শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে কালুখালী এবং বালিয়াকান্দির কলেজ ও স্কুল মাঠে চলছে বিজয় মেলা

 রাজবাড়ী বার্তা ডট কম :

8tl000ed-1

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলার দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ দখল করে চলছে বিজয় মেলা। এর ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ দখল করে এ ধরনের মেলার আয়োজন করা যাবে না।

এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা প্রশাসন বালিয়াকান্দি কলেজ ও কালুখালী উপজেলার রতনদিয়া রজনীকান্ত উচ্চ বিদ্যালয় (পাশাপাশি রতনদিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) মাঠে মেলার অনুমোদন দিয়েছে। অনুমোদন পেয়েছে বালিয়াকান্দি ও কালুখালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। তবে খাতাকলমে তারা থাকলেও মূলত কালুখালীর মেলা পরিচালনা করছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী সাইফুল ইসলাম। বালিয়াকান্দির মেলা পরিচালনা করছেন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নুর আহম্মেদ আল মাসুদসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা। যদিও মেলায় জেলা প্রশাসন শুধু সার্কাস চলার অনুমোদন দিয়েছে। তবে আয়োজকরা সেটি মানছেন না। তাঁরা অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিতে লাকি কুপন, হাউজিসহ নানা ধরনের জুয়া এবং সার্কাসের নামে অশ্লীল নৃত্যের আয়োজন করেছেন।

কালুখালী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আকামত আলী বলেন, ‘খাতা-কলমে আমরা মেলার আয়োজক হলেও পুরোটাই দেখভাল করছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। আমরা উপজেলার সোনাপুর মোড়ে একটি বিজয় স্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। মূলত এ মেলার আয় থেকে কিছু টাকা বিজয় স্তম্ভ নির্মাণের জন্য দেওয়া হবে।’ তবে জুয়ার টাকায় বিজয় স্তম্ভ নির্মাণের বিষয় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। তাঁর একটাই কথা, ‘সব জানেন সাইফুল চেয়ারম্যান।’

রতনদিয়া রজনীকান্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, ‘বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি হলেন উপজেলা চেয়ারম্যান কাজী সাইফুল ইসলাম। ফলে বিদ্যালয় মাঠে মেলার আয়োজন তিনিই করেছেন। মেলার কারণে মাঠ যতটুকু ক্ষতি হবে তা তিনিই সংস্কার করে দেবেন। এ ছাড়া এ বিদ্যালয়ের তহবিলে কোনো টাকা দেবেন কি না তাও তিনিই জানেন।’

বিদ্যালয় সূত্র জানায়, এটি এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এখানে ওই পরীক্ষা শুরু হবে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে আগত এসএসসি পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত এ মেলা চলবে। তবে মেলার মধ্যে বিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে। মেলার কারণে ক্লাস আধাঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে সকাল ১০টার পরিবর্তে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ক্লাস শুরু করা হচ্ছে। বিকেল ৪টার পরিবর্তে ৩টার মধ্যে ক্লাস শেষ করা হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক অবশ্য স্বীকার করেন, ‘বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলা মেলার মাইকের শব্দে এলাকার শিক্ষার্থীসহ এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে চরম ব্যাঘাত ঘটছে।’

এদিকে একই মাঠের মধ্যে রয়েছে ১ নম্বর রতনদিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, ‘মেলা আয়োজনের বিষয়টি মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে কোনো কথা না বলে এ মাঠে মেলা শুরু করা হয়েছে। মেলা শুরুর পর আমাদের জানানো হয়েছে, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এক দিন বিনা মূল্যে সার্কাস দেখানো হবে। তবে গত ১০ দিনেও সার্কাস দেখানো হয়নি। যদিও ওই সার্কাস শিক্ষার্থীদের না দেখানোই ভালো। সার্কাসের নামে গানের তালে তালে এখানে অশ্লীল নাচ হচ্ছে।’ তাঁরা দাবি করেন, ‘এ মেলার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। প্রশাসন পরীক্ষা মৌসুমে বিজয় মেলার অনুমোদন দিয়ে অবিবেচকের কাজ করেছে।’

রতনদিয়া রজনীকান্ত উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলিউজ্জামান চৌধুরী টিটো বলেন, ‘এখানে মেলার নামে অশ্লীল নৃত্য, র‌্যাফেল ড্রর নামে হাউজি ও লাকি কুপনের মতো জুয়া প্রকাশ্য পরিচালনা করা হচ্ছে। উচ্চ স্বরে মাইক বাজানোর ফলে দুটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও এসএসসি পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি চরমভাবে বিঘ্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে এলাকাবাসীর ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি আমি কালুখালী থানা পুলিশকে অবহিত করেছি। অথচ থানার পেছনের মাঠে ওই কাণ্ড হলেও পুলিশ কোনো কর্ণপাত করছে না।’

কালুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম ফকির বলেন, ‘মেলায় লাকি কুপন, হাউজি ও সার্কাস চলছে। তবে জেলা প্রশাসন শুধু সার্কাসের অনুমোদন দিয়েছে। সার্কাসে কোনো অশ্লীল নৃত্য চলছে না। মাঝে মধ্যে আয়োজকরা দ্বিতীয় শ্রেণির নায়িকাদের মঞ্চে আনছেন। মেলার কারণে বিদ্যালয় দুটির শিক্ষার্থী এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’

অন্যদিকে গত ১৪ জানুয়ারি থেকে বালিয়াকান্দি কলেজ মাঠে শুরু হয়েছে বিজয় মেলা। এ মেলা আগামী ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে।

মেলার আয়োজক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবদুল মতিন ফেরদৌস জানান, তাঁরা মেলার আয় থেকে বিজয় স্তম্ভ নির্মাণ করবেন। তবে মেলাটি পরিচালনা করছেন উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নুর আহম্মেদ আল মাসুদ। এর বাইরে তিনি কিছু জানেন না।

উপজেলা যুবলীগের সভাপতি নুর আহম্মেদ আল মাসুদ বলেন, ‘এ মেলায় গত রবিবার পর্যন্ত লাকি কুপন, হাউজি ও সার্কাস চলেছে। তবে থানা পুলিশের সদস্যরা সার্কাস ব্যতীত অন্য সব কিছু বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে গতকাল সোমবার থেকে সার্কাস প্রদর্শন রয়েছে। আর উচ্চ শব্দে মাইক বাজানোসহ নৃত্যও বন্ধ রয়েছে।’

বালিয়াকান্দি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসন এ মেলায় সার্কাসের অনুমোদন দিয়েছে। ফলে এখানে অন্য কোনো কিছু চলার সুযোগ নেই। গত রবিবার রাতে রাজবাড়ীর সহকারী পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম এখানে এসে লাকি কুপন ও হাউজি এবং উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছেন।’

এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে মেলা আয়োজনের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে মেলা আয়োজনের বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’

(সুত্র- দৈনিক কালের কণ্ঠ)  http://www.kalerkantho.com/print-edition/priyo-desh/2016/01/19/314969

(Visited 42 times, 1 visits today)