“ঘরে অবস্থান করে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বাড়ানোর বিকল্প নেই” – রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী ছায়া কর্মকার –

করোনাভাইরাস নামক বৈশ্বিক মহামারীতে প্রায় সারা বিশ্বই এখন সংকটে। তিন লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বাংলাদেশেও এই সংখ্যাটা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার। মৃতের সংখ্যা ৫শত ২২ জন। মঙ্গলবারও মারা গেছে ২১ জন। প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছেই। এই মুহূর্তে আমাদেরকে ঘরে অবস্থান করে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বাড়ানোর বিকল্প নেই। যদিও আমাদের দেশে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে সেইভাবে কেউ আমরা বুঝতেই পারিনি যে, এত খারাপ পরিনতির দিকে দেশের মানুষ ধাবিত হবে। কিন্তু আরও খারাপ কিছু যে হবে সেটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমাদের। মানুষ যেভাবে ঘর থেকে বের হচ্ছে কারনে অকারনে – এতে আমাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধিই পাচ্ছে।

কিছুটা রক্ষা আমাদের স্টুডেন্টদের। স্কুল – কলেজ – বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনার কারণে এরা জোর করে হলেও ঘরে অবস্থান করতেই বাধ্য হচ্ছে। যদিও লকডাউনের পর পরই এদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল। আশার কথা হলো – কিছুদিন পর এটা স্টুডেন্টদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে ঘরে থাকার চেষ্টা করতে করতেই। এতে করে বুঝা গেলো, মানুষ সব পিরিস্থিতিতেই নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম। ঘরে বসে স্টুডেন্টরা এখন অনলাইনে ক্লাস করছে। সেই সঙ্গে বাসায় বসে তারা হোমওয়ার্ক করে পাঠ্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

শান্তিময় হোক আমাদের আগামীর দিনগুলোআমরা বড়রা ঘরের কাজের পাশাপাশি বই পড়া,গানশোনা, যার যার সৌখিন কাজ সবই করছি। ঘরের যে সকল কাজ সময়ের অভাবে করতে পারতাম না, এই করোনাকালে সেগুলো করে ফেলতে পারছি। যে সব বই সময়ের অভাবে পড়তে পারিনি, সেগুলো পড়ার চেষ্টা করছি। আমার বাসার ছোট্ট বারান্দায় কিছু ফুলের গাছ ছিল, সেগুলোকে কিছু সময় দিয়ে সজীব করে তুলতে পেরেছি আমি। আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন একমাত্র পুত্র সন্তান ঋষভ এর পাশে বসে তার পড়া শুনতে পারছি। ওর সঙ্গে গল্প করে কিছু সময় কাটাচ্ছি, শরীরের যতœ করতে পারছি। তবে মন ভালো রাখাটা অনেকটাই এখন কঠিন হয়ে গেছে। বিশেষ করে আজ তো আমার ভীষন মন খারাপ গেছে, সকাল হওয়ার পর পরই। এর কারণ বলছি।

আজ ১৮ মে আমার জীবনের বিশেষ একটা দিন, আমার জন্মদিবস। সকাল হওয়ার পর মনটা হঠাৎই বিষন্ন ও নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ১৮ মে আমার বাসায় ছোট খাটো একটা গেট টুগেদার হয়ে আসছিল। গানে – ভোজনে কাছের মানুষদের নিয়ে বাসায় আনন্দঘন একটু সময় কাটাতাম। কিন্তু আজ আমার জীবনে একদমই অন্য রকম দিন। লকডাউনের ঢাকা শহরে আমরা মা – ছেলে পুরো বাসায় অবস্থান করছি। ছেলে ঋষভেরও সাংঘাতিক মন খারাপ। আমার মন খারাপের মাত্রাটা তাই একটু বেশিই।

শান্তিময় হোক আমাদের আগামীর দিনগুলোঅন্যদিকে, চারপাশে মৃত্যুর খবরও খুব কষ্ট দিচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষদের দুঃখ কষ্টগুলো আর দেখতে পারছি না। তাদের জন্যে মন থেকে প্রার্থনা করছি – এরা ভালো থাকুক। আরও কষ্ট হচ্ছে ঘরবন্দী পড়ুয়া বাচ্চাগুলোর জন্যে। এদের বিশেষ করে ক্লাস নাইন টেন এর বাচ্চা যারা ঘরবন্দী আছে, তাদের জন্যেও আমার মন খুব খারাপ। আমার ছেলে ঋষভ ক্লাস নাইন শেষ করছে, ওর জন্য ভারি কষ্ট হয় – ঘরে থেকে ছটফট করে সারাক্ষন। স্কুল, কোচিং – সবই এখন অনলাইনে চলছে। একে তো ঘরবন্দী, এর ওপর অনলাইন পাঠদানে তারা যেনো হাঁপিয়ে ওঠেছে। এরা বাইরের খাবার থেকে বঞ্চিত, বন্ধুদের মিস করছে, করোনা নিয়ে খুব চিন্তিত। সব মিলিয়ে এদের যে ছটফটানি, আমি সেটা ছেলে ঋষভকে দেখেই আমার কাছে সহজে অনুমেয়।

আমরা যারা গান বাজনা করি অর্থাৎ সঙ্গীতের সঙ্গে জড়িত, তাদের দুরবস্থার কথা আর কী বলবো ? খুবই খারাপ। এই অবস্থা কবে যে, আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব – সেটা কেউই জানি না। কাটিয়ে ওঠার পর মানুষ টাকা পয়সা খরচ করে গান শুনবে কি না – এটাও বলা যাচ্ছে না। বড় বড় প্রতিষ্ঠান সবই প্রায় বন্ধ। যাই হোক, এই প্রতিকুল পরিস্থিতিতে আমাদের হাল ছাড়লে চলবে না। আর তাই সঙ্গীত জগতের মানুষের করোনাকালীন সংগ্রাম – লড়াইয়ের অংশ হিসেবে আমরা যারা সঙ্গীতশিল্পী, শিক্ষক ও প্রশিক্ষক, তারা সবাই অনলাইনে সঙ্গীত ক্লাস ও কিছু প্রোগ্রাম নিয়ে হাজির হচ্ছি ফেসবুক লাইভ এ। এতে মন হয়তো কিছুটা প্রফুল্ল হচ্ছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থার উত্তরণের সম্ভাবনা আপাতদৃষ্টিতে দেখছি না। এটা আমাদের জন্যে খুব কষ্টকর।

শান্তিময় হোক আমাদের আগামীর দিনগুলোএই করোনা মহামারীর সময়েও সব কিছু ছাপিয়েই আমরা ভালো থাকার চেষ্টা করছি। আমি ম্যানগ্রোভ নামের একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সিনিয়র মিউজিক টিচার। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রভাষক হিসেবে সুরের ধারা কলেজ অব মিউজিক এও রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাই। এছাড়াও লেডিস ক্লাবের সঙ্গীত প্রশিক্ষক আমি। এখন তো সবকিছুই বন্ধ। আমার প্রতিষ্ঠিত ঋষভ সঙ্গীত অঙ্গনের কার্যক্রমও আপাতত বন্ধ। তাই ঘরের বাইরের সেই পেশাগত কর্ম আর আড্ডাটাও বন্ধ। সব মিলিয়ে এখন আর ভালো লাগছে না। এইভাবে আর কতদিন থাকতে হবে কে জানে ? আমার মত যারা শুধু সঙ্গীত নিয়ে কাজ করেন, তাদের অবস্থা খুবই খারাপ বলে উপলব্ধি করতে পারছি আপন অভিজ্ঞতার আলোকে। কিন্তু এই উপলব্ধিটুকু বোধ করা ছাড়া করার কিছুই নেই।

সবার জন্যে ঈশ্বরের কাছে আমার প্রার্থনা – সবাই ভালো থাকুন, শান্তিময় হোক আমাদের আগামীর দিনগুলো। ভালো থাকবেন সবাই। করোনাকালের লকডাউনে ঘরে থাকুন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে নিজে ভালো থাকুন, পরিবার ও দেশকে নিরাপদ রাখুন।

লেখক : দেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, বাড়ী- রাজবাড়ী জেলা শহরের ভবানীপুর এলাকায়।

ফেসবুক থেকে এ ভিডিওটি দেখা না গেলে TV Rajbari লিখে ইউটিউবে সার্চ দিলেও দেখা যাবে।

(Visited 33 times, 1 visits today)