“করোনাকাল ও আমাদের ঈদ” – সালাম তাসির –

দশ পয়সার কাগজের টুপি আর মায়ের হাতে তৈরি সেমাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে। ছোট-বড় ধনী-দরিদ্র সব এক কাতারে ঈদগাহ ময়দানে নামাজ আদায়ের আনন্দ এখনো মনে অন্যরকম অনুভূতি জাগায়। আমার শৈশব, কৈশোরের কথা খুব মনে পড়ে বাবার হাত ধরে সাত মাইল পথ পায়ে হেঁটে শহরে যেতাম লাল রঙের কাগজের টুপি কেনার জন্য।
তারপর জীবনে বহুবার ঈদ এসেছে। মানুষের ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ অনাবিল সুখের বার্তা বয়ে এনেছে। তখন গ্রামের ঈদ অন্য এক অনুভূতির জন্ম দিতো নিয়ে যেতো অন্য এক উচ্চতায়। ঈদগাহ ময়দানে সব ব্যবধান ভুলে ধর্মপ্রাণ মানুষের মিলন ক্ষেত্র তৈরি হতো।

১৯৭১ সালের কথা মনে পড়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এমন একটা ঈদ এসেছিল নভেম্বরে মুক্তিকামী জনতা বুক ভরা বেদনা নিয়ে ঈদগাহে গিয়েছিল তবে সবাই যেতে পারেনি সেদিন।
দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে
২০২০ সাল আমরা করুনাকাল অতিক্রম করছি। প্রতিদিন লাশের লাইন দীর্ঘ হচ্ছে আমরা মৃত্যুকে বহন করে চলেছি অহর্নিশ। ঠিক সেই মুহুর্তে মহামারী করোনার সাথে যুক্ত হলো সুপার সাইক্লোন আম্পান। উপকূলবর্তী মানুষ মনে যতটুকু ঈদ আনন্দ জিইয়ে রেখেছিল তাও আম্মান ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তাদের ন্যুয়ে পড়া ঈদের শেষ আনন্দটুকু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে আম্মান। ভেসে গেছে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় টুকু।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে প্যানডেমিক রোগ স্মল পক্সে গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাকটেরিয়া বাহিত রোগ প্লেগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মারা যায় প্রায় ৫ কোটি মানুষ । ঐ অঞ্চলে প্রায় ২০০ বছর ধরে এর তাণ্ডব অব্যাহত থাকে। পরবর্তীতেও বিশ্বে বিভিন্ন সময় কুষ্ঠ, কলেরা ফ্লুয়ের মত রোগ মহামারী আকার ধারণ করেছে। প্রায় একশত বছর আগে ১৯১৮ সালে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে স্প্যানিশ ফ্লু এতেও প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ কারো কারো মতে আরো বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
২০২০সালে মহামারী করোনা নতুন রূপে মৃত্যু ঘন্টা বাজিয়ে চীনের উহান প্রদেশে মৃত্যুক্ষধা নিবৃত করে। তারপর সারা বিশ্ব কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। মৃত্যুভয় মানুষের এখন নিত্যসাথী। বিশ্বে এখন মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখ ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে আমরা জানি না। আমাদের দেশে শুরু হওয়া করোনা তাণ্ডবে প্রায় ৫ শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। রমজানের চাঁদ উঠল রমজান শুরু হলো মানুষের মনে আশা জেগেছিলো হয়তো আল্লাহ রোজার উছিলায় সব মাফ করে দিবেন।
মুসলমানদের বড় উৎসব ঈদুল ফিতর এবার করোনা কালীন মানুষের মনে তা কোন আনন্দের যোগান দিতে পারছেনা। সবসময় ঠোঁটের কোণে মানুষের মৃত্যুভয়। সে কারণে এবারের ঈদ মোটেও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠবে না। সরকারি নির্দেশ মতে মানুষকে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকার পরামর্শ দেয়া হয় তারপর আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকলে দেশের সব শহর, বন্দর, হাট বাজার লকডাউন এর ঘোষণা দেয়া হয়। সীমিত আকারের নিত্যপ্রয়োজনীয় দোকান খোলা থাকলেও ঘর বন্দী মানুষ অসহায় জীবন যাপন করছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী হিমশিম খাচ্ছে। মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়োজিত ডাক্তার,নার্স, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যগণ জীবন দিয়ে জীবন বাঁচানোর যুদ্ধে নেমেছে। অথচ আমরা নিজের জীবন রক্ষায় মোটেও সচেতন নই। ঈদে ঘরমুখো মানুষের ঢল দেখে মনে হয় হায়রে বাঙালি নাড়ির টান মৃত্যুকেও পরোয়া করছে না।

ছোঁয়াচে রোগ করোনার হাত থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য দেশের সকল ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাত বন্ধ রাখার ঘোষনা এসেছে। তবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বিভিন্ন মসজিদে এক বা একাধিক ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হতে পারে। এমনকি নিজ গৃহেই ঈদের নামাজ আদায় করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রেও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার সুযোগ থাকছে না কারণ নামাজ শেষে করমর্দন কিংবা কোলাকুলি নিরাপদ নয়।যে কোন ভাবে মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।

এবারের ঈদে নতুন জামা কাপড় নেই। তাতে দুঃখ নেই কারণ আনন্দ সম্পূর্ণ মানসিক বাহ্যিক নয়। তবে এবারের ঈদ আনন্দ ম্লান করে দিয়েছে স্বজন হারানোর বেদনায়। তবু আমরা আশাবাদী নির্মুল হবে করোনা বেদনার নীল জলে ভেসে উঠবে নতুন সূর্য। মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে নতুন পৃথিবী।

আমরা জানি জীবন একটাই তাই বেঁচে থাকাটা জরুরী। সেদিন খুব দূরে নয় আমাদের মাঝে আবার সুদিন ফিরে আসবে তাই আতঙ্কিত নয় মানুষকে সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। মাস্ক ব্যবহার এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার অথবা সাবান দিয়ে বারবার হাত ধুয়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সংগনিরোধ আইন মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া যাওয়া বন্ধ রাখতে হবে। আমরা জানি আঠারো শতকে স্প্যানিশ ফ্লু থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক ব্যবহার যথেষ্ট কার্যকরী ভূমিকা রেখেছিল। আমরা ভুল করেও যেন ভুলে না যাই অতীত।
এবার ঘরে ঘরে হোক আমাদের ঈদ উৎসব। আগে জীবন তারপর উৎসব। মনের আনন্দে বেঁচে থাকি কারণ বেঁচে থাকার আনন্দ যে কোন উৎসবের চেয়ে সহস্রগুণ বেশি।।

সালাম তাসির
কবি, গীতিকার,নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক।
২৪ মে ২০২০

(Visited 60 times, 1 visits today)