছে।সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সমস্ত পর্যায়ের মানুষের কথা মাথায় রেখে প্রণোদনা দিয়েছে। আসহায় মানুষকে খাদ্যসহায়তা সহ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।তার পর আমরা স্বস্থিতে ইদ করতে পারিনি।


কিভাবে স্বস্থি পাব? প্রতিদিনই মৃত্যুর খবর আসছে। কেউ বাদ যাচ্ছে না। আমরা জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার কে হারিয়েছি। আমরা হারিয়েছি প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীকে। এবারের ইদ ছিল কান্না ভেজা ; বেদনাক্রান্ত।


তবে অন্ধকার কেটে যাবে। আলো আসবেই। আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব। যুগে যুগে মহামারি এসেছে কিন্তু মানবজাতি ঠিকই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আমরা স্বপ্ন দেখি বাঁচার আমরা স্বপ্ন দেখি উজ্জ্বল সম্ভাবনার।


লেখক- সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান, সাবেক জেলা শিক্ষা অফিসার, রাজবাড়ী। মে ২৩, ২০২০

(Visited 51 times, 1 visits today)