‘জীবনটাকে এখন খাঁচায় বন্দী পাখির মত মনে হয় ‘- লেখকঃ শিপন আলম –


‘যখন কথা বলে না মুখর পাখি, বুঝে নিও তার অসুখ হয়েছে’ আজ গাছে গাছে পাখি ডাকে আগের মতই, সকালে সূর্যের সোনালি আলোকছটায় ঝলমলিয়ে ওঠে পুরো প্রকৃতি, প্রকৃতির বুকে সবুজের প্রগাঢ় সমারোহ, জৈষ্ঠ্যের সাদা কালো মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দেয় স্নিগ্ধ নীল আকাশ, ক্ষণে ক্ষণে আকাশ কালো করে চলে মেঘের আনাগোনা, অবিশ্রান্ত বর্ষণে মুখর হয় চারপাশ- ধরার এ রূপ বৈচিত্র্য আছে আগের মতই হয়তোবা একটু বেশিই। তরুলতা, বৃক্ষলতা, ফুল-ফল, পাখি, নদীনালা, জীব-জন্তু, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বত সবই তার স্বাভাবিক রূপ-সৌন্দর্য প্রদর্শন করে চলেছে আগের মতই।

শুধু স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব মানুষের সৌন্দর্যে পড়েছে ভাটা। মলিন হয়েছে তার রূপ-যৌবন। ছেদ পড়েছে স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনায়। বড্ড অসুখ ধরেছে তার। মৃত্যু যাতনায় সদা সন্ত্রস্ত সে। সবাই সুখে থাকলেও সে আছে মহা অসুখে। এ অসুখের খল নায়ক সামান্য ক্ষুদ্র একটি ভাইরাস। নাম তার কোভিড-১৯। অদেখা এই শত্রুর ভয়াল থাবায় মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ আদম সন্তানের, আক্রান্ত প্রায় অর্ধ-কোটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নাকানি-চুবানি খাচ্ছে বিশ্ব পরাশক্তিগুলো। দোষারোপ করছে একে অপরকে। পরিস্থিতির অবনতি ছাড়া উন্নতির কোন লক্ষণ নেই।


সারাক্ষণ ঘরে বন্দী থাকতে থাকতে জীবনটাকে প্রায় খাঁচায় বন্দী পাখির জীবনের মত মনে হচ্ছে। প্রায় আড়াই মাস হতে চলল এ জীবন। কবে শেষ হবে তাও অজানা। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার যাতনা আরও বেশি। শিক্ষাঙ্গন আর শিক্ষার্থীদের মাঝে কাটত যে জীবন, কোমল-মতি শিক্ষার্থীদের কোলাহলে মুখরিত থাকত যে সময়, পরীক্ষার ডিউটি আর ক্লাস নিতে নিতে পার হত যে দিনগুলো- আজ সবই যেন থেমে গেছে, হারিয়ে গেছে কোন এক দূর অজানায়, ভাষাহীন বোবা কান্নায় স্থবির এক জীবন হয়ে উঠেছে নিত্য সঙ্গী। হয়তো শ্রেণিকক্ষে এখন আস্তানা গেড়েছে মাকড়শা আর অযাচিত কীটপতঙ্গ, বেঞ্চ-টেবিলে জমেছে ধূলির স্তূপ, সিঁড়িগুলো হয়েছে মলিন, খেলার মাঠের কচি ঘাসগুলো এখন হয়েছে আরও বেয়াড়া আমাদের অনুপস্থিতিতে। রাজত্ব এখন শুধুই তাদের। আমরা রাজ্যহীন।


চলে গেল রমযান। চলে গেল ঈদ। স্মৃতিময় ঈদ। নামাজ হলো ঘরের ছাদে। কাটলো বন্দী দিন। পরিবার-পরিবারজন থেকে বিচ্যুত এক ঈদ। কোলাকুলি হলো না, হ্যান্ডশেক হলো না, দাওয়াত দেওয়া হলো না, দাওয়াত খাওয়া হলো না, ঘুরাঘুরি হলো না, হলো না কোন কিছু। একাকী কাটলো দিন।
জানি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে, ঠিক হয়ে যাবে পৃথিবীর অসুখ। কর্ম উদ্দীপনা আর প্রাণ চঞ্চলতায় মুখরিত হবে পুরো পৃথিবী। মানুষ ফিরে পাবে তার স্বাভাবিক জীবন, হাসি আনন্দ আর কল-কোলাহলে ভরে উঠবে সে জীবন। শুধু থাকবে না চেনা পরিচিত কিছু মুখ। হয়তো আমি, আপনি অথবা আমাদের কেউ। স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে কাটবে সে জীবন। আনন্দ আর অশ্রুতে ভরা সে জীবন।

লেখকঃ শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 66 times, 1 visits today)