অপার সম্ভাবনার রাজবাড়ী – লেখকঃ শিপন আলম –

প্রত্যেক জেলায়ই স্রষ্টা প্রদত্ত কিছু অপার সম্ভাবনা রয়েছে যার সুষ্ঠু এবং যথোপযুক্ত ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে ঐ জেলাটি সমাজ,সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধনের মাধ্যমে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। এছাড়া জেলায় বসবাসরত জনসাধারণের আন্তরিক প্রচেষ্টাও তাদের সামনে নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ গঠিত একটি নবীন জেলা হিসেবে রাজবাড়ী’র উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু সম্ভাবনা হাতছানি দিচ্ছে যেগুলোর কিছু কাজ চলমান রয়েছে আর কিছু কাজ ভবিষ্যতে হবে বলে আশা করা যাচ্ছে এবং এগুলো বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে কিরূপ উন্নতি সাধিত হবে আজকের প্রবন্ধে সেসব নিয়ে জানার চেষ্টা করবঃ

(ক) রাজবাড়ী টু কুষ্টিয়া হাইওয়ের ২ লেন থেকে ৪ লেনে উন্নীতের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কাজটি শেষ হলে জনসাধারণের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সময় সাশ্রয় হবে। জীবনমান ও অর্থনৈতিক কাজে গতিশীলতা আসবে।

(খ) রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের চর-বাগমারা এলাকায় ১৩০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষম বিদুৎ উপকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালের মার্চ মাসে শুরু হয়েছে। এটি সমাপ্ত হলে বিদ্যুতের জন্য রাজবাড়ীবাসীকে আর ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া জেলার করুণার দিকে চেয়ে থাকতে হবে না। এর ফলে শিল্প, কৃষি ও শিক্ষাসহ সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন সাধিত হবে।

(গ) জেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী রাজবাড়ীতে ৩ টি বৃহৎ শিল্প, ৬ টি মাঝারি শিল্প, ৭১২ টি ক্ষুদ্র শিল্প এবং ৫,৫৬৫ টি কুটির শিল্প রয়েছে। রাজবাড়ী বিসিক শিল্প নগরীতে অন্তর্ভুক্ত মিলের সংখ্যা ৪৯ টি। বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে এ সকল শিল্প কারখানা প্রত্যাশিত উৎপাদন করতে পারে না। বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শেষ হলে এসকল কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন কাজ শুরু হবে। ফলে কর্মসংস্থানসহ স্থানীয় পণ্যের চাহিদা অনেকটাই পূরণ হবে তখন।

(ঘ) জেলার পাংশা থানার কসবামাজাইল ইউনিয়নের নাদুরিয়া ও মাগুরা জেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের লাঙ্গলবাঁধ পয়েন্টে মধুমতী নদীর ওপরে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আধা কি.মি. বিশিষ্ট সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। এটি সমাপ্ত হলে মাগুরা, ঝিনাইদহ, যশোরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার সাথে সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে।

(ঙ) জেলার ধাওয়াপাড়া ও পাবনার নাজিরগঞ্জ রুটে বর্তমানে একটি ফেরি চালু আছে। সেটিও সকাল-সন্ধ্যায় মাত্র দু’বার আসা যাওয়া করে। এ পয়েন্টে ফেরির সংখ্যা বাড়ানো গেলে দক্ষিণ বঙ্গের সঙ্গে উত্তর বঙ্গের বিভিন্ন জেলার সড়ক যাতায়াত ব্যয় অনেক সাশ্রয় হবে।

(চ) পূর্বেই বলা হয়েছিল ঐতিহ্যগতভাবেই রাজবাড়ী রেলের শহর নামে পরিচিত। ১৮৭১ সালের ১ জানুয়ারিতে রাজবাড়ীতে রেলসংযোগের পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রুটে রেল সংযোগ স্থাপিত হলেও রাজবাড়ী রেলওেয়ের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ আসে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে। সেদিন বর্তমান রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন রাজবাড়ীতে দক্ষিণাঞ্চলীয় রেলওেয়ের বিভাগীয় কার্যালয় ও কারখানা স্থাপনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেন। খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চল মিলে রেলওয়ের দক্ষিণাঞ্চল গঠিত যার সদর দপ্তর হবে ফরিদপুরে। রাজবাড়ী থেকে দর্শনা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু করা হবে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে রাজবাড়ীতে এক ধরণের বিপ্লব সাধিত হবে।
নিজ জেলায় বিভাগীয় কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণা না আসায় খুলনাবাসী বড় ধরণের আপত্তি জানিয়েছে। সেদিকে রাজবাড়ীর মাননীয় জনপ্রতিনিধিগণ ও রাজবাড়ীবাসীকে অবশ্যই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যাতে প্রস্তাবিত বিভাগীয় কার্যালয় কোনভাবেই হাত ছাড়া হয়ে না যায়।

(ছ) রাজবাড়ীবাসীর প্রাণের দাবি ছিল গোয়ালন্দ-পাটুরিয়ায় প্রথম পদ্মা সেতু নির্মান। কিন্তু সেটি যেহেতু অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও স্থান বিবেচনায় মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টে হচ্ছে তাই দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর দ্রুত বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কোন গত্যন্তর নেই। প্রথম পদ্মাসেতুর কাজ প্রায় ৮১ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ায় সরকার এখন দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। গত বছরের ২২ জুলাই তারিখে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন- এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী প্রস্তাবিত এ সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ৬.১০ কিলোমিটার এবং ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে সম্মতি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তবে অর্থসংস্থানের ব্যাপারে সরকার কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও প্রকল্পের প্রস্তাব ইতোমধ্যে অনুমোদন করেছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোর সাথে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হবে। রাজবাড়ী পরিণত হবে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অন্যতম আধারে। গ্যাস সরবরাহ সহজ হবে। নতুন নতুন কলকারখানা গড়ে উঠবে। রেলপথকে সম্প্রসারিত করে ঢাকার সাথে সংযুক্ত করা সম্ভব হবে। রাজবাড়ীবাসী জেলায় অবস্থান করেই ঢাকায় অফিস আদালতে অংশ নিতে পারবে। মোটকথা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজবাড়ীর বর্তমান অবস্থার অনেক উন্নয়ন সাধিত হবে।

(জ) রাজবাড়ীবাসীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় প্রকল্প ছিল পদ্মা ব্যারেজ। রাজবাড়ী ছাড়াও এ ব্যারেজের সরাসরি সুফল ভোগ করত দেশের ৩৭ শতাংশর এলাকা ও সেখানকার মানুষ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখ লাখ হেক্টর একর জমি এক ফসলি থেকে তিন ফসলিতে পরিণত হতো। সেচের লবণাক্ততা দূর হতো। নদী তার স্রোত ফিরে পেত। উদ্ধার হতো হারানো নৌ-পথ। সুন্দরবনের প্রাণ ও প্রকৃতিও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেত। প্রকল্পের সমীক্ষা ও বিস্তারিত ডিজাইন তৈরির কাজও সমাপ্ত হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎই প্রকল্পের স্থান ও জরিপে ত্রুটির অভিযোগে প্রকল্পটির কাজ স্থগিত হয়ে যায়। প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এখন চেষ্টা চলছে বিদ্যমান ত্রুটিগুলো দূর করে ভারতের সাথে যৌথ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা। রাজবাড়ীতে এটি বাস্তবায়ন হলে রাজবাড়ী বিশেষত পাংশা উপজেলার পর্যটনসহ সার্বিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হবে।

(ঝ) পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের স্থান নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক থাকায় এটি রাজবাড়ীতে নাও হতে পারে। আবার প্রথম পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পর দ্বিতীয় পদ্মাসেতুর গুরুত্ব যেহেতু কিছুটা কমে যাবে এবং সরকারের ওপর তা দ্রুত বাস্তবায়নের চাপও অনেকটা প্রশমিত হবে। ফলে এটিও বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে রাজবাড়ীবাসীর উন্নয়নের জন্য একটি ভাল মানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে পারে উত্তম বিকল্প। এতে করে জেলায় শিক্ষার উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও অগ্রগতি সাধিত হবে। তাই জনপ্রতিনিধিসহ আমাদের সবারই এ ব্যাপারে আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিৎ।

(ঞ) পদ্মা আমাদের জন্য যেমন অভিশাপ তেমনি আশীর্বাদও বটে। রাজবাড়ীবাসীর উল্লেখ করার মত পর্যটন স্থান এই পদ্মাই। বিপুলা সম্ভাবনাময় এই পদ্মাকে আমরা যদি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি তাহলে তার থেকে আমরা অনেক কিছুই পেতে পারি। পদ্মার পাড়ে বসত বাড়ির কাছাকাছি ফসলের পাশাপাশি আমরা গবাদি পশু-পাখির খামার করতে পারি। বাহাদুরপুরে হেনা সাহেবের বাড়ির কাছে এমন কৌশল কাজে লাগিয়ে সেখানে বেশ কয়েকটি গরুর খামার ও হাঁসের খামার গড়ে উঠেছে। এমনকি নদীর মাঝে ভরাট জায়গায়ও হাসের খামার রয়েছে সেখানে। একদিকে উর্বর মাটিতে ফসল ফলছে। অন্যদিকে গবাদিপশুর চাষ হচ্ছে। হাসের খামার থেকে হাসগুলো পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে। এ কৌশল পদ্মার পাড়ের প্রত্যেকটি পয়েন্টে কাজে লাগানো যেতে পারে। নদীতে যাতে শুকনো মৌসুমেও মাছ চাষ করা যায় সে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে কাজে লাগাতে হবে। তবেই প্রকৃতি প্রদত্ত পদ্মার সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন করা সম্ভব হবে। সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান, দূর হবে বেকারত্বের অভিশাপ।

(ট)১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মনোয়ার হোসেন খোকন পরিচালিত ওমর সানি-মৌসুমী অভিনীত ‘ঘাত-প্রতিঘাত’ ছায়াছবির একটি জনপ্রিয় গান ছিল-
“নাই নাই নাইরে সারা দেশে নাই
তোমার মনের মত মন আর নাই
তুমি টাঙ্গাইলের চমচম, বগুড়ার দই
নাটোরের কাঁচাগোল্লা, যশোরের খই…”
এ গানটিতে প্রায় ১৮ টি জেলার প্রত্যেক জেলায় উৎপাদিত বিখ্যাত খাবারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফরিদপুরের ‘গুড় মিঠা’র কথাও গানে বলা হয়েছে কিন্তু দুঃখের বিষয় রাজবাড়ীর কোন কিছুর উল্লেখ নেই। হয়তো রাজবাড়ী’র শঙ্কর ও নির্ম্মল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের চমচম সে সময়ে এতো জনপ্রিয় ছিল না যেমনটি বর্তমানে আছে। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু বাড়ি শেরপুরে সেও রাজবাড়ীর চমচমের সুখ্যাতি জানতে পেরে তাকে পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। তাই আমাদের চমচমের যে উঠতি জনপ্রিয়তা সেটি ধরে রাখার জন্য ও এর মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধির জন্য আমাদের নিজেদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতে হবে যাতে এর মালিক ও কারিগর অধিক মনোযোগ দিয়ে চমচম বানাতে পারে। ১৯৯৬ সালের ছায়াছবির গানে রাজবাড়ীর নাম উল্লেখ না থাকলেও ২০২৬ সালের কোন ছায়াছবিতে যেন টাঙ্গাইলের জায়গায় রাজবাড়ীর নাম আসে তার জন্য আমাদের এখন থেকেই সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এছাড়া ভবেশের দই, শশাঙ্ক চানাচুর, খেজুরের গুড়ের ক্ষেত্রেও এ প্রচেষ্টা চলমান রাখতে হবে।

উপসংহারে বলতে চাই, রাজবাড়ীর টেকসই উন্নয়নের জন্য বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো ছাড়া অন্য কোন শর্টকার্ট বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের অব্যাহত আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সঠিক পদক্ষেপ, সুষ্ঠু পরিকল্পনা আর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে রাজবাড়ী’র উন্নয়নের চাকা চলমান থাক এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক ঃ শিপন আলম
প্রভাষক, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ,
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ।

(Visited 178 times, 1 visits today)