কালুখালী উপজেলার উর্বর জমিতে এখন চৈতালী ফসলের সমারোহ

লিটন চক্রবর্তী, রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

9tled-1

জেলার শস্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার উর্বর জমি গুলোতে এখন চৈতালী ফসলের সমারোহ। শীত মৌসুমের অগ্রহায়ন ও পৌষ মাসে আবাদ করা এই ফসল চৈত্র মাসে ঘরে তোলা হয় বলে একে চৌতালী ফসল বলা হয়। এ অঞ্চলে সাধারণত মশুর, ছোলা, শরিশা, গম, পেয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন ধরণের ডাল ও তেল জাতীয় চৈতালী ফসলের আবাদ হয়।

বরাবরের মত সকল ফসলের বাম্পার ফলনের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত কালুখালী উপজেলার মাঠের পর মাঠ আবাদ করা হয়েছে বিভিন্ন চৌতালী ফসল। কৃষকেরা তাদের ক্ষেত গুলোতে প্রয়োজনীয় সেচ, স্প্রে, নিড়ানো, পেয়াজ ক্ষেতে কোপ দেয়া, সার প্রয়োগসহ নানা ধরণের পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন বাম্পার ফলন পাওয়ার আশায়।
কালুখালী উপজেলার সিবানন্দপুর, গড়িয়ানা, রতনদিয়া ও মৃগির কাসাদহ গ্রামে মাঠের পর মাঠ ঘুরে দেখা গেল চৌতালি ফসলের সমারোহ। বেশির ভাগ এলাকায়ই ফসলের আবাদের অবস্থা ভাল হলেও কোথাও কোথাও রোগাক্রান্ত ফসলও দেখা গেছে। তবে পেয়াজের অবস্থাই করুণ। বেশির ভাগ স্থানে পেয়াজের গাছ গুলো মরে যাচ্ছে এবং পাতায় পচন লেগেছে। কিটনাশকেও কাজে আসছেনা। তবে পেয়াজের ক্ষেতে যারা ভার্মি কম্পোষ্ট (কেচো সার) প্রয়োগ করেছেন তাদের পেয়াজ ক্ষেত সুন্দর হয়েছে এবং তেমন কোন কিটনাশক বা সার দিতে হয়নি।
কথা হয় মদাপুর ইউনিয়নের সিবানন্দপুর গ্রামের তোমছেল বিশ্বাসের সাথে। তিনি প্রায় ৫ পাখি জমিতে মশুর ও কিছু রায় শরিষা আবাদ করেছেন। আবাদের শুরুতে প্রচন্ড খড়ার কারণে কয়েক দফা অতিরিক্ত পরিমান সেচ দেয়ায় ব্যয় বেড়ে গেছে। এর পর ঘনকুয়াশার কারণে মহামারির মত জাব পোকাসহ বিভিন্ন পেকামাকড়ের আক্রমণে কিছুটা ক্ষত্রিগ্রস্থ হলেও একাধিক কিটনাশক প্রয়োগ করে তা প্রতিরোধ করা হয়। তবে বর্তমানে তার ক্ষেত ছাড়াও সকল মশুর ও শরিষার গাছ গুলোর অবস্থা বেশ ভাল। তিনি বলেন, খরচ কিছুটা বেশি হলেও কৃষকেরা এবার মশুর ও শরিষা আবাদে বাম্পার ফলনের আশাবাদী। এছাড়া তিনি অভিযোগ করে বলেন, এবার পোকামাকড় দমনের ক্ষেত্রে স্থানীয় কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা মাঠে আসেনইনি। ওই চাষী বলেন, আগামী মৌসুমে ফসলের ক্ষতিগ্রস্থ করার আগেই সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের কর্তাব্যক্তি না হলেও ওই অফিসের অন্নত কেউ যেন খোঁজ নেয়। নইলে অনভিজ্ঞ অনেক কৃষক কথিত ডিলারদের কথামত ভুল বা ক্ষতিকর কিটনাশক বা সার ইত্যাদি প্রয়োগ করে উল্টা ক্ষতি গ্রস্থ হতে পারে।
ওই মাঠের পাশ্ববর্তী মোল্লা বাড়ী গ্রামের যুব কৃষক রাজিব মিয়া জানান, তিনি এবার ২৫ শতাংশের এক পাখি জমিতে পেয়াজ লাগানোর পর সেচ দিলে পুরো জমির পেয়াজের চারা গোড়া পচে মারা গেছে। সে ওই জমিতে আবারও নতুন করে পেয়াজের চারা বপন করে যাচ্ছেন নিজ বুদ্ধিতে।
অপর এক সেরা পেয়াজ আবাদকারী কৃষক গড়িয়ারা গ্রামের মকবুল মোল্লার সাথে পেয়াজ গাছের পরিচর্যারত অবস্থায় কথা হয়। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে পেয়াজ রসুন আবাদ করে আসছেন। এবারও তিনি প্রায় তিন একর জমিতে পেয়াজ আবাদ করেছেন। তিনিও পেয়াজ আবাদ করে এবার বিপাকে পরেছেন বলে জানান। তিনি বলেন শুরু থেকেই তার পেয়াজ ক্ষেতে একাধিক রোগ বালাই লেগেই আছে। বর্তমানে চলছে পেয়াজ গাছের মাথা পোড়া রোগ। তরতাজা পেয়াজ গাছের মাথার অংশ যেন আগুনে পুড়ে গেছে। তার অভিযোগ কৃষি বিভাগের কোন রকম পরামর্শ না পেয়ে তিনি ডিলারদের কথামত এবং নিজ অভিজ্ঞতা থেকে ৫/৭টি কোম্পানীর কীটনাশক ও ওষুধ প্রয়োগ করেও সমাধান করতে পারেনি। বরং মাথার পোড়া অংশ আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে পেয়াজ আবাদে একই উপজেলার মৃগী ইউনিয়নের হোগলাডাঙ্গী গ্রামের আলম মন্ডল দশ একর জমিতে পেয়াজ আবাদ করেছেন পাশ্ববর্তী কাসাদহ গজারিয়া বিলে। তিনি ছাড়াও এই বিলে অন্তত দুই হাজার একর জমিতে এবার স্থানীয় মূল অর্থকারী ফসল পেয়াজের আবাদ করা হয়েছে। তিনি জানান, বিল এলাকার কারণে এই জমি উর্বর বলে বরাবরই পেয়াজের বাম্পার ফলন হতো। তবে ইদানিং জমিটিতে তেমন উর্বরতা শক্তি নেই। তাই তারা বেশ কয়েকজন কৃষক মিলে তাদের একটি সমবয় সংগঠনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়ে কেচো আমদানী করে ভার্মি কম্পোষ্ট তৈরী করে তা নিজ জমিতে প্রয়োগের পাশাপাশি অন্য পেয়াজ চাষীদের কাছে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করছে। যে সব চাষী তাদের পেয়াজের ক্ষেতে এই কম্পোষ্ট প্রয়োগ করেছেন তাদের পেয়াজ গাছ গুলো হয়েছে তড়তাজা। আর তেমন কোন সার বা কিট নাশকও দিতে হয়নি। অপরদিকে একই মাঠের যে সব ক্ষেতে কেচো সার প্রয়োগ করেনি তাদের গাছ গুলো একাধিকবার সার ও কিটনাশক ছিটিয়েও তেমন ভাল হয়নি।
এদিকে উপজেলার কৃষি ব্যবস্থার কর্ণধর কর্তৃপক্ষ কালুখালী কৃষি অফিসের কৃষক কুলের দুরঅবস্থা বা কর্তব্য অবহেলার বিষয়টি ভিত্তিহিন ববলে দাবী করেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাছিদুর রহমান। তিনি বলেন, নিজ নিজ এলাকায় কৃষি অফিসাররা সার্বক্ষনিক ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষকদেও সমস্য সময়মত সমাধানসহ জরুরী তথ্য পৌছে দেয়া ইত্যাদি। সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করার পূর্বেই উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত ছুটে যাচ্ছেন প্রতিটি ক্ষেতে। তবে পেয়াজ ক্ষেতে কিছু রোগ বালাই দেখা যাচ্ছে। সমস্যা যুক্ত এলাকায় গিয়ে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, যারা ব্যবস্থাপত্র অনুসারে সঠিক ওষুধ ও সার সহ পরিচর্যা করছেন তারাই লাভবান হচ্ছেন। আর যারা মানছেন না তারা লোকসানের শিকার হলে আমাদের কি করা।
কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এবার চৌতালী ফসলের বেশির ভাগই লক্ষমাত্রার চেয়ে অধিক হয়েছে। আরো আবাদ অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে মশুর আবাদ হয়েছে ১১ শত হেক্টর জমিতে, শরিষা প্রাায় ৩ শত হেক্টর জমিতে, গম আবাদ হয়েছে ২ হাজার হেক্টর জমিতে, পেয়াজ আবাদ হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার ও রবি ফসল বোর ধানের আবাদ অব্যাহত রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে।
কৃষি অফিসের দাবী চলতি রবি মৌসুমে আবাদকৃত চৈতালী ফসলের মধ্যে উৎপাদনের সম্ভবনা রয়েছে মশুুর প্রায় ১৫ শত মেট্রিক টন, শরিষা ৩শত, গম ৬ হাজার, পেয়াজ ৬৫, রোরো ধান উৎপাদনের সম্ভবনা রয়েছে ২ হাজার মেট্রিক টন।
উল্লেখ্য, কৃষি কর্মকর্তা জানালেন, কৃষকদের প্রতি পরামর্ষ দেয়া হয়েছে যাতে তারা ভার্মি কম্পোষ্ট ব্যবহারে মৃগির কাসাদহ এলাকার চাষীরা অধিকও রোগ মুক্ত পেয়াজসহ নানা ফসল চাষ করছেন। রোগ বালাই কমও উৎপাদন অধিক হওয়ায় শুরুমাত্র পেয়াজেই নয় সব ফসলেই ভার্মি কম্পোষ্ট প্রয়োগে ভাল ফলন পাওয়া সম্ভব বলে সকলকে তা ব্যাহারের পরামর্শ দেন।

(Visited 160 times, 1 visits today)