বৃদ্ধ খবির উদ্দিনের তৈরী করা মোটর সাইকেল দেখে সকলেই অবাক

আল মামুন আরজু/ নজরুল ইসলাম :

বৃদ্ধ খবির উদ্দেনের তৈরী করা মোটর সাইকেল।

বৃদ্ধ খবির উদ্দেনের তৈরী করা মোটর সাইকেল।

“হঠাৎ প্রধান সড়কে চলতে দেখা গেল একটি মোটর সাইকেল। ওই মোটর সাইকেলটি দেখে আশপাশের লোকজনতো অবাক। এ আবার কেমন মোটর সাইকেল। নেই তেমন কোন শব্দ, বেড় হচ্ছে না কোন ধোঁয়া।” উৎসুক মানুষ এগিয়ে গেলেন তার কাছে বললেন, এ আবার কেমন মোটর সাইকেল। আর এমন মোটর সাইকেল পেলেনইবা কোথায় ? এক গাল হেঁসে বৃদ্ধ বললেন, “পাব কোথাই, নিজেই বানাছি।” এ কথা শুনে উপস্থিত সকলেই হলেন হতবাক। বলছিলাম রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের গোয়ালপাড়া গ্রামের মৃত মোনতাজ উদ্দিন মোল্লার ছেলে খবির উদ্দিন মোল্লা (৭০)-এর কথা।
রাজবাড়ী জেলা শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে আদালত চত্বর ওই মোটর সাইকেল চলিয়ে আসতে দেখা যায় বৃদ্ধ খবির উদ্দিনকে। তিনি বলেন, স্থানীয় প্রযুক্তিতে ব্যাটারী দিয়ে যদি অটোরিকশা ও নছিমন তৈরী করে সড়কে চলা সম্ভব হয়, তবে কেন মোটর সাইকেল বানিয়ে তা চালানো সম্ভব হবে না। দুই মাস পূর্বে এমনি চিন্তা থেকেই তিনি স্থানীয় প্রযুক্তিতে মোটর সাইকেল তৈরীর কাজ শুরু করেন। বাড়ীতে থাকার তার একটি পুরাতন ইয়ামাহা মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন খুলে ফেলেন। শুরু করেন, পরীক্ষা নিরিক্ষা। এক পর্যায়ে সংগ্রহ করেন ১২ ভোল্টের ৪ টি ব্যাটারী ও একটি ৪৮ ভোল্টে চলা মোটর। মাপ ঝোক দিয়ে মোটর সাইকেলটি নিয়ে যান তিনি ওয়ার্কসপে। আর ওই ওয়ার্কসপে যওয়ার পরই ঘটে বিপত্তি। ওয়ার্কসপ মালিকসহ শ্রমিকরা শুরু করে তার সাথে হস্য রহস্য। তারা বলে “চাচা পাগল হয়ে গেলেন নাকি”। তবে তিনি তাদের সে কথার দেননি কোন পাত্তা। বলেন, মোটর সাইকেলের সামনের দিকে লোহার মোটা পাতি দিয়ে খাঁচা বানিয়ে দিতে। এক পর্যায়ে ওয়ার্কসপ মিস্ত্রীরা খাঁচা বানিয়ে দেন এবং তিনি মোটর সাইকেলটি নিয়ে বাড়ীতে ফিরে আসেন। রং চং করাসহ ২০/২৫ দিন প্রচেষ্টার পর মোটর সাইকেলটি সচল করতে তিনি সক্ষম হন। তাতে সংযোগ করেন, হেড লাইট ও গতি দেখার মিটার। সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে তার ১৪ হাজার টাকা। গত এক মাস ধরে তার তৈরী এ মোটর সাইকেলটি তিনি চালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কখনো একা, কখনো এক জন যাত্রী নিয়ে। এখন তার মোটর সাইকেলের গতি ৪০ থেকে ৫০ কিলো মিটার বেগে চলতে সক্ষম। মাত্র ৪ ঘন্টা চার্জ দিলে তা ৫০ থেকে ৬০ কিলো মিটার চলে। বিদ্যুৎ বিল বাবদ খরচ হয় মাত্র ১০ টাকা। আর ১০ টাকা খরচে তিনি মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ান। আসেন ১৫ কিলো মিটার দুরে থাকা জেলা শহরেও। গতকাল যখন তিনি এ মোটর সাইকেলটি চালিয়ে রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হন তখন ঘড়িতে বাজে সকাল ৯ টা। আর পথে যে দেখেছে, সেই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছে মোটর সাইকেলটি। মানুষের পিড়া পিড়তে থামতে হয়েছে তার ৩ টি স্থানে। সে সব স্থানে মোটর সাইকেল তৈরী ও চালানোর বিষয়ে দিতে হয়েছে ব্যখ্যা। তবে এতে তিনি মহা খুশি। মানুষকে অবাক করে মোটর সাইকেল চালানোর মজাই আলাদা। যদিও প্রথম দিকে তিনি মানুষের জিজ্ঞাসার জবাব দিতে কিছুটা বিরক্ত হতেন, তবে এখন তা আর হন না। মানুষের শত প্রশ্নের জবাব দিতে তার এখন ভালই লাগে।
তিনি আরো বলেন, তার ৩ মেয়ে, ২ ছেলে সন্তান রয়েছে। মেয়েদের দিয়েছেন বিয়ে আর ছেলেরা করেন ভাল চাকুরী। বাবা মোটর সাইকেল চালানো প্রতি অধিক ঝোক দেখে সন্তানরা কিনেও দিয়েছেন নতুন একটি মোটর সাইকেল। তবে তাতে তিনি সন্তুষ্টু নন। কারণ মোটর সাইকেল থেকে বের হয় ধোঁয়া, আর হয় শব্দ। কিনতে হয় তেল। এখন তার সে রকম কোন সমস্যা নেই। নতুন মোটর সাইকেলটি বাড়ীতে রেখে দিয়ে নিজের তৈরী মোটর সাইকেল নিয়েই তিনি ঘুড়তে বেশি পছন্দ করেন। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় বাজারে তার স’মিল ও রাইস মিল রয়েছে। তবে এখন তা তিনি পরিচালনা করেন না। সে গুলো দিয়েছেন ভাড়া। বাড়ীতে তিনি ও তার স্ত্রী থাকেন। যদিও স্ত্রী তার চাওয়া পাওয়ায় দেন না কোন বাঁধা। যে কারণে মনের আনন্দে করেন তার চিন্তার বাস্তবায়ন। এখন তার চিন্তা এ মোটর সাইকেলটির গতি বৃদ্ধি করা। সে কাজই করছেন তিনি। আশা করছেন কয়েক মাসের মধ্যেই এ মোটর সাইকেলের গতি ৭০ থেকে ৮০ কিলো মিটার করা সম্ভব হবে।

(Visited 44 times, 1 visits today)